পাল আমলে জয়স্কন্ধাবারগুলির সামরিক গুরুত্ব লক্ষণীয়; অনুমান হয়, এই সামরিক গুরুত্ব বিবেচনা করিয়াই জয়স্কন্ধাবারগুলি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। পাটলীপুত্র, মুদগগিরি, বিলাসপুর, হরধাম, রামাবতী এবং বোধহয় বাটপর্বতিকাও, প্রত্যেকটিই গঙ্গার তীরে তীরে। এই গঙ্গা বাহিয়া রাজমহলের তেলিগঢ়ি ও সিক্রিগলির সংকীর্ণ গিরিবর্ক্সের ভিতর দিয়াই বাঙলায় প্রবেশের পথ, পাল-রাজ্যের হৃদয়স্থলে প্রবেশের পথ এবং পাটলীপুত্ৰ হইতে আরম্ভ করিয়া রামাবতী পর্যন্ত সমস্ত পথটিই সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন ছিল। পাল-রাষ্ট্র তাহাই করিয়াছিল। এই অনুমান আরও সমর্থিত হয়। পরবর্তীকালে লক্ষ্মণাবতী-গৌড়, পাণ্ডুয়া, টাণ্ডা ও রাজমহলের পর পর বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রধান শাসনকেন্দ্রের অবস্থিতি হইতে। যাহা হউক, সে কথা পরে বলিতেছি।
লক্ষ্মণাবতী
সেন আমলের প্রায় শেষাশেষি লক্ষ্মণসেন রামাবতীর অদূরে লক্ষ্মণাবতী (মুসলমান ঐতিহাসিকদের গৌড়-লখ্নৌতি) নামে এক সুবিস্তৃত নগর প্রতিষ্ঠা করেন। রাজমহল হইতে ২৫ মাইল ভাটীতে গঙ্গা-মহানন্দার সঙ্গমস্থলের এই নগর গঙ্গার তীর ধরিয়া প্রায় ১৪/১৫ মাইল জুড়িয়া বিস্তৃত ছিল। সেন-আমলের লক্ষণাবতীকে আশ্রয় করিয়া তুর্কী সুলতানদের গৌড়-লখ্নৌতি নগর গড়িয়া উঠে। গঙ্গা আজ খাত পরিবর্তন করিয়া বহুদূরে সরিয়া গিয়াছে, মহানন্দাও তাঁহাই। কিন্তু গৌড়-লখনৌতির ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান এবং তাহা হইতে প্রাচীনতর লক্ষ্মণাবতীর বিস্তৃতি ও সমৃদ্ধির খানিকটা অনুমান করা চলে। গৌড়-লখনৌতি হইতে রাজধানী কিছুদিন পর পাণ্ডুয়ায় স্থানান্তরিত হয়; তবু লখনৌতির খ্যাতি ও মর্যাদা হুমায়ুন-আকবরের আমল পর্যন্ত অক্ষুন্ন ছিল। মুঘলেরা ইহার নামকরণ করিয়াছিলেন জন্নতাবাদ। গঙ্গা ও মহানন্দার খাত পরিবর্তনের ফলে লখনৌতি অস্বাস্থ্যকর জলাভূমিতে পরিণত এবং ষোড়শ শতকের শেষাশেষি নাগাদ পরিত্যক্ত হয়। পররর্তী কালে বাঙলার রাজধানী টাণ্ডায় এবং সর্বশেষে রাজমহলে স্থানান্তরিত হয়।
বিজয়নগর
বর্তমান রাজশাহী শহরের ৭ মাইল পশ্চিমে গোদাগারী থানার অন্তর্গত দেওপাড়া বা দেবপাড়া নামে একটি গ্রাম আছে; দেওপাড়ার উত্তরে অদূরে চব্বিশনগর এবং দক্ষিণে কিঞ্চিৎ দূরে বিজয়নগর নামে আর দুইটি গ্রাম। দেওপাড়া গ্রাম জুড়িয়া প্রাচীন অট্টালিকা, প্রাসাদ, মন্দির, মূর্তি ও দীর্ঘিকার বিস্তৃত ধ্বংসাবশেষ ইতস্তত আকীর্ণ। বিজয়সেনের দেওপাড়া প্রশস্তিলিপিটি পাওয়া গিয়াছে দেওপাড়া গ্রাম হইতে; এই লিপিটিতে প্ৰদ্যুন্নেশ্বরের একটি সুবৃহৎ মন্দির এবং তৎসংলগ্ন একটি বৃহৎ দীঘির উল্লেখ আছে। আজ মন্দিরটির কয়েকটি ভগ্ন স্থাপত্যখণ্ড ছাড়া আর কিছুই নাই; তবে দীঘিটি পদুমসর (প্ৰদ্যুম্নশ্বর বা প্ৰদ্যুম্নসর=প্ৰদ্যুম্ন সরোবর) নামে আজও বাঁচিয়া আছে। মনে হয়, প্রাচীন দেওপাড়া গ্রাম বিজয়সেন-প্রতিষ্ঠিত বিজয়নগরের একটি অংশ ছিল; বিজয়নগর, চব্বিশনগর নাম দুইটি এবং দেওপাড়া প্রশস্তির ইঙ্গিত একান্ত অর্থহীন বলিয়া মনে হয় না। দেওপাড়ার উত্তরে-দক্ষিণে প্রায় ৭/৮ মাইল জুড়িয়া প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের কিছু কিছু চিহ্ন ইতস্তত এখনও বিদ্যমান। এই স্থান পদ্মাতীর হইতে খুব দূরেও নয়।
পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গ, গঙ্গাবিন্দর, বঙ্গনগর
পূর্ব ও দক্ষিণ-বাঙলার সর্বপ্রাচীন নগর সিংহলী পুরাণ-কথিত বঙ্গনগর ও টলেমি-কথিত গঙ্গা-বন্দর (Gange)। গঙ্গা-বন্দর গঙ্গর পঞ্চমুখের একটি মুখে অবস্থিত ছিল; সম্ভবত দ্বিতীয় মুখের তীরে, কিন্তু নিঃসশংয়ে তাহা বলা যায় না। পেরিপ্লাসগ্রন্থের বিবরণ অনুসারে গঙ্গাবিন্দর সমসাময়িককালের সুপ্রসিদ্ধ সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্র এবং টলেমির মতে গঙ্গারাষ্ট্রের রাজধানী ও প্রধান নগর। সিংহলী পুরাণ-কথিত বঙ্গনগরে অবস্থিতি সম্বন্ধে কিছুই বলিবার উপায় নাই।
নব্যাবকাশিকা; বারকমণ্ডল-বিষয়; সুবর্ণবীথী
ফরিদপুর কোটালিপাড়ার পট্টোলীগুলিতে নব্যাবকাশিকা, বারকমণ্ডল-বিষয় এবং সুবর্ণবীথী নামে যথাক্রমে একটি ভুক্তি (?)-বিভাগ, একটি বিষয়-বিভাগ এবং একটি বীথী-বিভাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। ইহাদের প্রত্যেকেরই এক একটি শাসনাধিষ্ঠান ছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু কাহার অবস্থিতি কোথায় ছিল নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা যায় না, তবে বর্তমান ফরিদপুর ও ঢাকা জেলায়, মোটামুটি এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। একটি লিপিতে চূড়ামণি-নৌযোগ নামে একটি নৌ-বাণিজ্যের কেন্দ্রেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।
জয়কর্মান্তবাসক; সমতট-নগর
দেবখড়গের আস্রফপুর লিপি দুইটিতে জয়কর্মন্তবাসক নামে একটি নগরের সাক্ষাৎ পাওয়া যাইতেছে; এই নগরটিই বোধ হয় খড়গরাজাদের রাজধানী অথবা অন্তত জয়স্কন্ধাবার ছিল। কেহ কেহ মনে করেন, কর্মন্তবাসক বা প্রাচীন কর্মান্ত এবং বর্তমান ত্রিপুরা জেলার বড়কামতা গ্রাম এক এবং অভিন্ন। যুয়ান-চোয়াঙ সমসাময়িক সমতটের রাজধানীটির নামোল্লেখ করেন নাই, কিন্তু তাহার একটি বর্ণনা দিয়াছেন।
পট্টিকেরা
বর্তমান ত্রিপুরা অঞ্চলে পট্টিকেরা রাজ্যের উল্লেখ একাদশ শতক হইতেই পাওয়া যায়। এই রাজ্যের রাজধানীর ইঙ্গিত ব্ৰহ্মদেশীয় রাজবৃত্ত-কাহিনীতেও জানা যায়। তবে, পট্টিকেরা-নগরের সবিশেষ এবং সুস্পষ্ট সাক্ষাৎ পাইতেছি। ত্ৰয়োদশ-শতকে রণবঙ্কমল্ল হারিকালদেবের একটি লিপিতে। ত্রিপুরা জেলার মধ্যযুগীয় পাটিকেরা বা পাইটকেরা এবং বর্তমান পাটিকারা বা পাইটকরা পরগণা প্রাচীন পট্টিকের রাজ্যের নাম ও স্মৃতি বহন করিতেছে। প্রাচীন পট্টিকেরা-নগর এবং বর্তমান পাইটকারা পরগণাস্থিত ময়নামতী পাহাড়ের ময়নামতী গ্রাম খুব সম্ভবত এক এবং অভিন্ন। এই গ্রাম এবং আশপাশের গ্রাম হইতে অনেক প্রত্নবস্তু-লিপি, মূর্তি ও মূর্তির অংশ, ভগ্ন প্রস্তর খণ্ড, পোড়ামাটির ফলক ইট-পাথরের টুকরা ইত্যাদি-বহুদিন হইতেই সময় সময় পাওয়া যাইতেছিল। খুব সম্প্রতি আকস্মিক খননের ফলে ময়নামতীর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ধ্বংসস্তুপের ভিতর হইতে এক সুপ্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে এবং সঙ্গে সঙ্গে অনেক লিপিখণ্ড, পোড়ামাটির ফলক, মূর্তি, মৃৎপাত্র ইত্যাদি পাওয়া গিয়াছে। গোমতীর তীর এবং ময়নামতী পাহাড়ের ক্রোড়স্থিত এই সুবিস্তৃত ধ্বংসাবশেষই প্রাচীন পট্টিকেরার ধ্বংসাবশেষ, এমন মনে করিবার সঙ্গত কারণ বিদ্যমান। হরিকালদেবের লিপি হইতে জানা যায়, পট্টিকেরা-নগরে দুর্গোেত্তারা নামে এক বৌদ্ধ দেবীর একটি মন্দির ছিল।
