মেহারকুল
দামোদর দেবের মোহার লিপিতে (১১৫৬ শক) মেহারকুল বা মৃকুল নামে একটি নগরের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। বর্তমান চট্টগ্রাম জেলার মোহার গ্রাম এই নগরের স্মৃতি আজও বহন করিতেছে।
পূর্ব-বাঙলার বৃহত্তম প্রাচীন নগর শ্ৰীবিক্রমপুর। বিক্রমপুর চন্দ্ৰ, বৰ্মণ, সেন ও দেববংশীয় রাজাদের অন্যতম প্রধান জয়স্কন্ধাবার। পাল রাজাদের মতো সেন রাজাদেরও কয়েকটি রাজধানী বা জয়স্কন্ধাবার ছিল, তন্মধ্যে বিক্রমপুরই সর্বপ্রধান ছিল বলিয়া মনে হয়। এই “শ্ৰীবিক্রমপুরসমাবাসিত শ্ৰীমজ্জয়স্কন্ধাবারাৎ” বিজয়সেনের একটি বল্লালসেনের একটি, এবং লক্ষ্মণসেনের রাজত্বের প্রথম ছয় বৎসরের মধ্যে অন্তত পাচটি শাসনলিপি নিৰ্গত হইয়াছিল। এই বিক্রমপুর জয়স্কন্ধাবারেই বিজয়সেন-মহিষী বিরাট তুলাপুরুষ মহাদানযজ্ঞ সম্পাদন করাইয়াছিলেন। সুতরাং জয়স্কন্ধাবার অস্থায়ী ছত্রাবাস মাত্র, একথা কিছুতেই সত্য হইতে পারে না। লক্ষ্মণসেনের দুইটি লিপি এবং বিশ্বরূপ ও কেশবসেনের লিপিগুলি কিন্তু বিক্রমপুর হইতে নিৰ্গত নয়। বিক্রমপুর-জয়স্কন্ধাবার কি পরিত্যক্ত হইয়াছিল; না এই পরিবর্তন আকস্মিক? যে ধার্যগ্রাম ও ফলগুগ্রাম হইতে এই লিপিগুলি উৎসারিত, সে-গ্রাম দুইটিই বা কোথায়?
বিক্রমপুর নামে একটি সুবিস্তৃত পরগণা এখনও ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমা ও ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ জুড়িয়া বিস্তৃত। বিক্রমপুর নামে একটি গ্রাম প্রাচীন দলিলপত্ৰেও উল্লিখিত দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু ঢাকা-ফরিদপুরে আজ আর কোনও গ্রামই বিক্রমপুর নামে পরিচিত নয়।
মুন্সীগঞ্জ মহকুমার মুন্সীগঞ্জ শহরের অদূরে সুপ্রসিদ্ধ বজ্রযোগিনী (অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি) এবং পাইকপাড়া গ্রামের অদূরে রামপাল নামক স্থানে সুপ্রাচীন একটি নগরের ধ্বংসাবশেষ প্রায় পনেরো বর্গমাইল জুড়িয়া বিস্তৃত। প্রায় ১৭/১৮টি গ্রাম এই সুবিস্তৃত ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়াইয়া আছে; সমস্ত স্থানটি জুড়িয়া ভগ্ন মৃৎপাত্রের অংশ, পুরাতন ইট-পাথরের টুকরা, মূর্তির ভগ্ন অংশ প্রভৃতি নানা পুরাবস্তু ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। সমগ্র স্থানটির ভৌগোলিক সংস্থান উল্লেখযোগ্য। রামপালের উত্তরে ছিল ইচ্ছামতী নদী; এই নদীর নিম্নপ্রবাহ আজ ধলেশ্বরীর প্রবাহের সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে। ইছামতীর প্রাচীন খাতের সমান্তরালে পূর্ব-পশ্চিমে লম্ববান একটি সুউচ্চ প্রাকারের ধ্বংসাবশেষ এখনও বর্তমান। পূর্বদিকে প্রাচীন ব্ৰহ্মপুত্র প্রবাহের খাত; ব্ৰহ্মপুত্র যে