বীথীর শাসনযন্ত্র
বীথী-বিভাগেরও যে একটি নিজস্ব অধিকরণ থাকিস্ত তাহার প্রমাণ মল্লসরুল-লিপির সাক্ষ্যেই জানা যাইতেছে, তবে এই অধিকরণ কী ভাবে গঠিত হইত, বলা যাইতেছে না। মহত্তর, খাড়াগী ও অন্তত একজন বাহনায়ক বক্কটুক বীথী-অধিকরণের শাসনকার্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই এবং ভূমি দান-বিক্রয়ের ব্যাপারে এই অধিকরণের ক্ষমতা বিষয়াধিকরণেরই অনুরূপ, এ-তথ্যও লিপি-সাক্ষ্যেই প্রমাণ। এই লিপিতে কুলবারকৃত নামে একাধিক বীথী-অধিকরণ-কর্মচারীর উল্লেখ পাইতেছি; বিক্ৰীত ভূমির বীথীকোষস্থ অর্থ অধিকরণের নির্দেশানুযায়ী বিলি-বন্দোবস্ত করিবার ভার এই কুলবারকৃতদের উপর দেওয়া হইয়াছিল। স্থানীয় অধিকরণ-সম্পূক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত দুইজন মহত্তর, তিনজন খাড় গী এবং একজন বাহনায়কের সাক্ষাৎ পাইতেছি; তবে শাসনকার্যে ইহাদের দায়িত্ব কতখানি ছিল বলা কঠিন। বাহনায়কের কথা আগে বলিয়াছি। খাড় গী এবং পরবর্তী কালের রামগঞ্জ-লিপির খড়গাগ্রাহ সমার্থক হওয়া অসম্ভব নয়; খাড় গী=খড় গধারী প্রহরী, অর্থাৎ শান্তিরক্ষা-বিভাগের রাজকর্মচারী হওয়া বিচিত্র নয়।
গ্রামের শাসনযন্ত্র
গ্রামের শাসনযন্ত্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব কাহার উপর ছিল অর্থাৎ গ্রামে প্রধান রাজপুরুষ কে ছিলেন তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা যাইতেছে না, তবে গ্রামিক নামে জনৈক রাজপুরুষের (?) সাক্ষাৎ কোনও কোনও লিপিতে পাওয়া যাইতেছে (যেমন, ৩ নং দামোদরপুর-লিপিতে); বোধ হয় তাঁহারাই ছিলেন গ্ৰাম্য শাসনযন্ত্রের কর্তা। অধিকাংশ গ্রামে গ্রামের প্রধান প্রধান লোকেরাই—ব্রাহ্মণ, মহত্তর, কুটুম্ব ইত্যাদি-বোধ হয় শাসনকার্য নির্বাহ করিতেন। অন্তত ভূমি দান-বিক্রয় ব্যাপারে। ইহারা যে স্থানীয় শাসনকার্যের উপদেষ্ট ও সহায়ক ছিলেন, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই (দামোদরপুর-লিপি, পাহাড়পুর-লিপি দ্রষ্টব্য)। মনে হয় রাষ্ট্রের নির্দেশ কার্যে পরিণত করার ভার। ইহাদের উপরই দেওয়া হইত। কিন্তু কোনও কোনও গ্রামে একটু বিস্তৃততর শাসনযন্ত্রও বিদ্যমান ছিল; সে-সব ক্ষেত্রে ব্ৰাহ্মণ, মহত্তর, কুটুম্ব, ‘অক্ষুদ্র প্রকৃতয়ঃ প্রভৃতিরা তো সহায়ক ও উপদেষ্ট হিসাবে থাকিতেনই; তাহা ছাড়া, গ্রামিক এবং অষ্টকুলাধিকরণ নামে একটি অধিকরণও যে থাকিত, তাহারও প্রমাণ আছে (৩নং