পূর্বাপর-সংলগ্ন তথ্য-সম্বলিত উপাদান পঞ্চম শতকের আগে পাওয়া যায় না। কিন্তু তাহার বহু আগে হইতেই উত্তর-ভারতে, বিশেষভাবে মগধ রাষ্ট্রকে কেন্দ্ৰ করিয়া, সুবিস্তৃত রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ ও মতবাদ, জটিল অথচ সুসংবদ্ধ, বিভাগ-উপবিভাগবহুল, কর্মচারীবহুল, রাষ্ট্রযন্ত্র গড়িয়া উঠিয়াছিল; মৌর্যাধিকার কালে ভারতবর্ষে তাহার সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট একটা রূপ আমরা দেখিয়াছি। মৌর্য রাষ্ট্রযন্ত্রই শক-কুষাণ আমলের রাষ্ট্রীয় মতবাদ ও আদর্শ এবং রাষ্ট্র-বিন্যাসের প্রভাবে গুপ্ত-রাষ্ট্রযন্ত্রে ও রাষ্ট্রীয়-বিন্যাসে বিবর্তিত হয়। মহাস্থান শিলাখণ্ড লিপির সাক্ষ্যে অনুমিত হয়, বাঙলাদেশের অন্তত কিয়দংশ মৌর্যরাষ্ট্রের করুকবলিত হইয়াছিল; তখন মৌর্য রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রাদেশিক রূপও এদেশে প্রবর্তিত হইয়াছিল, এরূপ মনে করিবার কারণ আছে। মৌর্য রাষ্ট্র-বিন্যাস উত্তর-ভারতীয় আর্য সমাজ-বিন্যাসেরই আংশিক রূপ; কাজেই এই অনুমান করা চলে যে, আর্য সংস্কার, সংস্কৃতি ও সমাজ-বিন্যাস বাঙলাদেশে বিস্তৃত হইবার সঙ্গে সঙ্গে আর্য রাষ্ট্র-বিন্যাসের আদর্শ এবং অভ্যাসও ক্রমশ ধীরে ধীরে প্রবর্তিত হইতেছিল। কিন্তু গুপ্তাধিকারের আগে আর্য সমাজ-বিন্যাস যেমন বাঙলায় যথেষ্ট কার্যকরী হইতে পারে নাই, মনে হয়, উত্তর-ভারতীয় রাষ্ট্রদর্শ এবং বিন্যাসও তেমনই পূর্ণাঙ্গ প্রবর্তন লাভ করে নাই। গুপ্তাধিকারের সঙ্গে সঙ্গে তাহা ঘটিল; ধর্মে, সংস্কারে, সংস্কৃতিতে, সমাজ-বিন্যাসে, যেমন, রাষ্ট্র-বিন্যাস ক্ষেত্রেও তেমনই বাঙলাদেশ এই সর্বপ্রথম উত্তর-ভারতীয় জীবন-নাট্যমঞ্চে প্রবেশ করিল। কাজেই, ঐতিহাসিক কালে বাঙলার রাষ্ট্র-বিন্যাসের যে-চেহারা আমরা দেখি তাহা গুপ্ত-আমলের উত্তর-ভারতীয় রাষ্ট্র-বিন্যাসেরই প্রাদেশিক ও স্থানীয় বিবর্তনের রূপ।
০২. কৌম শাসনযন্ত্র
কৌম শাসনযন্ত্র
কিন্তু আরম্ভের আগেও আরম্ভ আছে। পঞ্চম শতকেরও আগে, এমন কি মৌর্য কালেরও আগে প্রাচীন বাঙলার জনপদেরা সমাজবদ্ধ হইয়া বাস করিত, তাহাদের সমাজ ছিল, রাজা ছিল, রাষ্ট্রও ছিল। তাহারও আগে যখন রাজা ছিল না, কৌমসমাজ ছিল, ইতিহাসের সেই উষাকালে সেই সমাজেরও একটা শাসনপদ্ধতি ছিল। আজও তাহা নিশ্চিহ্ন হইয়া লোপ পাইয়া যায় নাই। বাঙলার বিভিন্ন জেলায় সমাজের নিম্নতম স্তরে, অথবা পার্বত্য আরণ্য কোমদের মধ্যে, যেমন সাঁওতাল, গারো, রাজবংশী ইত্যাদির মধ্যে, তাহাদের পঞ্চায়েতী প্রথায়, তাহাদের দলপতি নির্বাচনে, সামাজিক দণ্ডবিধানে, নানা