একসময় এই নগরের পূর্ব সীমা স্পর্শ করিয়া প্রবাহিত হইত এই খাত তাহারই অন্যতম প্রমাণ। পশ্চিমে ও দক্ষিণে দুইটি বিস্তৃত পরিখা; এই দুইটি পরিখা বর্তমানে যথাক্রমে মিরকাদিম খাল ও মকুহাটি খাল নামে পরিচিত। সমগ্র স্থানটি ছিল বোধ হয়। নিম্নভূমি; বোধ হয় সেই জন্যই অসংখ্য ছোট বড় দীঘি কাটিয়া নগরভূমিকে সমতল উচ্চভূমিতে পরিণত করা হইয়াছিল। সদ্যোক্ত চতুঃসীমাবেষ্টিত বিস্তৃত৷ নগরের মধ্যে উচ্চতর ভূমিতে রাজপ্রাসাদের বিরাট ধ্বংসস্তুপ এখনও সুস্পষ্ট; জনস্মৃতিতে এই স্তুপ আজও বল্লালবাড়ী নামে খ্যাত। এই নামের মধ্যে বল্লালসেনের স্মৃতি বিজড়িত, সন্দেহ নাই। কিন্তু রামপাল নাম তো পালরাজ রামপালের এবং খুব সম্ভব রামপোলই এই নগর পত্তন না করিলেও ইহার খ্যাতিকে প্রতিষ্ঠা দান করিয়াছিলেন। যাহাই হউক, রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষের চারিদিকে প্রাকার ও পরিখা ভগ্নাবস্থায় আজও দৃষ্টিগোচর হয়। ইচ্ছামতীর প্রাচীন খাত হইতে একটি সুপ্ৰশস্ত রাজপথ নগরটিকে দুইভাগে বিভক্ত করিয়া একেবারে সোজা দক্ষিণ-সীমা পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে; উত্তরতম প্রান্তে এবং দক্ষিণতম প্রান্তে দুইটি সুবৃহৎ নগরদ্বারা আজও যথাক্রমে কপালদুয়ার ও কচুকিদুয়ার নামে খ্যাত। এই প্রধান রাজপথ হইতে পূর্ব ও পশ্চিমে অনেকগুলি পথ বাহির হইয়া একেবারে সোজা পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে; এই পথগুলির চিহ্ন এখনও বর্তমান।
এই রামপোলই চন্দ্র-বর্মণ-সেন-দেববংশের লিপিগুলির “শ্ৰীবিক্রমপুর জয়স্কন্ধাবার” বলিয়া মনে হইতেছে। সমগ্ৰ বিক্রমপুর পরগণায় এমন সুপ্ৰশস্ত এবং ভৌগোলিক দিক হইতে এমন সুবিন্যস্ত ও সুরক্ষিত প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ আর কোথাও আবিষ্কৃত হয় নাই। রামপালের (একাদশ শতকের শেষার্ধ) নাম ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িত বলিয়া এই অনুমান আরও গ্রাহ্য বলিয়া মনে হয়। চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের আমলেই প্রথম বিক্রমপুর জয়স্কন্ধাবারের কথা জানা যাইতেছে (একাদশ শতকের প্রথমার্ধ); ইহারাই হয়তো এই নগর প্রতিষ্ঠা করিয়া থাকিবেন, কিন্তু রামপোলই প্রকৃতপক্ষে ইহার খ্যাতি ও মর্যাদার যথার্থ প্রতিষ্ঠাতা! হয়তো তিনিই ইহাকে বিস্তৃত ও সংস্কৃত করিয়া নিজের নামের সঙ্গে জড়িতও করিয়া থাকিবেন।
সুবৰ্ণগ্রাম