দামোদরপুর পট্টোলী এবং ধনাইদহ পট্টোলী দ্রষ্টব্য)। অষ্টকুলাধিকরণের গঠন লইয়া পণ্ডিতদের মধ্যে নানা মত দেখিতে পাওয়া যায়। পঞ্চকুলের উল্লেখ অনেক লিপিতেই দেখা যায়, এবং স্থানীয় রাষ্ট্রকার্যে, বিশেষত ভূমি ও অর্থ সংক্রাস্ত ব্যাপারে পঞ্চকুলের দায়িত্ব যে অনেকখানি ছিল তাহা আমরা একাধিক স্বতন্ত্র সাক্ষ্যে জানিতে পাই। পঞ্চকুল যে কৌমতান্ত্রিক পঞ্চায়েত প্রথার সমগোত্রীয় সন্দেহ নাই। অষ্টকুল বোধ হয় পঞ্চকুলের মতই কোনও জনসংঘ, আট জন প্রধান ব্যক্তি লইয়া গঠিত সমিতি। অবশ্য কুল শব্দের বিশেষ আভিধানিক অর্থ আছে। ছয়টি বলদ ও দুইটি লাঙ্গলে যে পরিমাণ ভূমি চাষ করা যায় তাহাই এক কুল; এই রকম আটটি কুলের শাসন-কর্তৃত্ব র্যাহার বা যাঁহাদের উপর দেওয়া হয়, তিনি বা তাহারাই অষ্ট-কুলাধিকরণ। কিন্তু এই আভিধানিক অর্থ এক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলিয়া মনে হইতেছে না। এই ধরনের বিস্তৃততর গ্রাম্য শাসনযন্ত্রের কাজের সাহায্যের জন্য পুপ্তপালের দপ্তরও একটি থাকিত ৷৷ ৩নং দামোদপুর-পট্টোলীতে পলাশবৃন্দকের শাসনযন্ত্রে মহাওর, কুটুম্ব, ব্ৰাহ্মণ, “অক্ষুদ্র প্রকৃতয়ঃ”, গ্রামিক, অষ্টকুলাধিকরণ প্রভৃতির সঙ্গে পত্রদাস নামে একজন পুস্তপালের সাক্ষাৎও পাইতেছি।
বিষয় ও বীথি-অধিকরণের মতো ভূমি দান-বিক্রয়ের ব্যাপারে গ্রামা-অধিকরণেরও একই অধিকার ছিল বলিয়া মনে হইতেছে। ৩ নং দামোদরপুর-পট্টোলীতে দেখিতেছি, গ্রামিক নাভিক পলাশবৃন্দকের শাসন-কর্তৃপক্ষের নিকট চণ্ডীগ্রাম পলাশবৃন্দকের সীমার বাহিরে অবস্থিত থাকায় কর্তৃপক্ষ চণ্ড গ্রামের ব্রাহ্মণ, কুটুম্ব ও মহত্তরদের উপর এই বিক্রয়-ব্যাপার সম্পাদনার ভার অর্পণ করিয়াছিলেন। ধনাইদহ-লিপিতেও দেখিতেছি, গ্ৰাম্য অষ্টকুলাধিকরণ এবং তৎসম্পৃক্ত শাসনযন্ত্রের নিকটই ক্রয়েছু ব্যক্তি ভূমিক্রয়ের প্রার্থনা জানাইতেছেন। পাহাড়পুর-লিপিতে দেখা যাইতেছে, নগরশ্ৰেষ্ঠীর উপস্থিতিতে পুণ্ড্রবর্ধনের ভুক্তি-অধিকরণের সমক্ষে এক ভূমিক্রয়ের প্রার্থনা উপস্থিত করা হইয়াছিল; কিন্তু প্রস্তাবিত ভূমি অধিকরণাধিষ্ঠানের সীমার বাহিরে অবস্থিত থাকায় ভুক্তি-অধিকরণ স্থানীয় ব্রাহ্মণ, কুটুম্ব ও মহত্তরদিগকে এ-কার্যে সহায়তা করিতে আহ্বান ও নির্দেশ করিয়াছিলেন। বৈগ্রাম-লিপির সাক্ষ্যও অনুরূপ; পঞ্চনগরীর বিষয়াধিকরণের সমক্ষে উপস্থাপিত একটি প্রার্থনা প্রস্তাবিত ভূমির স্থানীয় সংব্যবহারীপ্রমুখের—ব্রাহ্মণ, কুটুম্ব ইত্যাদির—নিকট পঠাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। উর্ধর্বতন অধিকরণের নির্দেশানুযায়ী এইসব স্থানীয় কর্তৃপক্ষই ভূমি নির্বাচন করিয়া, মাপজোখ করিয়া, মূল্য লইয়া বিক্রয়-কার্য সম্পাদন করিতেন এবং তাহা পট্টীকৃতও করিতেন।
