বিষয়পতি সাধারণত নিযুক্ত হইতেন উপরিক কর্তৃক; কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে বোধ হয় মহারাজাধিরাজ স্বয়ংই ছিলেন নিয়োগকর্তা, যেমন বৈগ্রাম-পট্টোলী-কথিত পঞ্চনগরী বিষয়ের বিষয়পাত ছিলেন “ভট্টারকপািদানুধ্যাত”। বিষয়ের শাসনকর্তকে কোনও কোনও লিপিতে বলা হইয়াছে আয়ুক্তক, যেমন পাহাড়পুর-লিপিতে; কোনও লিপিতে কুমারামোত্য, যেমন বৈগ্রাম-পট্টোলীতে। কিন্তু পরবর্তী গুপ্ত-রাজাদের আমলে সর্বত্রই তাহার পদোপাধি বিষয়পতি।
বিষয়পতি ও বিষয়াধিকরণ
বিষয়পতি বিষয়াধিকরণের সর্বোচ্চ কর্মচারী এবং বিষয়পতির অধিষ্ঠানস্থানেই বিষয়াধিকরূর্ণের শাসনকেন্দ্র। শূদ্রকের মৃচ্ছকটিক নাটকের নবম অঙ্কে এক অধিকরণের বর্ণনা আছে। অধিকরণের কর্মনির্বাহের জন্য একটি মণ্ডপ বা সভাগৃহ ছিল। সেই মণ্ডপে অধিকরণ বসিত। মৃচ্ছকটিকের বিচারাধিকরণের বর্ণনা হইতে স্পষ্টই বুঝা যায়, অধিকরণিক, অধিকরণ-ভোজক, শ্ৰেষ্ঠী এবং কায়স্থদের লইয়া অধিকরণ গঠিত হইত এবং এই সব অধিকরণের উপর ভূমি দান-বিক্রয় কর্ম শুধু নহে, বিষয় শাসন-সংক্রান্ত সর্বপ্রকার রাষ্ট্রকর্মের দায়িত্বও ন্যস্ত ছিল এবং, তাহার মধ্যে ন্যায়-অন্যায় বিচার, দণ্ড-পুরস্কার, দানকর্মও বাদ পড়িত না। অধিকরণ-গঠনের যেইঙ্গিত মৃচ্ছকটিক নাটকে পাওয়া যায়, প্রায় অনুরূপ ইঙ্গিত গুপ্ত—আমলের লিপিগুলিতেও পাওয়া যাইতেছে; তবে লিপিগুলি সমস্তই ভূমি দান বিক্রয় সম্পৃক্ত বলিয়া তাহা ছাড়া অন্য কোনও শাসন-সম্পৃক্ত সংবাদ ইহাদের মধ্যে পাওয়া যায় না। কোনও কোনও বিষয়ের বোধহয় কোনও অধিকরণ থাকিত না, বিষয়পতি তৃহার কর্মচারীদের লইয়া শাসনকার্য নির্বাহ করতেন। বৈগ্রাম-পট্টোলীতে দেখিতেছি পঞ্চনগরী বিষয়ের কোনও বিষয়াধিকরণের উল্লেখ নাই; কুমারামান্ত কুলবৃদ্ধি (বিষয়পতি) সংব্যবস্থার ও পুস্তপালদের সাহায্যে শাসনকার্য চালাইতেন। প্রধান দায়িত্ব যে সর্বত্রই বিষয়পতির উপরই ছিল সন্দেহ নাই। তবে, ১, ২, ৪ ও ৫ নং দামোদরপুর-পট্টোলী-কথিত (৪৪২-৪৪-৫৪৩-৪৪ খ্ৰীঃ) কোটীবর্ষ বিষয়ের অধিকরণের যে-খবর পাওয়া যাইতেছে তাহাতে দেখিতেছি, বিষয়পতির সহায়করূপে অধিকরণ গঠন করিতেছেন নগরশ্ৰেষ্ঠী, প্রথম কুলিক, প্রথম কায়স্থ এবং প্রথম সার্থিবহ। প্রথম কায়স্থ খুব সম্ভব বিষয়পতির কর্মসচিব এবং সেই হেতু রাজকর্মচারী। কিন্তু বাকী তিনজন অর্থাৎ নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম কুলিক এবং প্রথম সার্থিবাহ। প্রথম কায়স্থ খুব সম্ভব বিষয়পতির কর্মসচিব এবং সেই হেতু রাজকর্মচারী। কিন্তু বাকী তিনজন অর্থাৎ নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম কুলিক এবং প্রথম সার্থবাহ যথাক্রমে বণিক, শিল্পী এবং ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। প্রাচীন তীরভূক্তি (তিরহুত) অন্তর্গত বর্তমান বসার বা প্রাচীন বৈশালীয় ধ্বংসাবশেষের মধ্যে অনেক মাটির শীলমোহর পাওয়া গিয়াছে; তাহাতে “শ্রেষ্ঠী-সার্থবাহ-কুলিকনিগম” বা “শ্রেষ্ঠীনিগম” এইরূপ পদ উৎকীর্ণ আছে। এলাহাবাদ জেলায় ভিটার ধ্বংসাবশেষ হইতেও “কুলিকনিগম” পদ উৎকীর্ণ কয়েকটি শীলমোহর পাওয়া গিয়াছে। অনুমান হয়, কোটীবর্ষ বিষয়েও শ্ৰেষ্ঠী, কুলিক এবং সার্থবাহদের নিজস্ব নিগম ছিল এবং বিষয়াধিকরণের নগরশ্ৰেষ্ঠী, প্রথম কুলিক এবং প্রথম-সার্থবাহ তাঁহাদের নিজস্ব নিগমের সভাপতি এবং সেই হিসাবে বিষয়াধিকরণে ইহাদের প্রতিনিধি ছিলেন। ইহারা কি স্ব স্ব নিগম কর্তৃক নির্বাচিত হইতেন, না রাষ্ট্র বা রাজা দ্বারা নিযুক্ত হইতেন? এ-প্রশ্নের নিঃসংশয় উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে, প্রায় সমসাময়িক নারদ ও বৃহস্পতির ধর্মসূত্রের সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয়। তবে তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, এই সব নিগম-সভাপতিরা স্ব স্ব নিগম কর্তৃক নির্বাচিত হইতেন। দ্বিতীয়ত, অধিকরণের এই সব সভ্যদের সঙ্গে বিষয়াপতির সম্বন্ধ কী ছিল? কেহ কেহ মনে করেন, শাসন-ব্যাপারে ইহাদের সাক্ষাৎ দায়িত্ব কিছু ছিল না, অধিকরণের অধিবেশনে ইঁহারা উপস্থিত থাকিতেন মাত্র (রাষ্ট্রকর্ম ইঁহাদের ‘পুরোগে’ অর্থাৎ উপস্থিতিতে নির্বাহ হইত)। আবার কেহ কেহ বলেন, সর্বময় দায়িত্ব ছিল বিষয়পতির, আর ইহারা ছিলেন উপদেষ্টা মাত্ৰ। নগরশ্ৰেষ্ঠী, প্রথম কুলিক, প্রথম সার্থিবাহ এবং প্রথম কায়স্থকে লইয়া একটি উপদেষ্ট-মণ্ডলী ছিল, তাহারা বিষয়পতিকে উপদেশ-পরামর্শ ইত্যাদি দিতেন। কিন্তু লিপিগুলির প্রসঙ্গ-সাক্ষ্য এবং মৃচ্ছকটিকের বিবরণ একত্র করিলে মনে হয়, ইহারা শুধু সহায়ক বা উপদেষ্ট মাত্র ছিলেন না, বিষয়াপতির সঙ্গে ইহারাও সমভাবে শাসনকার্যের দায়িত্ব নির্বাহ করিতেন এবং অধিকরণের ইহারা অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন।
