সামন্ত নরপতি শাসিত জনপদ ছাড়া বাকী দেশখণ্ড ছিল খাস রাষ্ট্রের অধিকারে। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের বৃহত্তম রাজ্য-বিভাগের নাম ছিল ভুক্তি; প্রত্যেক ভুক্তি বিভক্ত হইত। কয়েকটি বিষয়ে, প্রত্যেক বিষয় কয়েকটি মণ্ডলে, প্রত্যেক মণ্ডল কয়েকটি বীথীতে এবং প্রত্যেক বীথী কয়েকটি গ্রামে এবং গ্রামেই ছিল সর্বনিম্ন দেশবিভাগ। প্রত্যেক বিভাগ-উপবিভাগ ছিল সুনির্দিষ্ট সীমায় সীমিত এবং অধস্তন গ্রাম হইতে আরম্ভ করিয়া উর্ধর্বতম ভুক্তি পর্যন্ত একটি সূত্রে গ্রথিত।
গুপ্ত আমলে বাঙলাদেশে অন্তত দুইটি ভুক্তি-বিভাগের খবর পাওয়া যায়; বৃহত্তর ভুক্তি-বিভাগ পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তি, বর্ধমানভুক্তি ক্ষুদ্রতর। প্রথমটির খবর প্রত্যক্ষভাবে পাইতেছি। দামোদরপুর-পট্টোলী পাঁচটি হইতে, পরোক্ষভাবে পাহাড়পুর-পট্টোলী হইতে। বর্ধমান-ভুক্তির খবর পাইতেছি মহারাজ গোপচন্দ্রের মল্লসরুল-লিপি হইতে। অনুমান হয়, শেষোক্ত ভুক্তি-বিভাগটি গোপচন্দ্রের আগে বৈন্যগুপ্তের সময়েও বিদ্যমান ছিল। পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তি অন্তত তিনটি বিষয়ে বিভক্ত-ছিল। কোটীবর্ষ নামে একটি বিষয়ের খবর পাইতেছি ১, ২, ৪ ও ৫ নং দামোদরপুর-পট্টোলীতে; ধনাইদহ-পট্টোলীতে খোটাপারা বা খাদ্যপারা (নন্দপুর-লিপির খটাপুরাণ দ্রষ্টব্য) নামে একটি বিষয়ের উল্লেখ দেখা যাইতেছে; এবং বৈগ্রাম-পট্টোলীতে পঞ্চনগরী নামে তৃতীয় আর একটি বিষয়ের। শেষোক্ত দুইটি বিষয় পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত, এ-কথা লিপিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ নাই সত্য, কিন্তু লিপি-প্ৰসঙ্গ এবং স্থানের ইঙ্গিতে এ-তথ্য সুস্পষ্ট। মণ্ডল-বিভাগের একটিমাত্র উল্লেখ এই আমলের লিপিতে পাইতেছি, যদিও বাঙলার বাহিরে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্যত্র এই বিভাগের বিদ্যমানতার সাক্ষ্য সুপ্রচুর। পাহাড়পুর-পট্টোলীতে দক্ষিণাংশক-বীথী ও নাগিরট্ট-মণ্ডলের উল্লেখ পর পর দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু মণ্ডল কোন বিষয়ের অন্তর্গত, কোনও বিষয়েরই অন্তর্গত কিনা, না সরাসরি পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত, তাহা নিশ্চয় করিয়া বলিবার উপায় নাই; লিপিতে কোনো ইঙ্গিতই পাওয়া যাইতেছে না। অথবা, দক্ষিণাংশক-বীথী এই মণ্ডলেরই একটি বিভাগ। কিনা তাহাও নিঃসংশয়ে বলা যাইতেছে না। শুধু এইটুকু বলা যায় যে, মণ্ডল নামে একটি রাষ্ট্র-বিভাগ ছিল এবং বাঙলার বাহিরে গুপ্ত সাম্রাজ্যে অন্যত্র যে রীতি প্রচলিত ছিল তাহা