নগরাভ্যন্তরে ছিল রাজকীয় প্রাসাদ, রাষ্ট্রের অধিকরণ-গৃহ এবং অন্যান্য রাজকীয় প্রাসাদ ইত্যাদি, সার্থবাহ-বণিক-নাগরিকদের বাসগৃহ, হাট, মন্দির, সভাগৃহ, সৈন্যসামন্তদের আবাসস্থান ইত্যাদি। রামচরিতে দেখিতেছি, পুণ্ড্রনগরের সারি সারি বিপণি গৃহের বর্ণনা। নগরের সমাজসেবক ও শ্রমিকেরা, কুটুম্ব-গৃহস্থেরা বাস করিতেন নগরোপকণ্ঠে; সেখানেও ঘরবাড়ি, মন্দির প্রভৃতির ধ্বংসাবশেষ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। শুধু পুণ্ড্রনগরেই নয়, কোটীবর্ষ, রামপাল সর্বত্রই নগর-বিন্যাস একই প্রকারের।
কোটীবর্ষ বাণগড়
পুণ্ড্রনগর-পৌণ্ড্রক্ষেত্রের পরেই বলিতে হয় কোটীবর্ষ নগরের কথা। হেমচন্দ্রের অভিধানচিন্তামণি, পুরুষোত্তমের ত্রিকাণ্ডশেষ প্রভৃতি গ্রন্থের মতে দেবীকেট, ব্যাণপুর, উমাবন, শোণিতপুর প্রভৃতি কোটীবর্ষেরই বিভিন্ন নাম। অভিধানকারদের মতে কোটীবর্ষের খ্যাতি ও মর্যাদা কৌশাস্বী, প্রয়াগ, মথুরা, উজ্জয়িনী, কান্যকুব্জ, পাটলীপুত্র প্রভৃতি নগরের চেয়ে কম নয়। বায়ুপুরাণে “কোটীবর্ষম নগরম”-এর উল্লেখ আছে। জৈন কল্পসূত্রে বলা হইয়াছে, মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের গুরু, ভদ্রবাহুর এক শিষ্য গোদান প্রাচ্য-ভারতের জৈনদিগকে চারিটি শাখায় শ্রেণীবদ্ধ করিয়াছিলেন; তাহার মধ্যে তিনটি শাখার নাম তাম্রলিপ্তি, পুণ্ড্রবর্ধন এবং কোটীবর্ষের সঙ্গে যুক্ত। পঞ্চম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া অন্তত পোল আমলের শেষ পর্যন্ত কোটীবর্ষ নগরেই পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির সর্বপ্রধান বিষয় কোটীবর্ষ-বিষয়ের শাসনাধিষ্ঠান অবস্থিত ছিল। মুসলমান অধিকারের পর পুরাতন কোটীবর্ষ নগরেই দেবীকোট-দীবকোট-দীওকেট নামে নূতন নগরের পত্তন হয়। একাদশ শতকের শেষে বা দ্বাদশ শতকের প্রথমে সন্ধ্যাকর নন্দী কোটীবর্ষ নগরের প্রশস্তি উচ্চারণ করিয়া এই নগরের অসংখ্য পূজারী-পূজক-মুখরিত মন্দির ও প্রস্ফুটিত পদ্মহসিত দীঘির দীর্ঘ বর্ণনা রাখিয়া গিয়াছেন। ষোড়শ শতক পর্যন্ত মুসলমান ঐতিহাসিকদের রচনায়। দীবকোট-দীওকোটের বর্ণনা পাঠ করা যায়।
হেমচন্দ্রের পুনর্ভবতীরস্থ কোটীবর্ষ এবং বলিরাজপুত্র বাণাসুরের ও উষা-অনিরুদ্ধের পুরাণ-স্মৃতি বিজড়িত, বাণপুর বর্তমান দিনাজপুর জেলার বাণগড়, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নাই। সমস্ত বাণগড় ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি জুড়িয়া এক বৃহৎ সমৃদ্ধ নগরের ধ্বংসাবশেষ এখনও বিস্তৃত। কম্বোজ-রাজবংশের একটি এবং পালবংশের একটি লিপি, অসংখ্য মূর্তি, মন্দির