অরিরাজ দনুজমাধব দশরথদেবের আদাবাড়ীর লিপির কাল পর্যন্তও বিক্রমপুর নগর সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। এই দনুজমাধব দশরথ, হরিমিশ্রের কারিকা-কথিত দনুজমাধব এবং জিয়াউদদীন বারণি কথিত সুবর্ণগ্রাম বা সোনারগা-র রাজা দনুজ রায় যদি একই ব্যক্তি হইয়া থাকেন এবং তাহা হইবার সঙ্গত কারণও বিদ্যমান, তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, ১২৮৩ খ্ৰীষ্টাব্দে বা তাহার আগে কোনও সময় দনুজমাধব দশরথ বিক্রমপুর হইতে তাহার রাজধানী সুবর্ণগ্রামে স্থানান্তরিত করিয়াছিলেন। এই সময়ের আগে সুবর্ণগ্রামের কোনও উল্লেখ প্রাচীনতর সাক্ষ্যে কোথাও নাই। হইতে পারে, সুবর্ণগ্রাম পূর্বে বিক্রমপুর-ভাগের অন্তর্গত ছিল, কিন্তু বিক্রমপুর জয়স্কন্ধাবার ও বিক্রমপুর ভাগ এক নহে। বিক্রমপুর জয়স্কন্ধাবার বিক্রমপুর-ভাগের শাসন কেন্দ্ৰ; দনুজরায়-দনুজমাধব শাসনকেন্দ্ৰ বিক্রমপুর হইতে উঠাইয়া সুবর্ণগ্রামে লইয়া গিয়া থাকিবেন। সুবর্ণগ্রাম আজও ঢাকা জেলায় মুন্সীগঞ্জের বিপরীত দিকে ধলেশ্বরী-তীরের একটি সমৃদ্ধ গ্রাম; এবং কিছু কিছু পুরাবস্তু এখানেও আবিষ্কৃত হইয়াছে। মুঘল-পূর্ব মুসলমান রাজাদের আমলে সুবর্ণগ্রামই ছিল পূর্ব-বাঙলার রাজধানী। লক্ষ্যা-সঙ্গমের অদূরবতী সুবর্ণগ্রামের অবস্থিতি যে সামরিক দিক হইতে গুরুত্বময়, তাহা স্বীকার করিতেই হয়।
০৬. গ্রাম ও নগর সম্বন্ধে দুই একটি সাধারণ মন্তব্য
প্রাচীন বাঙলার গ্রাম ও নণর সম্বন্ধে এইবার দুই একটি সাধারণ মন্তব্য করা যাইতে পারে। আয়তনে বা আকৃতি-প্রকৃতিতে এক গ্রামের সঙ্গে আর এক গ্রামের যত পার্থক্যই থাকুক, ঐতিহাসিক কালে অর্থাৎ চতুর্থ-পঞ্চম শতক হইতে একেবারে আদি-পর্বের শেষ পর্যন্ত সমগ্রভাবে বাঙলার গ্রামের চেহারা ও প্রকৃতি একই থাকিয়া গিয়াছে। বস্তুত, মোটামুটিভাবে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত সে-চেহারা ও প্রকৃতির বিশেষ কোনও পরিবর্তন হয় নাই বলিলেই চলে। ইহার কারণ একাধিক। প্রথম ও প্রধান কারণ, এই সুদীর্ঘ শতাব্দী পর শতাব্দীর মধ্যে গ্রাম্য উৎপাদন-ব্যবস্থার, অর্থাৎ কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্পের উৎপাদনোপায়ের কোনও পরিবর্তন হয় নাই। একদিকে গরু ও লাঙ্গল, আখামাড়াই যন্ত্র, অন্যদিকে তকালী ও তোতই প্রধান উৎপাদন-যন্ত্র। দ্বিতীয় কারণ, এই সুদীর্ঘ কালের মধ্যে ভূমি-ব্যবস্থারও কোনও মূলগত পরিবর্তন হয় নাই এবং ভূমি-নির্ভর কৃষক-সমাজের মধ্যে যে শ্রেণীবিভাগ তাহাও মোটামুটি একই থাকিয়া গিয়াছে। কোনও গ্রাম হয়ত কখনো ব্যাবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্ৰ হইবার ফলে বা শাসনকার্যের অধিষ্ঠান নির্বাচিত হইবার ফলে বা দুয়েরই ফলে, পৃথক একটা গুরুত্ব ও মর্যাদা লাভ করিয়াছে এবং গ্রাম্য সমাজের আকৃতি-প্রকৃতিতে স্থানীয় একটা পরিবর্তনও ঘটিয়াছে, কিন্তু তাহা সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। কোনও কোনও গ্রাম শেষোক্ত কারণে গুরুত্বে স্ফীত ও সমৃদ্ধ হইয়া নগর