আচারানুষ্ঠানে, ভূমি ও শিকার স্থানের বিলি বন্দােবস্তে, উত্তরাধিকার-শাসনে এখনও সেই কৌম শাসনযন্ত্র ও পদ্ধতির পরিচয় পাওয়া যায়। বাঙলার বাহিরে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশেও এই ধরনের বিচিত্র কৌম শাসন-যন্ত্র ও পদ্ধতি আজও দেখিতে পাওয়া যায়, যদিও উন্নত অৰ্থনৈতিক সমাজ-পদ্ধতির ক্রমবর্ধমান চাপে আজ তাহা দ্রুত বিলুপ্ত হইয়া যাইতেছে। কিন্তু, স্মরণ রাখা প্রয়োজন, সুপ্রাচীন কাল হইতেই আর্য সমাজযন্ত্র ও পদ্ধতি ইহাদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হইয়াছে এবং কালে কালে ইহাদের অনেক রীতি-নিয়ম, বিন্যাস-ব্যবস্থা আত্মসাৎ করিয়া সমৃদ্ধ হইয়াছে। বাঙলাদেশেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। প্রাচীন বাঙলার রাষ্ট্র-বিন্যাসের কথা বলিতে গেলে এই সব অস্পষ্ট স্বল্পজ্ঞাত কৌম শাসনযন্ত্র ও রাষ্ট্র-বিন্যাসের কথা একবার স্মরণ করিতেই হয়। কারণ, ঐতিহাসিক কালের বহুকীর্তিত এবং বহুজ্ঞাত রাষ্ট্রযন্ত্র, রাষ্ট্র-বিন্যাস, তথা সমাজ-বিন্যাসের বাহিরে অগণিত লোক কৌম সমাজ ও শাসন-ব্যবস্থার মধ্যে বাস করিত; আজও করে না এমন নয়। ইহাদের কথা ভুলিয়া গেলে ঐতিহাসিদের দায়িত্ব পালন করা হয় না।
বাঙলাদেশের শারীর-নৃতত্ত্বের আলোচনা কিছু কিছু হইয়াছে ও হইতেছে; কিন্তু সুপ্রাচীন কৌম সমাজ-বিন্যাসের গবেষণা বিশেষ কিছু হয় নাই বলিলেই চলে। গারো, কোচ, বহে, রাজবংশী, সাঁওতালদের সমাজশাসন সম্বন্ধে মোটামুটি তথ্য হয়তো আমাদের জানা আছে, কিন্তু হিন্দু সমাজের নিম্নতম স্তরে নানা শাসনগত সংস্কার এখনও সক্রয়; সেগুলির ঐতিহ্য-আলোচনা যথেষ্ট হয় নাই। এই সব কারণে বাঙলার সুপ্রাচীন কৌম সমাজ ও শাসন-বিন্যাস সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা কঠিন। মোটামুটি ভাবে এইটুকুই শুধু বলা চলে, আমাদের গ্রাম্য পঞ্চাযেতী শাসনযন্ত্র এই প্রাচীন কৌম সমাজের দান; পঞ্চায়েত কর্তৃক নির্বাচিত দলপতিই স্থানীয় কৌম শাসনযন্ত্রের নায়কত্ব করিতেন। মাতৃপ্রধান বা পিতৃপ্রধান কৌম ব্যবস্থানুযায়ী উত্তরাধিকার শাসন নিয়ন্ত্রিত হইত, এবং সামাজিক দণ্ডের ও নির্দেশের কর্তা ছিলেন। পঞ্চায়েতমণ্ডলী। কৌম সমাজ ও রাষ্ট্রবিন্যাসের বিবর্তন সম্বন্ধে অন্যত্র আলোচনা করিয়াছি, এখানে আর তাহা পুনরুক্তি করিয়া লাভ নাই। শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট যে, আলেকজান্দারের ভারত-আক্রমণ ও অব্যবহিত পরবর্তী মৌর্যাধিকার কালের আগেই বাঙলাদেশে কৌমতন্ত্র নিঃসন্দেহে রাজতন্ত্রে বিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল, এবং অনুমান হয়, কিছু পরেই মৌর্য রাষ্ট্র-বিন্যাসের প্রাদেশিক রূপও এদেশে প্রবর্তিত ও প্রতিষ্ঠিত হইয়া গিয়াছিল।
