নাগরিক ঐশ্বর্যবিলাসাড়ম্বরের চিত্র এইখানেই শেষ নয়। নানাপ্রকার সূক্ষ্ম বস্ত্ৰ, মণিরত্নখচিত ধাতব অলঙ্কার, স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈজসপত্র, প্রাসাদোপম সৌধাবলী, মন্দির ইত্যাদির বর্ণনায় দশম-একাদশ শতক-পরবর্তী লিপিগুলি এবং সমসাময়িক নাগর-সাহিত্য প্রায় ভারাক্রান্ত। সপ্তম শতকে ইৎসিঙ প্রয়োজন ও ক্ষমতার অতিরিক্ত বৃহৎ সমাজিক ভোজের অপব্যবস্থার কথাও বলিয়াছেন; বাঙলাদেশের গ্রামে নগরে সর্বত্র এই বৃহৎ সামাজিক অপব্যয় আজও অব্যাহত চলিতেছে। বিজয়সেনের দেওপাড়া প্রশস্তিতে একটি অর্থবহ শ্লোক আছে। গ্রাম্য ব্রাহ্মণ মেয়েরা মুক্তা, স্বর্ণ, রৌপ্য, মরকত প্রভৃতি দেখিতে অভ্যস্ত ছিলেন না; কার্পাস-বীজ, শাকপত্র, অলাকৃপাম্প, দাড়িম্ব-বীচি, কুষ্মাণ্ডপুষ্পই তাহাদের অধিকতর পরিচিত। কিন্তু বিজয়সেনের কল্যাণে অনেক ব্ৰাহ্মণ-পরিবার নগরবাসী হইয়াছিলেন এবং বিত্তবানও হইয়াছিলেন। তখন নাগরীরা (নাগরীভিঃ) ব্রাহ্মণীদের মুক্তা, রৌপ্য, স্বর্ণ, মরকত প্রভৃতি চিনিতে শিখাইয়াছিলেন। ইহার মধ্যে কবিজনোচিত অত্যুক্তি আছে সন্দেহ নাই; কিন্তু গ্ৰাম্য নারী এবং নগরের নাগরীদের প্রকৃতি-পার্থক্যের যে-ইঙ্গিত আছে তাহাও লক্ষণীয়।
সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন শ্লোকে গ্রাম্য ও নাগর সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রকৃতি-পার্থক্য খুব সুন্দর ফুটিয়াছে। আপেক্ষিক তুলনার জন্য এই শ্লোকগুলি পর পর উদ্ধার করা যাইতে পারে।
পল্লীগ্রামের লোকেরা নগরবাসিনীদের চালচলন পছন্দ করিতেন না। কবি গোবর্ধনাচার্য বলিতেছেন :
ঋজুনা নিধেহিচরণৌ পরিহর সখি নিখিলনাগারাচারম ৷
ইহ ডাকিনীতি পল্লীপতিঃ কটাক্ষেহপি দণ্ডয়তি ৷।
ওগো সখি, ঋজুভাবে পদক্ষেপ করিয়া চল, নাগরাচার সব পরিত্যাগ করা। কটাক্ষপাত করিলেও গ্রামপতি এখানে ডাকিনী বলিয়া ভৎর্সনা করে।
এই প্রকৃতি-পার্থক্য এখনও কি সত্য নয়? ইহারই সঙ্গে বঙ্গীয় (অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণবঙ্গীয়) নগরবাসিনী গৃহস্থ বারাঙ্গনাদের বেশভূষার বর্ণনা উদ্ধার করা যাইতে পারে। জনৈক অজ্ঞাতনামা কবি বলিতেছেন :
বাসঃ সূক্ষ্মং বপূষি ভূজয়োঃ কাঞ্চনী চাঙ্গদীশ্ৰীর
মালাগর্ভঃ সুরভিমসূণৈর্গন্ধ তৈলৈঃ শিখণ্ডঃ।
কৰ্ণোত্তংসে নবশশিকলা নিৰ্মলং তালপত্ৰং
বেশঃ কেষাং ন হরতি মনো, বঙ্গবারাঙ্গনাম ৷।
দেহে সূক্ষ্ম, ভূজবন্ধে সোনার অঙ্গদ, গন্ধতৈলের সুরভিযুক্ত মসৃণ কেশ শিখণ্ড বা চূড়ার মতো করিয়া বাঁধা এবং তোহা মালাগর্ভ (অর্থাৎ ফুলের মালা কেশচূড়ায় জড়ান); কর্ণালতিকায় নবশশিকলার মতো নির্মল তালপাতার অলঙ্কার-বঙ্গবারাঙ্গনাদের এই বেশ কাহার না মন হরণ করে!
