সকল নগরই যে এইরূপ সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যবান ছিল, এমন বলা যায় না। অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগরও ছিল যাহাদের সামরিক বা রাষ্ট্রীয় বা অন্য কোনও গুরুত্ব যথেষ্ট ছিল না, প্রধানত স্থানীয় শাসনাধিষ্ঠানের কেন্দ্ররূপেই। যাহাদের পত্তন হইয়াছিল। বিষয়াধিষ্ঠান, মণ্ডল্যাধিষ্ঠান, বীথী-অধিষ্ঠান প্রভৃতি জাতীয় নগর সর্বত্র উপরোক্ত নগরগুলির মতো সমৃদ্ধ নিশ্চয়ই ছিল না। ছোট ছোট তীর্থ বা শিক্ষাকেন্দ্রগুলিও তোহা ছিল না। এগুলি বরং অনেকটা বৃহৎ সমৃদ্ধ গ্রামের মতনই ছিল বলিয়া অনুমান হয়। ছোট ছোট বাণিজ্যকেন্দ্রগুলিও তাঁহাই ছিল। বিষয়, মণ্ডল বা বীথীর অধিষ্ঠানগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজস্ব সংগ্রহের, স্থানীয় বিচার-ব্যবস্থর, ভূমি-ব্যবস্থার, শান্তিরক্ষা-ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ-কেন্দ্র। কিছু কিছু স্থানীয় বাণিজ্যকর্যও এই সব কেন্দ্রে নির্বাহিত হইত। এইসব উপলক্ষে কিছু কিছু রাজকর্মচারী, শিল্পী, বণিক প্রভৃতির এ-জাতীয় অধিষ্ঠানগুলিতে বাসও করিতেন; কিন্তু তৎসত্ত্বেও গ্রামের সঙ্গে এই জাতীয় নগরের বিশেষ কিছু পার্থক্য ছিল না। অধিকাংশ লিপির সাক্ষ্যেই দেখা যায়, এই জাতীয় ছোট ছোট নগরের সঙ্গে গ্রামগুলি একেবারে সংলগ্ন; নগরের পথ গ্রামে গিয়া মিশিয়াছে, অথবা গ্রামের পথ নগর পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছে। নিকটস্থ গ্রামের উৎপাদিত কৃষি ও শিল্পবস্তু লইয়াই এই সব ছোট ছোট নগরের স্থানীয় ব্যাবসা-বাণিজ্য। অবশ্য, কোটীবর্ষ-বিষয়ের অধিষ্ঠান কোটীবর্ষ-নগর সম্বন্ধে একথা বলা চলে না, কারণ এই নগরের গুরুত্ব ও মর্যাদা শুধু বিষয়াধিষ্ঠান বলিয়া নয়, তীর্থ এবং ধর্মকেন্দ্র ও আন্তর্দেশিক ব্যাবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসাবেও ইহার অন্যতর গুরুত্ব এবং মর্যাদা ছিল।
০৭. গ্রামীণ ও নগর সভ্যতা এবং সংস্কৃতির প্রকৃতি
আগেই বলিয়াছি, নগরগুলি ব্যাবসা-বাণিজ্যলব্ধ ধনের প্রধান সঞ্চয়-কেন্দ্র ছিল; তাহা ছাড়া গৃহশিল্প ও কৃষিলব্ধ ধনের প্রধান বণ্টন-কেন্দ্রও ছিল নগরগুলি। তাহার ফলে সামাজিক ধনের অধিকাংশই কেন্দ্রীকৃত হইত নগরে এবং অল্পসংখ্যক নগরবাসীই সেই ধনের অপেক্ষাকৃত অধিকাংশ ভোগের সুযোগ ও অধিকার লাভ করিত। ইহাই নগরগুলির ঐশ্বর্য, বিলাস ও আড়ম্বরের মূলে। বস্তুত, পাল ও সেন আমলের লিপি ও সমসাময়িক সাহিত্যপাঠে মনে হয়, নগর ও গ্রামের প্রথম এবং প্রধান পার্থক্যই যেন নির্ণীত হইত ঐশ্বর্য বিলাসাড়ম্বরের তারতম্যদ্বারা। রামচরিতে রামাবতীর এবং পবনদূতে বিজয়পুরের বর্ণনায় দেখিতেছি, রাজপথের দুইধারে চলিয়াছে প্রাসাদের শ্রেণী, নগরে সঞ্চিত প্রচুর মণিরত্ন সম্ভার। রাজতরঙ্গিনী-গ্রন্থে পুণ্ড্রবর্ধন নগরের নাগরিকদের ধনৈশ্বর্যের বর্ণনা আছে বাররামা নর্তকী কমলার গল্প প্রসঙ্গে; কিন্তু