বাঙলার এই রাজতন্ত্রের আদি পরিচয় মহাভারতের দুই একটি কাহিনীতে এবং সিংহলী দীপবংশ-মহাবংশ পুরাণের বিজয়সিংহের গল্পে প্রথম পাওয়া যাইতেছে। মহাভারতে পৌণ্ডক-বাসুদেব নামে পুণ্ড্রদের এক রাজার কথা; ভীম কর্তৃক এক পৌণ্ডাধিপের পরাজয়ের কথা; বঙ্গ, তাম্রলিপ্ত, কর্বট, সুহ্ম প্রভৃতি কৌম রাজাদের কথা; দুর্যোধনসহায় এক বঙ্গরাজের কথা; রামায়ণে প্রাচীন বাঙলার কয়েকটি রাজবংশের কথা প্রভৃতি সমস্তই বাঙলার আদি রাজতন্ত্রের পরিচয় বহন করে। দীপবংশ-মহাবংশের বঙ্গ ও রাঢ়াধিপ সীহবাহুর কথা প্রভৃতি হইতে মনে হয়। খ্ৰীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতক হইতেই বোধ হয় বাঙলার বিভিন্ন কৌমতন্ত্র রাজতন্ত্রে বিবর্তিত হইতেছিল; কিন্তু এই বিবর্তন যখনই হউক, তাহার পরও বহুদিন পর্যন্ত ঐতিহ্যে ও লোকস্মৃতিতে কৌমতন্ত্রের স্মৃতিই যে শুধু জাগরূক ছিল তাহা নয়, ইতস্তত তাহার কিছু কিছু অভ্যাস এবং ব্যবস্থাও প্রচলিত ছিল। সমগ্ৰ দেশ বোধ হয় এক সঙ্গে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই।
০৩. প্রাথমিক রাজতন্ত্র
রাজতন্ত্রের নিঃসংশয় প্রমাণ ও পরিচয় পাওয়া যায়। খ্ৰীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্ৰীক ইতিহাস-কথিত গঙ্গারাষ্ট্রের বিবরণের মধ্যে। গঙ্গাহৃদি-গঙ্গারাষ্ট্রের সামরিক শক্তির এবং সেনাবিন্যাসের যে সংবাদ গ্ৰীক ঐতিহাসিকদের বিবরণীতে পাওয়া যায়, তাহা হইতে স্বভাবতই অনুমান করা চলে যে, দৃঢ়সম্বন্ধ সুবিন্যস্ত রাষ্ট্রশৃঙ্খলা ছাড়া সামরিক শক্তির এইরূপ বিন্যাস কিছুতেই সম্ভব হইত না। কিন্তু গঙ্গারাষ্ট্রের বাহিরে সমসাময়িক বাঙলার আর যে-সব রাজা ও রাষ্ট্র বিদ্যমান ছিল তাহাদের সঙ্গে গঙ্গারাষ্ট্রের কী সম্বন্ধ ছিল তাহা জানিবার কোনও উপায় নাই। তবে, মহাভারত ও সিংহলী পুরাণের কাহিনী হইতে মনে হয়, এই রাজ্যগুলিতেও রাষ্ট্ৰীয় সচেতনতার অভাব ছিল না। প্রয়োজন হইলে এই সব রাষ্ট্র সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইত, পররাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্ৰীয় সম্বন্ধের আদান-প্রদান করিতে এবং সময় সময় প্রয়োজন মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য ও রাষ্ট্র বৃহত্তর রাজ্য ও রাষ্ট্রের সঙ্গে একত্র গ্রথিতও হইত। পৌণ্ডক-বাসুদেব কাহিনীই তাহার প্রমাণ। অব্যবহিত পরবর্তী কালে (আনুমানিক খ্ৰীষ্টীয় ততীয়-দ্বিতীয় শতকে) বাঙলার অন্তত একাংশের