ভুক্তি অধিকরণ হইতে আরম্ভ করিয়া গ্ৰাম্য স্থানীয় অধিকরণ পর্যন্ত সর্বত্রই দেখিতেছি, রাষ্ট্রযন্ত্রে জনসাধারণের ইচ্ছা, মতামত, দায় ও অধিকার কার্যকরী করিবার একটা সুযোগ ছিল। শিল্প ও ব্যাবসা-বাণিজ্যবহুল জনপদের অধিকরণগুলিতে শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা স্থান পাইতেন; কৃষিবহুল ভূমি নির্ভর জনপদের স্থানীয় বীথী ও গ্রাম্য অধিকরণগুলিতে গ্রামিক, অষ্টকুলাধিকরণ, কুটুম্ব, মহত্তর, ব্রাহ্মণ ইত্যাদির শাসনকার্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন, অন্তত সহায়ক ও উপদেষ্টা রূপে। ইহাদের দায় ও অধিকারের তারতম্য সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা হয়তো কঠিন, মতভেদও আছে, সন্দেহ নাই; কিন্তু মোটামুটি ভাবে এই যুগের রাষ্ট্রযন্ত্র জনসাধারণকে একেবারে অবজ্ঞা করিয়া চলিতে পারে নাই, এ-তথ্য স্বীকার করিতে হয়। তবে, জনসাধারণ বলিতে ভূমি ও অর্থবান সমৃদ্ধ শ্রেণী এবং ব্ৰাহ্মণদেরই বুঝাইতেছে, সন্দেহ নাই; ক্ষুদ্র-প্রকৃতিপুঞ্জের কোনো দায় বা অধিকার রাষ্ট্র স্বীকার করিত, এমন প্রমাণ নাই।
০৫. গুপ্তোত্তর যুগ। আনুমানিক ৫০০-৭৫০ খ্ৰীষ্টীয় শতক
ষষ্ঠ শতকে বঙ্গ স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব রাষ্ট্রযন্ত্রও গড়িয়া তোলে। তখন উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গে গুপ্ত-বংশের আধিপত্য বিলীয়মান; ছোটখাট বংশধরেরা কোনো প্রকারে তঁহাদের স্থানীয় আধিপত্য বজায় রাখিতেছেন মাত্র। স্বাধীন স্বতন্ত্র রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গে (অর্থাৎ পূর্ববঙ্গে) নূতন রাষ্ট্রযন্ত্রেরও পত্তন হইল; কিন্তু সে-রাষ্ট্র-বিন্যাস গুপ্ত—আমলের প্রাদেশিক রাষ্ট্ররূপের আদৰ্শই স্বীকার করিয়া লইল। বস্তুত, বঙ্গের স্বাধীন রাজাদের রাষ্ট্রযন্ত্র গুপ্ত-রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুকরণ বলিলেই চলে। রাষ্ট্রবিভাগ, শাসন-পদ্ধতি, রাজপাদোপজীবীদের উপাধি, দায় ও অধিকার, শাসনক্রম, ইত্যাদি সমস্তই একপ্রকার। কাজেই এ-পর্বে নূতন কথা বলিবার বিশেষ কিছু নাই।