তাহারও আগে তৃতীয়-চতুর্থ শতকে বাঙলাদেশের নগরগুলি যখন সদাগরী বাণিজ্যলব্ধ ধনে সমৃদ্ধ তখন বাৎস্যায়ন এদেশের নগর ও নগর সভ্যতার কিছু আভাস রাখিয়া গিয়াছেন। বাৎস্যায়নের কামসূত্র সমসাময়িক ভারতীয় নাগর-সভ্যতার ইতিহাস এবং নাগর যুবক-যুবতীদের অনুশীলন-গ্ৰন্থ। তিনি এই নাগর-সভ্যতারই জয়গান করিয়াছেন এবং নাগরাদর্শকেই বিদগ্ধ সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদর্শ বলিয়া পাঠকের সম্মুখে তুলিয়া ধরিতে চেষ্টা করিয়াছেন, তদানীন্তন শিক্ষা, রুচি ও সংস্কারানুযায়ী। বাঙলাদেশের সমসাময়িক নাগর-সভ্যতা সম্বন্ধেও তাহার কিছু বক্তব্য আছে। গৌড়ের নগরপুষ্ট অবসরসমৃদ্ধ নরনারীদের ক্যামলীলা ও ঐশ্বর্যবিলাসের সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুস্পষ্ট চিত্র তিনি রাখিয়া গিয়াছেন। গৌড় নাগরকেরা যে লম্বা লম্বা নখ রাখিতেন এবং সেই নখে রং লাগাইতেন যুবতীদের মনোহরণ করিবার জন্য, তাহাও বাৎস্যায়ন লিখিয়া যাইতে ভুলেন নাই। গৌড় ও বঙ্গের রাজপ্রাসােদান্তঃপুরের নারীরা প্রাসাদের ব্ৰাহ্মণ, রাজকর্মচারী, ভৃত্য ও দাসদের সঙ্গে কিরূপ লজ্জাকর কামষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইতেন তাহার সাক্ষ্যও বাৎস্যায়ন দিতেছেন। নাগর অভিজাত শ্রেণীর অবসর এবং স্বল্পায়াসলব্ধ ধনপ্রাচুর্য তাহাদিগকে ঐশ্বৰ্য্য-বিলাস এবং ক্যামলীলার চরিতার্থতার একটা বৃহৎ সুযোগ দিতা; বাৎস্যায়নে তাহার আভাস সুস্পষ্ট। অভিজাত গৃহে নর্তকী-বিলাসের ইঙ্গিতও বাৎস্যায়ন দিয়াছেন। কিন্তু শুধুই বাৎস্যায়ন নহেন; কহলন তাহার রাজতরঙ্গিনীতে অষ্টম শতকের পুণ্ড্রবর্ধন-নগরের নর্তকী কমলার কথা বলিতেছেন। কমলা নগরের কোনও মন্দিরের দেবদাসী বা নর্তকী ছিলেন, নৃত্যে-গীতে সুদক্ষা এবং অন্যান্য কলাবিদ্যায় নিপুণ। বস্তুত, বাৎস্যায়ন এই সব নর্তকী ও সভােনারীদের যে-সব কলানিপুণতা থাকা প্রয়োজন বলিয়া বৰ্ণনা করিয়াছেন, কমলার তাহাই ছিল। অভিজাত নাগর যুবকদের মনোরঞ্জন করিয়া কমলা প্রচুর ধনৈশ্বর্যের অধিকারিণী হইয়াছিলেন। সমসাময়িক নাগর অভিজাত সমাজে এই প্রথা কিছু নিন্দনীয় ছিল না। তাহা না হইলে সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিতে এবং ধোয়ী-কবি পবনদূতে যে-ভাষায় নাগর-বাররামাদের স্তুতিবাদ করিয়াছেন তাহা কিছুতেই হয়তো সম্ভব হইত না; বরং ইহাদের বর্ণনা হইতে মনে হয়, নাগর অভিজাত সমাজে নর্তকী, সাভানারী, বাররামা, দেবদাসীরা অপরিহার্য অঙ্গ বলিয়াই বিবেচিত হইতেন। ভট্ট ভবদেবের প্রশস্তি, বিশ্বরূপ ও কেশবসেনের লিপিগুলিতেও ইহাদের উচ্ছসিত স্তুতিবাদের সাক্ষাৎ মেলে। বিজয়সেন (দেওপাড়া লিপি) ও ভট্ট ভবদেব তাহাদের নির্মিত মন্দিরে শত শত দেবদাসী নিযুক্ত করিয়াছিলেন; তাহাদের সৌন্দর্য ও কামাকৰ্ষণ বর্ণনায় প্রশস্তিকারেরা অজস্ৰ স্তুতিবাদ বর্ষণ করিয়াছেন। রামাবতীর নারীদের সম্বন্ধে রামচরিতের কবিও তাহাই করিয়াছেন।