হইতে এই অনুমান করা যায় যে, মণ্ডল বিষয়ের ক্ষুদ্রতর বিভাগ। দক্ষিণাংশক-বীথী ছাড়া আরও দুই একটি বীথী-বিভাগের পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। মুঙ্গের জেলার রঙ্গপুর গ্রামে প্রাপ্ত নন্দপুর-পট্টোলীতে (৪৮৯ খ্ৰীঃ) নন্দ-বীথী নামে এক বীথীর উল্লেখ আছে; এই বীথী অম্বিল গ্রামাগ্রহারের অন্তর্ভুক্ত এবং লিপি-সাক্ষ্যের ইঙ্গিতে মনে হয়, এই অগ্রহারেই ছিল বিষয়পতি ছত্ৰমহের অধিকরণ বা বিষয়কর্মকেন্দ্র। এই অনুমান বোধ হয় সঙ্গত যে, অম্বিল গ্রামগ্রহার যে-বিষয়ের রাষ্ট্রকেন্দ্র, সেই বিষয়েরই অন্তৰ্গত ছিল নন্দ-বীথী। বঙ্কট্টক নামে আর একটি বীথী-বিভাগের উল্লেখ পাইতেছি। গোপচন্দ্রের মল্লসরুল-লিপিতে এবং এই বীথী বর্ধমান-ভুক্তির অন্তর্গত। সর্বনিম্ন রাষ্ট্রবিভাগ গ্রাম। কোনও কোনও ধর্মদেয় বা ব্ৰহ্মদেয় গ্রাম অগ্রহার নামে অভিহিত হইত, যেমন নন্দপুর-লিপির অম্বিল গ্রামগ্রহার, গুণাইঘর লিপির গুণেকাগ্রহারগ্রাম। অনুমান হয়, ব্যাবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে বা রাষ্ট্রকর্মকেন্দ্র হিসাবে কোনও কোনও অগ্রহার গ্রাম বাড়িয়া উঠিয়া বড় হইত এবং অন্যান্য গ্রামাপেক্ষা অধিকতর প্রাধান্য লাভ করিত,। ছোট ছোট একাধিক গ্রাম বা পাড়া (পরবর্তী লিপি সমূহের পাটক, পুণ্ড্রক ইত্যাদি) লইয়া একটি বৃহৎ গ্রামও গড়িয়া উঠিত, যেমন বৈগ্রাম-পট্টোলীর বায়িগ্রাম। বায়িগ্রামের অন্তত দুইটি অংশের নাম লিপিতে পাইতেছি, একটি ত্ৰিবৃতা আর একটি শ্ৰীগোহালী (পাহাড়পুর-পট্টোলীর বন্ধ-গোহালী=বর্তমান গোয়ালভিটা, এবং ত্ৰিগোহালী দ্রষ্টব্য)।
ভুক্তিপতি ও তাঁহার শাসনযন্ত্র
মহারাজাধিরাজ স্বয়ং ভুক্তির শাসনকর্তা নিযুক্ত করিতেন; ভুক্তিপতিরা সকলেই মহারাজাধিরাজ সম্পর্কে “তৎপাদপরিগৃহীত”। কখনো কখনো রাজকুমার বা রাজপরিবারের লোকেরাও ভুক্তিপতি নিযুক্ত হইতেন; ৫৪৫ খ্ৰীষ্টাব্দে পুণ্ড্রবর্ধন-ভূক্তির উপরিক-মহারাজ ছিলেন জনৈক রাজপুত্র দেবভট্টারক। প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্বকালে ভুক্তিপতিদের বলা হইত উপরিক, কিন্তু বুধগুপ্তের রাজত্বকালে দেখিতেছি, তাহদের বলা হইতেছে, উপরিক মহারাজ বা মহারাজ। মল্লসরুল-লিপিতেও দেখিতেছি, বর্ধমান-ভুক্তির শাসনকর্তাকে বলা হইতেছে উপরিক। ভুক্তির শাসনযন্ত্রের স্বরূপ কী ছিল, বলা কঠিন; লিপিগুলিতে তাহার কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যাইতেছে না। বসারে প্রাপ্ত একটি শীলমোহরে দেখা যাইতেছে, উপরিকের অধিষ্ঠানে বা শাসনকেন্দ্ৰে একটি অধিকরণ বা কর্মকেন্দ্ৰ থাকিত; কিন্তু এই কর্মকেন্দ্ৰ কাহাদের লইয়া গঠিত হইত। তাহার আভাস