রাষ্ট্র-বিন্যাসের একটু আভাস পাওয়া যায় মহাস্থানের শিলাখণ্ড লিপিটিতে। মৌৰ্য-আমলে উত্তর-বঙ্গ মৌর্য-রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল; উত্তর-বঙ্গে মৌর্য-শাসনের কেন্দ্র ছিল পুডিনগল বা পুণ্ড্রনগর, বর্তমান বগুড়া জেলার পাচ মাইল দূরে, মহাস্থানে। লিপিটিতে মহামাত্রের উল্লেখ দেখিয়া মনে হয়, জনৈক রাজপ্রতিনিধির নেতৃত্বে বাঙলায় তখন মৌর্য-শাসনযন্ত্র পরিচালিত হইত এবং জটিল ও সুসম্বন্ধ মৌর্য-রাষ্ট্রের প্রাদেশিক শাসনযন্ত্রের সুবিদিত রূপ তদানীন্তন বাঙলা দেশেও প্রবর্তিত হইয়াছিল। দেবপ্রিয়, প্রিয়াদশী রাজা অশোকের সুশাসন ও জন-কল্যাণাগ্রহের কথা সুবিদিত। দুর্ভিক্ষে বা এই জাতীয় কোনও প্রাকৃতিক অত্যায়িক কালে প্রজাদের বিপন্মুক্তির জন্য রাষ্ট্রের কোষ্ঠাগারাধক্ষ্য রাজকীয় শস্যভাণ্ডারের অর্ধেক শস্য পৃথক করিয়া রাখিবেন, রাজা শস্যবীজ ও খাদ্য দিয়া প্রজাদের অনুগ্রহ করিবেন; বিনিময়ে রাষ্ট্র প্রজাদের দিয়া দুৰ্গনির্মাণ বা সেতুনির্মাণ ইত্যাদি কাজ করাইয়া লইবেন অথবা শ্রম-বিনিময় না লইয়া এমনই দান করিবেন, কৌটিল্য তাহার অর্থশাস্ত্রে এইরূপ বিধান দিয়াছেন। ঠিক এই জাতীয় না হইলেও মহাস্থান লিপিটিতে অনুরূপ রাষ্ট্ৰ-নির্দেশেরই পরিচয় পাওয়া যাইতেছে এবং তাহা হইতে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার কিছুটা ইঙ্গিত ধরা যায়। পুণ্ড্রনগরে একবার কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে নিদারুণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়াছিল। এই উপলক্ষে প্রধান রাষ্ট্রকেন্দ্ৰ হইতে পুণ্ড্রনগরে অধিষ্ঠিত মহামাত্রকে দুইটি আদেশ দেওয়া হইয়াছিল, এই আকস্মিক বিপদ হইতে আশু মুক্তির জন্য। প্রথম আদেশটির স্বরূপ বলা কঠিন; লিপির প্রথম লাইনটি ভাঙিয়া যাওয়াতে এই অংশে কী ছিল জানা যায় না। দ্বিতীয়টিতে বিপদপীড়িত প্রজাদের (একমতে সংবঙ্গীয়দের; অন্যমতে ছবিগগীয় ভিক্ষুদের; ইহারা যাহারাই হউন, ইহাদের নেতার নাম ছিল গলদান) ধান্য এবং সম্ভবত সঙ্গে সঙ্গে গণ্ডক ও কাকনিক মুদ্রায় অর্থ সাহায্য করিবার আদেশও দেওয়া হইয়াছে। এই সাহায্য ঠিক দান নয়, ধার মাত্র; কারণ, রাষ্ট্র বা রাজা আশা ও ইচ্ছা প্রকাশ করিতেছেন, এই সাময়িক সাহায্যের ফলে প্রজারা বিপদ কাটাইয়া উঠিতে পরিবে এবং তাহার পর সুদিন ফিরিয়া আসিলে, দেশ শস্যসমৃদ্ধ হইলে প্রজারা আবার রাজকোষে অর্থ আর রাজকোষ্ঠীগারে ধান্য প্রত্যুপণ করিবে। এই ব্যবস্থা একটি সুনিয়ন্ত্রিত সুসংবদ্ধ শাসন-ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই।