পুস্তপাল-দপ্তর
বিষয়াধিকরণের সভ্যদের প্রয়োজনমতে সাহায্য করিবার জন্য একটি পুস্তপালের দপ্তরও থাকিত; বিশেষত, ভূমি দান-বিক্রয় ব্যাপারে ইহাদের সাহায্য সর্বদাই প্রয়োজন হইত, কারণ ভূমির মাপজোখ, সীমা-নিৰ্দেশ, ভূমির স্বত্বাধিকার, ইত্যাদি সব কিছুর দলিলপত্র ইহাদের দপ্তরেই রক্ষিত হইত। ভূমি দান-বিক্রয়ের ক্রমের যে-বিবরণ এই যুগের লিপিগুলিতে পাওয়া যাইতেছে তাহার বিস্তৃত আলোচনা অন্যত্র করিয়াছি; এখানে সংক্ষেপে সারমর্ম উদ্ধার করা যাইতে পারে। ভূমি ক্রয়েছু ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা সর্বপ্রথম নির্দিষ্ট ভূমি-ক্রয়ের ইচ্ছা ও সঙ্গে সঙ্গে ক্রয়ের উদ্দেশ্য (প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ধর্মোদ্দেশে দান) এবং স্থানীয় প্রচলিত মূল্যানুযায়ী মূল্যদানের স্বীকৃতি স্থানীয় অধিকরণের আবেদনরূপে উপস্থিত করিতেন; অধিকরণ তখন প্রস্তাবিত আবেদনটি পরীক্ষা করিবার জন্য পুস্তপালের দপ্তরে পাঠাইয়া দিতেন। পুস্তপালের দপ্তর কখনও তিনজন (যেমন, ১, ২, ৪ ও ৫নং দামোদরপুর-পট্টোলীতে), কখনও দুইজন পুস্তপাল (যেমন, বৈগ্রাম-লিপিতে) লইয়া গঠিত হইত। যাহাই হউক, পুস্তপালের দপ্তর বিক্রয় অনুমোদন করিলে এবং মূল্য রাজসরকারে জমা হলি ভূমি-ক্রয়েচ্ছু ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের ভূমির অধিকার দেওয়া হইত। অর্থাৎ বিক্রয়কার্য নিষ্পন্ন হইত। এই বিক্রয়কাৰ্য্য-সম্পাদনা পট্টীকৃত হইত। তাম্রশাসনে এবং বিক্ৰীত ভূমির উপর অধিকারের দলিল-প্রমাণস্বরূপ তাম্রশাসনখানি ক্রেতার হস্তে অপিত হইত। ভূমির মাপজোখ কাহারা করিতেন, এ সম্বন্ধে লিপিতে সুনির্দিষ্ট কোনও উল্লেখ নাই, তবে পুস্তপালেরাই তাহা করিতেন, এমন অনুমান করা যাইতে পারে। কিন্তু সাক্ষাৎভাবে যে সব ভূমির অবস্থিতি অধিকার-শাসনসীমার বাহিরে, দূর গ্রামে, সে ক্ষেত্রে বিষয়াধিকরণ তাঁহাদের নিকট উপস্থাপিত প্রস্তাব ও তাঁহাদের নির্দেশ স্থানীয় শাসন-প্রতিনিধিদের নিকট পাঠাইয়া দিতেন। এবং স্থানীয় অধিকরণের কর্মচারীরা ভূমি নির্বাচন ও মাপজোখ ইত্যাদি সম্পাদনা করিয়া মূলা গ্রহণ করিয়া বিঞািয়কার্য পট্টীকৃত করিয়া দিতেন। গ্রামের শাসনযন্ত্র আলোচনা কালে এই কার্যক্রম আরও পরিষ্কার হইবে।