ও প্রাসাদের ভগ্ন প্রস্তর ও ইষ্টকখণ্ড, ভিত্তিস্তর, স্তম্ভখণ্ড, ক্ষুদ্র বৃহৎ মন্দির-নিদর্শন প্রভৃতি এই সুবিস্তৃত ধ্বংসাবশেষের ভিতর হইতে আবিষ্কৃত হইয়াছে। কম্বোজ-রাজবংশের লিপিখােদিত যে ক্ষুদ্র মন্দির-নিদর্শনটি পাওয়া গিয়াছে তেমন মন্দিরকে যে সমসাময়িক সাহিত্যে “ভূ-ভূষণ” বলা হইয়াছে তাহা কিছু মিথ্যা অত্যুক্তি বলিয়া মনে হয় না।
ধ্বংসাবশেষ হইতে অনুমান হয়, এই নগর দৈর্ঘ্যে প্রায় ১,৮০০ এবং প্রস্থে ১,৫০০ ফুট বিস্তৃত ছিল, নগরটি চারিদিকে প্রাকার দ্বারা বেষ্টিত এবং প্রকারের পরেই পূর্বে, উত্তর ও দক্ষিণে পরিখা এবং পশ্চিমে পুনর্ভবা নদী। পূর্বদিকে প্রধান নগরদ্বার এবং নগর হইতে নগরোপকণ্ঠে যাইবার জন্য পরিখার উপরে সেতুর ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। নগরের ঠিক কেন্দ্ৰস্থলে এখনও একটি সুউচ্চ স্তুপ বর্তমান এবং জনসাধারণের স্মৃতিতে এখনও এই স্তুপ রাজবাড়ি নামে জাগ্ৰত; বোধহয় এইখানেই ছিল রাজপ্রাসাদ। নগরাভ্যন্তরে এবং প্রাচীরের বাহিরে নগরোপকণ্ঠে এখনও অসংখ্য ক্ষুদ্র বৃহৎ স্তুপ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত।
পঞ্চনগরী ও সোমপুর
পঞ্চম শতকে পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির অন্যতম বিষয় ছিল পঞ্চনগরী এবং পঞ্চনগরীতেই বিষয়ের শাসনাধিকরণ অধিষ্ঠিত ছিল। পঞ্চনগরী দিনাজপুর জেলায় সন্দেহ নাই, কিন্তু কোন স্থান তাহা নির্ণীত হয় নাই। রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরও খুব পুরাতন তীর্থনগর বলিয়া মনে হয়; খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চম শতকে এই স্থানের অন্তত একাংশের নাম ছিল বটগোহালী (বর্তমান গোয়ালভিটা) এবং সেখানে জৈন শ্রমণাচার্য গুহনদীর একটি বিহার ছিল। ধৰ্মপালের আমলে এই স্থান সোমপুর নামে খ্যাতি লাভ করে এবং এইখানেই সোমপুর মহাবিহার (বর্তমান পাহাড়পুর) গড়িয়া উঠে। পাহাড়পুরের সন্নিকটবর্তী ওমপুর আজও পুরাতন সোমপুর নামের স্মৃতি বহন করিতেছে। সোমপুর মহাবিহার সমসাময়িক বৌদ্ধধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থনগর ছিল, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার অবকাশ নাই। একাদশ শতকে (বর্মণ-রাষ্ট্রের?)। বঙ্গাল সৈন্যেরা এই মহাবিহারের একাংশ আগুন লাগাইয়া পুড়াইয়া দিয়াছিল।
জয়স্কন্ধাবার, রামাবতী