পাওয়া যাইতেছে না। বুধগুপ্তের পাহাড়পুর-লিপি পাঠে মনে হয়, উপরিক-মহারাজের সঙ্গে পুন্ড্রবর্ধনের স্থানীয় অধিকরণের সাক্ষাৎভাবে কোনও সম্বন্ধ ছিল না, অন্তত ভূমি দান-বিক্রয়ের ব্যাপারে। এই ক্ষেত্রে ভূমি-বিক্রয়ের প্রস্তাবটি আসিয়াছিল প্রথম আয়ুক্তক নামে বর্ণিত কর্মচারী এবং স্থানীয় অধিকরণের সম্মুখে; তাহার প্রস্তাবটি পরীক্ষার জন্য পাঠাইয়া দিয়াছিলেন পুস্তপালদের নিকট। আয়ুক্তক নাম হইতে মনে হয়, এই স্থানীয় অধিকরণ বিষয়াধিকরণ, অর্থাৎ পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত পুণ্ড্রবর্ধন-বিষয়ের অধিকরণ এবং আয়ুক্তক হইতেছেন বিষয়পতি। যেমন ভুক্তিপতির, তেমনই বিষয়পতিরও অধিকরণের অধিষ্ঠান পুণ্ড্রবর্ধনে। সেইজন্যই এই ভূমি-বিক্রয়ের ব্যাপারে স্থানীয় অধিকরণের সঙ্গে উপরিক-মহারাজের কোনো প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ দেখা যাইতেছে না। মল্লসরুল-লিপিতে বর্ধমান-ভূক্তির উপরিকের অধিকরণ-সম্পূক্ত কয়েকজন রাজকর্মচারীর খবর পাইতেছি; ইহাদের পদোপাধি ভোগপতিক, পত্তলিক, চৌরোদ্ধরণিক, আবসথিক, হিরণ্যসমুদায়িক, ঔদ্রঙ্গিক, ঔর্ণস্থানিক, কার্তাকৃতিক, দেবদ্রোণীসম্বন্ধ, কুমারমাতা, আগ্ৰহারিক, তদায়ুক্তক, বাহনায়ক এবং বিষয়পতি। উপরিক হইতেছেন ভুক্তির সর্বোচ্চ রাজকর্মচারী; বিষয়পতি বিষয় বিভাগের সর্বোচ্চ রাজকর্মচারী; তদায়ুক্তক বোধহয় উপরিক নিযুক্ত কর্মচারী এবং আয়ুক্তক বা বিষয়পতির সমার্থক। কার্তাকৃতিক শিল্পকর্মের অধ্যক্ষ অথবা রাজকীয় পূর্ববিভাগের কর্মকর্তা হইলেও হইতে পারেন; নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। ভোগপতিক এবং পত্তলিকের কর্ম সম্বন্ধে কিছু ধারণা। আপাতত করা যাইতেছে না। ভোগ একপ্রকারের সুপরিচিত করা; ভোগপতিকরা বোধহয় সেই করের সংগ্ৰহকর্তা। চৌরোদ্ধরণিক উচ্চপদস্থ শান্তিরক্ষক কৰ্মচারী। আবািসথিক হইতেছেন রাজপ্রাসাদ, রাজকীয় ঘরবাড়ি, বিশ্রামস্থান ইত্যাদির অধ্যক্ষ। হিরণ্যসমুদায়িক মুদ্রায় দেয় কর সংগ্রহকর্মের অধ্যক্ষ। ঔদ্রঙ্গিক স্থায়ী প্রজাদের নিকট হইতে উদ্রাঙ্গ নামক করের সংগ্ৰহকর্তা। ঔর্ণস্থানিক বোধহয় রেশম জাতীয় বস্ত্ৰশিল্পকর্মের নিয়ামক-কর্তা। দেবদ্রোণীসম্বন্ধ হইতেছেন মন্দির, তীর্থ-ঘাট ইত্যাদির রক্ষক ও পর্যবেক্ষক। কুমারমাতা এক শ্রেণীর রাজকর্মচারী; ইহারা বোধহয় বংশানুক্রমে প্রত্যক্ষভাবে রাজা বা রাজকুমার কর্তৃক নিযুক্ত এবং তাহাদের অধীনস্থ কর্মচারী। অগ্রহার হইতেছে। ধর্মদেয়, ব্ৰহ্মদেয় ভূমি; এই ভূমির রক্ষক-পর্যবেক্ষকের নাম বোধহয় ছিল আগ্ৰহারিক। বাহনায়ক যানবাহন যাতায়াত প্রভৃতির নিয়ামক-কর্তা।
