ইতোমধ্যে ভারতবর্ষের নানা জায়গায় প্রত্ন-উৎখনন। বেশ কিছু হয়েছে, প্রধানত প্রাগৈতিহাসিক ও আদি-ঐতিহাসিক প্রত্নস্থানগুলিতে, কিন্তু স্বল্প হলেও ঐতিহাসিক কালের কিছু কিছু প্রাচীন নগরের প্রত্ন-উৎখননও হয়েছে, যেমন অহিচ্ছত্রায়, উজ্জ্বয়িনীতে, কৌশাম্বীতে। নগর-নির্মাণের ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা-বিশ্লেষণ-আলোচনাও কিছু হয়েছে, বিদেশে, ভারতবর্ষেও। এ-সবের প্রেক্ষাপটে কিছুদিন আগে আমি নিজেও কিছু বিশ্লেষণ-আলোচনা করেছিলাম, প্রধানত প্রত্নবিষ্কারের উপর নির্ভর করে, যেহেতু বাধ্য হয়ে আমি এ সিদ্ধান্তে আগেই পৌঁছেছিলাম যে, সাহিত্য-নির্ভর নগর-নির্মাণ-সাক্ষ্যের উপর পুরাপুরি বিশ্বাস স্থাপন করা বড় কঠিন। উজ্জ্বয়িনীর প্রত্নখননলব্ধ বৃত্তান্ত আর ‘মেঘদূত”-এ কালিদাসের উজ্জ্বয়িনী-বর্ণনার পার্থক্য দুস্তর; ঐতিহাসিকের পক্ষে এই দুস্তর ব্যবধান পার হওয়া বড়ই মুশকিল!
কিছুদিন আগে সদ্যকথিত আমার আলোচনা-বিশ্লেষণ সম্বলিত বিস্তৃত নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে (“Rural-Urban Dichotomy in Indian Tradition and History,” in Annals of the Bhandarkar Oriental Research Institute, Golden Jubilee Volume, 1977-78, pp. 863 892)। সে নিবন্ধের বক্তব্য এখানে পুনরুল্লেখের কোনও প্রয়োজন নেই। তবে, সে-বক্তব্য অনুসরণ করে প্রাচীন বাঙলার নগরগুলি সম্বন্ধে সংক্ষেপে দু’চার কথা বলা যেতে পারে।
মোটামুটি দ্বিতীয় খ্ৰীষ্টােব্দ থেকে শুরু করে সপ্তম-অষ্টম শতক পর্যন্ত প্রাচীন বাঙলার বাণিজ্যসমৃদ্ধি ভালই ছিল; বাণিজ্যলব্ধ উদ্ধৃত্তি ধনও ছিল। তাম্রলিপ্তি ও Ganges বা গঙ্গাবিন্দর নগর, পুঞ্জনগর, কোটীবর্ষ, পঞ্চনগরী, কর্ণসুবর্ণ, প্রভৃতি সমস্তই সপ্তম-অষ্টম শতক পূর্ববর্তী। এ-সমস্ত নগরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হয় বাণিজ্যিক কারণে না হয় রাষ্ট্রশাসনের প্রয়োজনে, কিন্তু যে-প্রয়োজনেই হোক, নগরগুলি নির্মিত হয়েছিল বাণিজ্যলব্ধ উদ্ধৃত্তি ধনে। তাম্রলিপ্তি, পুণ্ড্রনগর (মহাস্থান), কোটীবর্ষ (বাণগড়), চন্দ্ৰকেতুগড় (= Gange গঙ্গানগর?); প্রভৃতি স্থানের প্রত্নাবশেষই তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রমাণ বহন করে। এসব জায়গার পোড়ামাটির যে-সব নিদর্শন ইত্যাদি পাওয়া গেছে তার মধ্যে নাগরিকতার ছাপ তো সুস্পষ্ট। গঙ্গাবিন্দরের বিলুপ্তি বোধ হয় কিছু আগেই ঘটে থাকবে; অষ্টম শতক থেকে তাম্রলিপ্তি বন্দর নগরের কথাও আর শোনা যাচ্ছে না। অন্য প্রকৃতির, প্রধানত রাজধানী বা রাষ্ট্রশাসনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে নগরের কথা অবশ্যই শোনা যাচ্ছে, যেমন চন্দ্ররাজাদের রাজধানী সমতটান্তর্গত ক্ষীরোদানদী তীরবর্তী (বর্তমান কুমিল্লা শহরের অদূরে)। চণ্ডীমুড়া পাহাড়ের উপর দেবপর্বত, বিক্রমপুর (বজ্রযোগিনী-পাইকপাড়া-রামপাল), রামাবতী, লক্ষ্মণাবতী, বিজয়পুর, বিজয়নগর প্রভৃতি। কিন্তু এ-সব নগরের এমন কোনও প্রত্নাবশেষ আমাদের সামনে নেই যা থেকে এদের আকৃতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা কিছু করা যেতে পারে। ঐতিহাসিকের বিস্ময় এই যে, পালসম্রাটদের মতো প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী রাজবংশেরও কেহ কোনও রাজধানী নির্মাণ করেননি, এমন কি ধর্মপাল-দেবপালও নন। জয়স্কন্ধাবার (military encampment) থেকেই তারা রাজকাৰ্য নির্বাহ করতেন; সেখান থেকেই তাদের যাবতীয় শাসননির্দেশ নিৰ্গত হত। তাদের ও চন্দ্র-বর্মণ-সেন রাজাদের ভূমিদানি পট্টোলীগুলিরও অধিকাংশই নিৰ্গত হয়েছিল “বিজয়স্কন্ধাবার” থেকে। এর কারণ কী? এ-পর্বের নগরগুলি কি ছিল গ্রামেরই বৃহত্তর, সমৃদ্ধতির সংস্করণ মাত্র? আকৃতিতে পার্থক্য ছিল নিশ্চয়ই কিন্তু প্রকৃতিতেও কি তা-ই ছিল? বোধ হয় তাই! একান্ত গ্রাম-নির্ভর কৃষিনির্ভর অর্থবিন্যস্ত সমাজে নগরের রূপ ও চরিত্র অন্য কিছু হবার কথা নয়।
০৯. রাষ্ট্র-বিন্যাস
০১. যুক্তি ও উপাদান – রাষ্ট্র-বিন্যাস
প্রাচীন বাঙলার সমাজ-বিন্যাসের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখিতে হইলে রাষ্ট্র-বিন্যাসের চেহারাটাও একবার দেখিয়া লওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যক্তিবিশেষের খেয়াল মাত্র নয়, অর্থশাস্ত্ৰ-দণ্ডশাস্ত্র অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ব্যাকরণের উদাহরণ মাত্র নয়; সমসাময়িক সমাজেরই রূপ কমবেশি রাষ্ট্রে প্রতিফলিত হয়, সেই সমাজের প্রয়োজনেই রাষ্ট্র গড়িয়া উঠে, অর্থশাস্ত্ৰ-দণ্ডশাস্ত্র রচিত হয়। কোনও শাস্ত্রের রীতিপদ্ধতি অচল ও সনাতন নয়; যখন সমাজের রূপ যেমন সামাজিক আদর্শ যেমন, সেই অনুযায়ী রাষ্ট্র গঠিত হয়, শাস্ত্র রচিত হয়; সেই রূপ ও আদর্শ যখন বদলায়, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় শাস্ত্রও বদলায়। কৌটল্যের অর্থশাস্ত্র বা শুক্রাচার্যের শুক্রনীতিসার সর্বদেশ সর্বকালে প্রযোজ্য নয়; সমসাময়িক কাল ও তদোক্ত দেশের রাষ্ট্রবিন্যাস-ব্যাখ্যায়ই তাহারা সহায়ক। কিন্তু সহায়ক মাত্ৰই, তাহার বেশি নয়।
প্রাচীন বাঙলার রাষ্ট্রবিন্যাস-ব্যাখ্যায়। এই ধরনের কোনও শাস্ত্ৰ-সহায় আমাদের সম্মুখে উপস্থিত নাই। যাহা আছে তাহা রাষ্ট্রযন্ত্রের বাস্তব ক্রিয়াকর্মের এবং বিভিন্ন শাখা-উপশাখার, বিভাগ-উপবিভাগের পরিচয়জ্ঞাপক কতকগুলি রাজকীয় দলিল-ভূমি দান-বিক্রয়ের পট্টি বা পটা ৷ ইহা স্বাভাবিক ও সহজবোধ্য যে, এই ধরনের পট্রে রাষ্ট্র-বিন্যাস সংক্রান্ত সকল সংবাদ পাওয়া সম্ভব নয়; ভূমি দান-বিক্রয়ের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের যে-অংশের পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন হইয়াছে সেইটুকুই শুধু আমরা পাইতেছি এবং পরোক্ষভাবে আরও কিছু কিছু সংবাদের ইঙ্গিত পাইতেছি। এই সব সংবাদ ও সংবাদের ইঙ্গিত কিছু কিছু প্রাচীনতর অর্থশাস্ত্ৰ-দণ্ডশাস্ত্রের ব্যাখ্যার সাহায্যে স্ফুটন্তর হয়, সন্দেহ নাই; কিন্তু এমন সংবাদও আছে যাহা এই সব শাস্ত্ৰে নাই, যাহা বিশেষ স্থান ও বিশেষ কালেরই সংবাদ। একাদশ-দ্বাদশ শতকের সমসাময়িক সাহিত্যগ্রন্ত হইতেও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত দুই একটি টুকরা-টাকরা খবর জানা যায়।