পালরাজাদের রাজধানী কোথায় ছিল তাহা নিঃসংশয়ে জানিবার উপায় নাই; তবে তাহারা রাজ্যের সর্বত্র-বোধহয় সামরিক গুরুত্ব এবং শাসনকার্যের সুবিধানুযায়ী-অনেকগুলি বিজয়স্কন্ধাবার স্থাপন করিয়াছিলেন। এগুলি যে অন্তত নগরোপম। এ-সম্বন্ধে সন্দেহ কি? রাজারা যখন সদলবলে এই সব স্থানে আসিয়া বাস করিতেন এবং শাসনকাৰ্যও সেখানে নিম্পন্ন হইত, তখন সেগুলি অস্থায়ী ছত্রাবাস মাত্র ছিল, এ কথা কিছুতেই কল্পনা করা যায় না। রাজপ্রাসাদ, রাজকীয় ঘরবাড়ি, সৈন্যসামন্তবাস, হাটবাজার, মন্দির, পথঘাট, উদ্যান প্রভৃতি সমস্তই এই সব দুৰ্গজাতীয় স্কন্ধাবারে থাকিত, এমন অনুমান করিতে কল্পনার আশ্রয় লইতে হয় না। ষষ্ঠ-সপ্তম শতক হইতে একেবারে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত এই ধরনের জয়স্কন্ধাবারের উল্লেখ লিপিগুলিতে পাওয়া যাইতেছে; চন্দ্র-বর্মণ-সেন আমলের অনেক লিপিই তো “বিক্রমপুরসমাবাসিত বিজয়স্কন্ধাবার’ হইতে নিৰ্গত। যাহা হউক, পাল লিপিগুলিতে মুদগগিরি, বাটপর্বতিকা, বিলাসপুর, হরধাম, রামাবতীনগর, হংসাকোঞ্চি এবং পাটলীপুত্র জয়স্কন্ধাবারের উল্লেখ আছে। এইসব জয়স্কন্ধাবারের মধ্যে রামাবতী স্পষ্টতই নগর বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। পাটলীপুত্র তো বহুদিনের প্রাচীন নগর। অন্য জয়স্কন্ধাবারগুলিও নগর না হইলেও নগরোপম ছিল, সন্দেহ নাই। মুদগগিরি বর্তমান মুঙ্গের নগর; গঙ্গার তীরেই ছিল তাহার অবস্থিতি। বিলাসপুর এবং হরধাম দুই অবস্থিত ছিল গঙ্গার উপরে; কারণ গঙ্গায় তীর্থস্নান করিয়াই প্রথম মহীপাল এবং তৃতীয় বিগ্রহপাল যথাক্রমে বাণগড় ও আমগাছি লিপি-কথিত ভূমি দান করিয়াছিলেন, বিলাসপুর এবং হরধাম জয়স্কন্ধাবার হইতে। বটপৰ্বতিকার অবস্থিতি-নির্ণয় কঠিন; পর্বতিকার উল্লেখ হইতে অনুমান হয় রাজমহল পর্বতের সংলগ্ন গঙ্গার তীরেই কোথাও এই জয়স্কন্ধাবার প্রতিষ্ঠিত ছিল। পাটলীপুত্ৰও গঙ্গার তীরে। হংসাকোকী মহারাজ বৈদ্যদেবের কামরূপস্থ জয়স্কন্ধাবার বলিয়া মনে হয়। রামাবতী নগর প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন তৃতীয় বিগ্রহপালের পুত্র রামপাল; মদনপালের মনহলি লিপি এবং সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতে এই নগরের উল্লেখ ও বর্ণনা আছে। রামাবতী এবং আইন-ই-আকবরী কথিত রামাউতি যে এক এবং অভিন্ন নগর, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের এতটুকু অবকাশ নাই। পরবর্তী সেন-আমলের গৌড় বা লক্ষ্মণাবতী নগরের অদূরে গঙ্গা-মহানন্দার সঙ্গমস্থলের সন্নিকটে ছিল রামাবতীর অবস্থিতি। আজ রামাবতীর পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ লক্ষ্মণাবতীর প্রাচীন কীর্তি হর্ম্যাদির অদূরে মাটির ধূলায় সুপ্রিশ্ন দেিয়ছে। অথচ সন্ধকারের বর্ণনা হইতে মনে হয়, সমসাময়িককালে বামাবতী সমৃদ্ধ নগর ছিল।
