ইহার পর বহুদিন পর্যন্ত বাঙলার রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্র-বিন্যাসের কোনও পরিচয় পাওয়া যায় না। তবে, খ্ৰীষ্টীয় তৃতীয়-চতুর্থ শতকে গৌড়-বঙ্গের রাজান্তঃপুর ও নগর সমাজের যে-পরিচয় বাৎস্যায়নের কামসূত্রে পাওয়া যায়, তাহারও আগে খ্ৰীষ্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে পেরিপ্লাস-গ্রন্থ ও টলেমির বিবরণে, মিলিন্দপঞহ-গ্রন্থে যে সুসমৃদ্ধ সুবিস্তৃত ব্যাবসা-বাণিজ্যের খবর জানা যায়, নাগাৰ্জনকোণ্ডার শিলালিপিতে বৌদ্ধধর্ম প্রচারসূত্রে সিংহল ও পূর্ব-দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে বঙ্গের যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের আভাস পাওয়া যায়, তাহা হইতে স্পষ্টতই মনে হয়, রাষ্ট্র ও সমাজগত শাসন-শৃঙ্খলা বর্তমান না থাকিলে এই ধরনের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, বিশেষ ভাবে সুসমৃদ্ধ সুদূর প্রসারী অন্তঃ ও বহির্বাণিজ্য কিছুতেই সম্ভব হইতে না। সুবর্ণমুদ্রার প্রচলনও এই অনুমানের অন্যতম ইঙ্গিত। চতুর্থ শতকের রাঢ় দেশে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজা ও রাষ্ট্রের খবর পাওয়া যাইতেছে; এই রাষ্ট্র পুষ্করণাধিপ মহারাজ সিংহবৰ্মণ ও তাঁহার পুত্র চন্দ্ৰবৰ্মণের; কিন্তু ইহাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিন্যাস ও পরিচালনা সম্বন্ধে কোনও তথ্যই জানা যাইতেছে না; ইহারা স্বতন্ত্র রাজা ছিলেন। কিনা তাহাও জোর করিয়া বলা যাইতেছে না। তবে রাজতন্ত্র যে তাহার সমস্ত মর্যাদা ও সমারোহ লইয়া এই যুগে সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া গিয়াছে, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের আর অবকাশ নাই।
০৪. গুপ্তপর্ব। আনুমানিক ৩০০-৫০০ খ্ৰীষ্টীয় শতক
গুপ্ত আমলে প্রাচীন বাঙলার অধিকাংশ গুপ্ত-সাম্রাজ্যভুক্ত হইয়া পড়িয়াছিল এবং গুপ্ত-রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রাদেশিক রূপ এ-দেশে পুরাপুরি প্রবর্তিত হইয়াছিল। স্থানীয় পরিবেশ ও প্রয়োজন অনুযায়ী এই প্রাদেশিক রূপের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য এ-দেশে দেখা দিয়াছিল, এ-সম্বন্ধেও সন্দেহ করা চলে না।
রাজা
মহারাজাধিরাজ পরমভট্টারক পরমদৈবত গুপ্ত সম্রাটদের রাজকীয় মর্যাদা ও রাজতন্ত্রের প্রধান পুরুষ হিসাবে তাঁহাদের ঔপধিক আড়ম্বর ও সমারোহ সহজেই অনুমেয়। তাহারা যে নররূপী দেবতা এবং দেবতা-নির্দিষ্ট অধিকারেই রাজা তাহাও “পরমদৈবত” পদটির ইঙ্গিতেই অনুমেয়। এ-তথ্যও সুবিদিত যে, গুপ্ত সম্রাটেরা বিজিত রাজ্যসমূহ সমস্তই তঁহাদের সাক্ষাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রভুক্ত করিতেন না, সমগ্র সাম্রাজ্য তাহারা বা তঁহাদের রাষ্ট্ৰীয় প্রতিনিধিরা নিজেরা শাসন করিতেন না। অনেক অংশ থাকিত সামন্ত নরপতিদের শাসনাধীনে এবং এই সব সামন্ত নরপতিরা নিজ নিজ রাজ্যে প্রায় স্বাধীন স্বতন্ত্র রাজা রূপেই রাজত্ব করিতেন; তঁহাদের নিজেদের পৃথক রাষ্ট্রযন্ত্রও ছিল এবং সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের রূপ” ছিল কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রেরই ক্ষুদ্রতর সংস্করণ মাত্র। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে এই সব সামন্ত রাজা ও রাষ্ট্রের সম্বন্ধ সাধারণত মহারাজাধিরাজের সর্বাধিপত্য স্বীকৃতিতেই আবদ্ধ ছিল। তবে যুদ্ধ-বিগ্রহের সময় তাহারা সৈন্যবল সংগ্ৰহ করিতেন, নিজেরা মহারাজাধিরাজের যুদ্ধে যোগদান করিতেন, এই অনুমান সহজেই করা যাইতে পারে; পরবর্তী কালে তাহার সুস্পষ্ট প্রমাণও আছে। বাঙলাদেশে এই সামন্ত নরপতিদের দায় ও অধিকার কিরূপ ছিল তাহার কিছু কিছু পরিচয় এই পর্বের লিপিমালা হইতে জানা যায়।
সামান্ত-মহাসামন্ত
গুপ্ত আমলে বাঙলাদেশে আমরা অন্তত দুইজন সামন্ত নরপতির সংবাদ পাইতেছি এবং এই দুইজনই মহারাজ বৈন্যগুপ্তের (৫০৭-৮) সামন্ত; ইহাদের একজন বৈন্যগুপ্তের পাদদাস মহারাজ রুদ্রদত্ত এবং আর একজন ছিলেন বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর পট্ট-কথিত মহারাজ মহাসামন্ত বিজয়সেন। মল্লসরুল-লিপিতে বিজয়সেন শুধু “মহারাজ বলিয়াই আখ্যাত হইয়াছেন। স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে, এই সব সামন্ত-মহাসামন্তরা কখনো কখনো মহারাজ বলিয়াই আখ্যাত ও ভূষিত হইতেন। গুণাইঘর পট্টে মহারাজ মহাসামন্ত বিজয়সেনকে বলা হইয়াছে দূতক, মহাপ্ৰতীহার, মহাপিলুপতি, পঞ্চাধিকরণোপরিক, পূরপালো পরিক এবং পাটু্যুপরিক। কোনও বিশেষ রাষ্ট্ৰীয় অথবা রাজকীয় কর্মের জন্য যে রাষ্ট্রপ্রতিনিধি নিযুক্ত হইতেন তাহাকে বলা হইত দূতক। প্ৰতীহারের সহজ অর্থ দ্বাররক্ষক; মহাপ্ৰতীহার শান্তিরক্ষা বা যুদ্ধবিগ্রহ ব্যাপারে নিযুক্ত শান্তিরক্ষক বা উচ্চ সামরিক কর্মচারী অথবা তিনি রাজপ্রাসাদের রক্ষকও হইতে পারেন। মহাপিলুপতি রাজকীয় হন্তীসৈন্যের অধ্যক্ষ বা রাজকীয় হন্তীবাহিনীর প্রধান শিক্ষাদান-কর্তা। পাচটি অধিকরণ (শাসন কর্মকেন্দ্র; এক্ষেত্রে বোধ হয় বিষয়াধিকরণের কথাই বলা হইয়াছে) মিলিয়া পঞ্চাধিকরণ; এই পঞ্চাধিকরণের যিনি প্রধান কর্মকর্তা তিনিই পঞ্চাধিকরণোপরিক। পুর বা নগরের অধ্যক্ষদের বলা হইত। পুরপাল; এই পুরপালদের যিনি ছিলেন কর্তা তিনি পুরপালো পরিক , পাটু্যপরিক বলিতে কি বুঝাইতেছে, বলা কঠিন। যাহা হউক, মহাসামন্ত মহারাজ বিজয়সেন যে সমসাময়িক রাষ্ট্রের এক প্রধান ও করিৎকর্ম ব্যক্তি ছিলেন, সন্দেহ নাই; নহিলে এতগুলি বৃহৎ কর্মের কর্তৃত্ব ভার, এতগুলি উপাধি তাহার আয়ত্তে আসিবার কথা নয়। অথচ তাঁহার প্রভু বৈন্যগুপ্ত শুধু “মহারাজা” আখ্যাতেই রাজকীয় দলিলে আখ্যাত হইয়াছেন। পট্ট-সাক্ষ্যে মনে হয়, সামন্ত নরপতিরা তাহাদের শাসিত জনপদে নিজেরা ভূমিদান করিতে পারিতেন না; মহারাজের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রে ভূমিদানের অনুরোধ তাহারা জানাইতেন এবং সেই অনুযায়ী মহারাজের নামে সেই ভূমি দত্ত বা বিক্ৰীত এবং পট্টীকৃত হইত। কিন্তু মল্লসরুল-লিপিতে দেখিতেছি, বিজয়সেন নিজেই ভূমিদান করিতেছেন। হয়তো তখন তিনি স্বাধীন নরপতি অথবা গোপচন্দ্রের সামন্ত হইলেও তাহার সর্বময় আধিপত্য বিজয়সেন সৰ্ব্বথা স্বীকার করিতেন না।