মর্যাদায় উন্নীতও হইয়াছে, কিন্তু তাহাও ব্যতিক্ৰম। ছোট ছোট গ্রামগুলি একাই একক; বড় গ্রামগুলি দেখিতেছি বিভিন্ন পাড়ায় বিভক্ত। আয়তনাযায়ী প্রত্যেক গ্রামে গ্রামীয় মহত্তর, কুটম্ব, গৃহস্থ, ভূমিবান ও ভূমিহীন কৃষক, কয়েকঘর শিল্পী, সমাজ-সেবক রাজক, নাপিত ইত্যাদি এবং সমাজ-শ্রমিক চণ্ডাল, হাড়ি, ডোম ইত্যাদির বিভিন্ন আয়তন ও মর্যাদার বাস্তুগৃহাদি। এইসব বাস্তু পরস্পর দূরবিচ্ছিন্ন নয়; তবে চণ্ডাল প্রভৃতি অন্ত্যজ বর্ণের লোকেরা যে-অংশে বাস করে তাহা প্রধান গ্রামাংশ হইতে একটু বিচ্ছিন্ন। বাস্তুগৃহাদির সংলগ্ন গুবাক, নারিকেল, আম্র, মহুয়া, উচ্চনীচভূমি ইত্যাদি। বাস্তু হইতে অদূরে গ্রামের কৃষিক্ষেত্র; সেই সুবিস্তৃত কৃষিক্ষেত্রে প্রত্যেকের ক্ষেত্রভূমিসীমা আলিদ্বারা সুনির্দিষ্ট; গ্রামে সমগ্র কৃষিভূমি সেই জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত। ক্ষেত্রভূমির পাশ দিয়া মাঝে মাঝে বৃহৎ খাল নালা ইত্যাদি; এই খাল নালাগুলি শুধু চাষের জল সরবরাহ করে না, পয়ঃপ্রণালীর কাজও করে। ক্ষেত্রভূমির মধ্যে অথবা শেষ সীমায় গোবাট ও তৃণাচ্ছাদিত গোচরীভূমি। গ্রামের পাশ দিয়া নদী বা গঙ্গিনিকা বা খাল বা অন্য কোনও জলপ্রবাহ এবং গ্রাম্য লোকজন চলাচলের পথ। কোনও কোনও গ্রামের বাহিরে গ্রাম্য হাট, হট্টিয়গুহ ইত্যাদি। যে-সব গ্রাম সমুদ্র বা সমুদ্র জোয়ারবাহী নদীর তীরে সেখানে সমুদ্র বা নদীর। তীরে তীরে গ্রামেব লোকদের লবণের গর্ত। যে-সব গ্রাম বর্ষায় জল-প্লাবিত হয় অথবা নদী ও সমুদ্রের জলোচ্ছাসদ্বারা আক্রান্ত হয়, সে-সব গ্রামের নিম্নতর ভূমিতে ক্ষুদ্র বৃহৎ বাধ বা জঙ্গল। নদী বা বৃহৎ খাল পারাপারের জন্য গ্ৰাম্য খেয়াঘাট। প্রত্যেক গ্রামেই ক্ষুদ্র বৃহৎ ২/১টি মন্দির; কোনও কোনও গ্রামে ক্ষুদ্র বৃহৎ বৌদ্ধবিহার; পণ্ডিত ব্ৰাহ্মণদের গৃহে চতুষ্পাঠী! যে-সব গ্রাম ব্যাবসা-বাণিজ্যের যাতায়াত পথের কেন্দ্র বা সীমায় অবস্থিত। সেখানে গঞ্জ, বৃহৎ হাট; জলবাণিজ্যের কেন্দ্ৰ হইলে নদীর ঘাট বা সমুদ্রের খাড়ীতে অসংখ্য নৌকার সমাবেশ, যেমন ফরিদপুর-কোটালিপাড়া অঞ্চলের গ্রামগুলিতে। এই সব গ্রাম অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ সন্দেহ নাই। এই তো মোটামুটি বাঙলার গ্রামের চিত্র এবং এ-চিত্র সমসাময়িক বাঙলার লিপিগুলিতে সুস্পষ্ট। মোটামুটি এই চিত্র অষ্টাদশ শতকের শেষ, এমন কি উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাঙলার গ্রামগুলিতে দেখা যাইতেছে। সমসাময়িক সাহিত্যে, যেমন রামচরিত এবং সদুক্তিকর্ণামৃতের দুই একটি বিচ্ছিন্ন শ্লোকে প্রাচীন বাঙলার গ্রামগুলির মনোরম কাব্যময় ছবি আঁকা হইয়াছে। রামচরিতে বরেন্দ্রীর গ্রাম বৰ্ণনাপ্রসঙ্গে বলা হইতেছে (৩।৫।২৮);
