বস্তুত, প্রাচীন বাঙলার কৃষিজীবী গ্রাম্য বাঙালী গৃহস্থের পরম এবং চরম কামনাই হইতেছে, ‘বিষয়পতি অর্থাৎ স্থানীয় শাসনকর্তা যেন লোভহীন হন, ধেনুদ্বারা গৃহ যেন পবিত্র হয়, ক্ষেত্রে যেন চাষ হয়, এবং গৃহিণী যেন অতিথিসৎকারে কখনও ক্লান্ত না হন। কবি শুভাঙ্ক পল্লীবাসী ভদ্র গৃহস্থের এই কামনাটি ব্যক্ত করিয়াছেন (সদুক্তিকর্ণামৃত)।
বিষয়পতিরলুদ্ধো ধেনুভির্ধাম পূতং
কতিচিন্দভিমতায়াং সীম্নি সীরা বহন্তি।
শিথিলয়তি চ ভাৰ্যা নাতিথেয়ী সপর্যাম
ইতি সুকৃতমানেন ব্যঞ্জিতং নঃ ফলেন ৷
লক্ষ্মণসেনের সুহৃদ ও সভা-কবি শরণ গ্রাম্যজীবনের আর একটি ছবি রাখিয়া গিয়াছেন; এই ছবিটি উদ্ধার করিয়াই এই অধ্যায় শেষ করা যাইতে পারে। ছবিটি সুন্দর, বস্তুনির্ভর এবং চমৎকার কাব্যচিত্রময়।
এতাস্তা দিবাসাম্ভভাস্করসদৃশ্যে ধাবন্তি পৌরাঙ্গনাঃ
স্কন্ধপ্রস্থলদংশুকাঞ্চলধূতিব্যাসঙ্গবদ্ধান্দরাঃ।
প্রান্তৰ্যাতকৃষীবালাগামভিয়া প্রোৎপুত্যবর্তৃচ্ছিদো
হট্টক্রয্যপদার্থমূল্যকলন বাগ্রাঙ্গুলিগ্রন্থয়ঃ ৷। (সদুক্তিকর্ণামৃত)
এই তো দ্রুত ছুটিয়া চলিয়াছে পৌরাঙ্গনারা; তাহাদের চক্ষু দিবসােন্ত সূর্যের মত (অরুণবর্ণ); দ্রুত গমন হেতু তাঁহাদের স্কন্ধের অঞ্চল বারংবার খসিয়া পড়িতেছে আর বার বার তাহা তুলিয়া দিবার জন্য তাহারা ব্যগ্ৰ। ঘরের চাষী (স্বামী-পুত্ৰ-ভ্রাতারা) প্ৰাতঃকালে বাহির হইয়া গিয়াছে (মাঠের কাজে); তাহাদের (ঘরে) ফিরিয়া আসিবার সময় হইয়াছে ভাবিয়া মেয়েরা লাফাইয়া লাফাইয়া পথ ছেদন করিতেছে (অর্থাৎ সংক্ষেপ করিয়া আনিতেছে), (অথচ সেই অবস্থাতেই) তাহারা হাটে ক্রয়-বিক্রয়ের মূল্য আঙ্গুলো গুণিতে ব্যস্ত।
০৮. সংযোজন (গ্রাম ও নগর-বিন্যাস)
কী পশ্চিমবঙ্গে কী বাঙলাদেশে ইতোমধ্যে এমন কোনও উৎখনন বা প্রত্নানুসন্ধান কোথাও হয়নি’ যাতে নগর ও নগরের আকৃতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে বস্তুনির্ভর ধারণা কিছু করা যেতে পারে। এ-গ্ৰন্থ রচনাকালে এক রামপাল ছাড়া এ ধরনের বস্তুনির্ভর সাক্ষ্য আর কোথাও ছিল না; রামপালের সাক্ষ্যও প্রত্নবিজ্ঞানের দিক থেকে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়। তা যাই হোক, নগর সম্বন্ধে গ্রন্থের পূর্ববর্তী সংস্করণ দু’টিতে যা বলা হয়েছিল তা প্রায় সমস্তই হয় লিপি না হয় কাব্য-সংক্ষ্যের উপর নির্ভর করে; যেমন, রামাবতী বা বিজয়পুরের বর্ণনা প্রধানত যথাক্রমে রামচরিত ও পবনদূত-নির্ভর। অন্যান্য নগরের সাক্ষ্য হয়। য়ুয়ান-চোয়াঙের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত, না হয় গ্ৰীক বা লাতিন বৃত্তান্ত, না হয় প্রাচীন পালিগ্রন্থ বা এই জাতীয় কিছু। বলা বাহুল্য এ-সব সাক্ষ্য নির্ভরযোগ্য হ’লেও অত্যন্ত অপ্রচুর, কিছুটা অস্পষ্টও বটে। আর, লিপিমালার সাক্ষ্য কাব্য-সংক্ষ্যেরই অনুরূপ; উচ্ছসময় অত্যুক্তি ও অলংকারপ্রিয় কবিদের বস্তুসম্বন্ধবিহীন কল্পনা ভেদ করে নগরের যথার্থ চিত্র বা আকৃতি-প্রকৃতি নির্ণয় প্রায় দুঃসাধ্য।
ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে চন্দ্ৰকেতুগড়ে ও কর্ণসুবৰ্ণে কিছু উৎখনন হয়েছে। কিন্তু চন্দ্ৰকেতুগড়ের উৎখননে যদিও নগর-নির্মাণের আভাস কিছু পাওয়া যায়, সে-আভাস অত্যন্ত অস্পষ্ট, প্রচুর তো নয়ই; আর, কর্ণসুবর্ণের রাজবাড়ীড়াঙ্গার উৎখননে যা পাওয়া গেছে তা একটি বৌদ্ধ-বিহারের, ঠিক নগরের নয়। বাঙলাদেশে ময়নামতী-উৎখনন সম্বন্ধেও একই উক্তি প্রযোজ্য। এখানকার তথাকথিত শালবনবিহার যথার্থত ভবদেবী-মহাবিহার। বিহার নগরোপম হলেও তার চরিত্র ঠিক নগরের চরিত্র নয়; সে-চরিত্র সোমপুর মহাবিহার বা নালন্দা বা বিক্রমশিলা মহাবিহারেরই অনুরূপ। তা ছাড়া, দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, চন্দ্ৰবংশীয় রাজা শ্ৰীচন্দ্রের পশ্চিমভাগ পট্টোলীতে জানা যাচ্ছে যে, রাজা শ্ৰীচন্দ্ৰ শ্ৰীহট্ট মণ্ডলে তার নিজের নামাঙ্কিত শ্ৰীচন্দ্রপুরে একটি বিরাট ‘ব্ৰাহ্মণপুর’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ব্ৰাহ্মণপুর আর কিছুই নয়, নৃত্যুনাধিক ৬০০০ ব্ৰাহ্মণ-আধুষিত এবং প্রায় সমসংখ্যক কী তারও বেশি সেবক-সেবিত একটি বিস্তৃতায়তন ব্ৰাহ্মণ্য মঠ, বোধ হয়, বৌদ্ধ নালন্দা মহাবিহারেরই মতো। সন্দেহ নেই, শ্ৰীহট্ট-সুরমা-বরাক উপত্যকা অঞ্চলকে এইভাবেই সর্ব-ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির স্বাঙ্গীকৃত করা হচ্ছিল, যার প্রাচীনতর সাক্ষ্য ভাস্করবর্মর নিধনপুর লিপি। কিন্তু তৎসত্ত্বেও, শ্ৰীচন্দ্রপুর-ব্রাহ্মণপুর নগরোপম হওয়া সত্ত্বেও, তাকে যথার্থতা নগর বলা কঠিন।
মানব-সভ্যতার ইতিহাসে নগর-নির্মাণের একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে, যার সঙ্গে সামাজিক ধনোৎপাদনের, তার রীতি-পদ্ধতির এবং উদ্ধৃত্তি ধনের সম্বন্ধ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এই তাৎপর্যের উপরই গ্রাম ও নগরের চেহারা ও চরিত্রের যত পার্থক্য তা নির্ভর করে। এ-গ্রন্থের পূর্ববর্তী সংস্করণে এই চেহারা ও চরিত্র-পার্থক্যের দিকে আমি কিছু ইঙ্গিত করেছিলাম। প্রাচীন বঙ্গদেশে একদিকে সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী পূর্ববর্তী এবং অন্যদিকে তার পরবতী নগরগুলি সম্বন্ধে যে পার্থক্য বিদ্যমান তার দিকেও কিছুটা ইঙ্গিত করেছিলাম। সে-ইঙ্গিতের পশ্চাতে ছিল আমার মনে তদানীন্তন বাঙালী-সমাজের ধনোৎপাদন ও উদ্ধৃত্তি ধনের ভাবনা। কিন্তু, যে-ভাবে আমি নগর-বৃত্তান্ত বলেছিলাম তাতে আমার এই ভাবনা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি; তা ছাড়া, লিপি-সাক্ষ্য ও কাব্য-সাক্ষ্য সম্বন্ধে আমার আরও সন্দিহান হওয়া উচিত ছিল।