অথচ, ইহারই পাশে পাশে জনৈক কবি চন্দ্ৰচন্দ্রের পল্লী-বিলাসিনীদের বর্ণনা লক্ষণীয়–
ভালে কজ্জ্বল বিন্দুরিন্দু কিরণস্পধী মৃণালাঙ্কুরো
দোৰ্বল্লীষু শলাটুফেনিলফলোত্তংসশাচ কর্ণাতিথিঃ।
ধম্মিল্লস্তিলপল্লবাভিষবণম্বিন্ধঃ স্বভাবাদয়ং
পাস্থান মন্থরয়তনাগর বন্ধুবৰ্গস্য বেশগ্ৰহঃ ॥
কপালে কজ্জ্বলবিন্দু, হস্তে ইন্দুকিরণস্পর্শী শ্বেত পদ্মডাটার বলয়, কৰ্ণে কোমল রীঠাফুলের কর্ণাভরণ, কেশ স্নানস্নিগ্ধ এবং কবরীতে তিলপল্লব নিবদ্ধ–পল্লীবধুদের এই বেশ স্বতঃই পান্তদের গমন মন্থর করিয়া আনে।
কবি শুভঙ্ক বলিতেছেন, নগরে রাজসৌধাবলীর বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে যুবতীদের ক্রীড়াযুদ্ধে ছিন্নহারের মুক্তাসমূহ বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িতে থাকে। সেখানে ‘বিলাসগৃহে পিঞ্জীরস্থিত শুক’; রাজপ্রাসাদে মূল্যবান প্রস্তরখচিত ফুল, কণ্ঠহার, কর্ণাঙ্গুরী, স্বর্ণখচিত বলয় এবং নুপুর পরিধান করিয়া ভূত্যাঙ্গনারা ঘূরিয়া বেড়ায়; নগর প্রাসাদশিখরে দাঁড়াইয়া নগররাঙ্গনারা নিম্নে রাজপথে চলমান সুদৰ্শন যুবকের উপর কামকটাক্ষ নিক্ষেপ করেন। (সদুক্তিকর্ণামৃত)।
অথচ, অন্যদিকে গ্রাম্যজীবনের একাংশে নিষ্করুণ দারিদ্র্য। কবি বার ও অন্য একজন অজ্ঞাতনামা কবি এই দারিদ্র্যের ছবিও আমাদের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন। অন্যত্র এই শ্লোক দুইটি উদ্ধার করা হইয়াছে (রাষ্ট্রবিন্যাস-অধ্যায়ের উপসংহার দ্রষ্টব্য)। জীবনের সেই দিকটায়
“নিরানন্দে দেহ শীর্ণ, পরিধানে জীর্ণবস্ত্র; ক্ষুধায় শিশুদের চক্ষু ও পেট কুক্ষিগত, আকুল হইয়া তাহারা খাদ্য প্রার্থনা করিতেছে। দীনা দুঃস্থ গৃহিণী চক্ষুর জলে আনন ধৌত করিয়া প্রার্থনা করিতেছেন, এক মান তণ্ডুলে যেন তাহাদের একশত দিন চলে।’
আর একটি পরিবারেও একই চিত্ৰ।
“শিশুরা ক্ষুধায় পীড়িত, তাহাদের দেহ শবের মতো শীর্ণ, আত্মীয়-স্বজনেরা মন্দাদর, পুরাতন ভগ্ন জলপাত্রে একফোটা মাত্র জল ধরে; গৃহিণীর পরিধানে শতচ্ছিন্ন বস্ত্ৰ’
(সদুক্তিকর্ণামৃত)।
গ্রাম্য সমৃদ্ধির ছবিও আছে। তেমন দুইটি শ্লোক দেশ-পরিচয় অধ্যায়ে জলবায়ু বর্ণনা-প্রসঙ্গে উদ্ধার করিয়াছি। একটি ছবি এইরূপ :
‘বর্ষায় প্রচুর জল পাইয়া ধান চমৎকার গজাইয়া উঠিয়াছে; গরুগুলি ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছে; ইক্ষুর সমৃদ্ধিও দেখা যাইতেছে। অন্য কোনো ভাবনা আর নাই। ঘরে গৃহিণী সারাদিনের শেষে প্রসাধনরতা। বাহিরে আকাশ হইতে জল ঝরিতেছে প্রচুর। গ্ৰাম্য যুবক সুখে নিদ্রা যাইতেছে।‘
অন্য আর একটি ছবি :
‘হেমন্তে কাটা শালি ধান্যে চাষীর গৃহাঙ্গন স্তুপীকৃত; নবজাত শ্যামল যাবান্ধুর ক্ষেত্ৰসীমা ছাড়াইয়া যেন বিস্তৃত; গরু, র্যাড় ও ছাগলগুলি ঘরে ফিরিয়া আসিয়া নূতন খড় খাইয়া তৃপ্তি ও আনন্দ পাইতেছে; গ্রামগুলি ইক্ষুপেষণযন্ত্রের শব্দে মুখর আর নূতন গুড়ের গন্ধে আমোদিত (সদুক্তিকর্ণামৃত)।
