সেন-রাজাদের অন্যতম রাজধানী বোধ হয় ছিল নবদ্বীপ বা মিনহাজ-উদ-দীন কথিত নুর্দীয়া নগর। নদীয়া-নবদ্বীপ যে সেন-রাজাদের অন্যতম রাজধানী ছিল তাহা কুলজী গ্রন্থমালাদ্বারাও সমর্থিত। সম্বন্ধনির্ণয় ও বল্লাল-চরিত গ্রন্থের মতে বল্লালসেন বৃদ্ধ বয়সে নবদ্বীপ রাজধানীতেই বাস করিতেন।
গোরক্ষাবিজয়, মীনচেতন ও পদ্মপুরাণ গ্রন্থে এক বিজয়নগরের উল্লেখ পাওয়া যায়; এই বিজয়নগর দামোদর নদের উত্তর তীরে অবস্থিত বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। রাঢ়দেশের সঙ্গেই স্কুলের প্রথম ঘনিষ্ঠ পরিচয়; অসম্ভব নয় যে, এই বিজয়নগর বিজয়সেনের নামের সঙ্গে জড়িত।
উত্তরবঙ্গ, পুণ্ড্রনগর মহাস্থান
পুণ্ড্র-পুণ্ড্রবর্ধন নগর উত্তর বাঙলার সর্বপ্রধান ও সর্বপ্রাচীন নগর। দিব্যাবদান; রাজতরঙ্গিণী, বৃহৎকথামঞ্জরী প্রভৃতি গ্রন্থে এই নগরের উল্লেখ আছে। অন্যান্য অনেক সাহিত্যগ্রন্থে এবং লিপিমালায় পুণ্ড্র-পুণ্ড্রবর্ধনের প্রধান নগর পুণ্ড্রনগর বা পুণ্ড্রবর্ধনপুরের অল্পবিস্তর উল্লেখ হইতে এবং বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থান-ধ্বংসাবশেষের প্রত্নতাত্ত্বিক বর্ণনা হইতে সুপ্রাচীন এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী অধূষিত এই নগরটি সম্বন্ধে অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত সংবাদ আহরণ করা যায়। এই সব সংবাদের সাহায্যে অন্যান্য নগরগুলি সম্বন্ধে ধারণা স্পষ্টতর হইতে পারে, এই অনুমানে পুণ্ড্রনগর-বর্ণনা একটু বিস্তৃতভাবেই করা যাইতে পারে।
বৌদ্ধপুরাণ মতে বুদ্ধদেব স্বয়ং কিছুদিন পুণ্ড্রবর্ধন নগরে কাটাইয়াছিলেন এবং নিজের ধর্মমত প্রচার করিয়াছিলেন। মৌর্যরাজত্বকালে পুন্দনগল (পুণ্ড্রনগর) জনৈক মহামাত্রের শাসনাধিষ্ঠান ছিল। গুপ্ত আমলে এই নগর পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির ভুক্তিকেন্দ্র ছিল এবং সেই সময় হইতে আরম্ভ করিয়া ত্রয়োদশ শতকে হিন্দু আমলের শেষ পর্যন্ত পুণ্ড্র বা পৌণ্ডনগর কখনও তাহার এই মর্যাদার আসন হইতে বিচ্যুত হয় নাই। শুধু শাসনাধিষ্ঠানরূপেই নয়, ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্ররূপে এবং আন্তর্ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক স্থলপথ-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্ররূপেও এই নগরের বিশেষ খ্যাতি ও মর্যাদা বহু শতাব্দী ধরিয়া সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। সপ্তম শতকে যুয়ান-চোয়াঙ যখন বাঙলাদেশ পর্যটনে আসিয়াছিলেন তখন এই নগরের পরিধি ৩০ লি’রও (অর্থাৎ ৬ মাইল) অধিক ছিল; পুষ্করিণী, পুষ্প ও ফলোদ্যান, বিহারকানন প্রভৃতিতে এই নগর সুশোভিত ছিল। পরবর্তী পাল ও সেন আমলে প্রধান ভুক্তির শাসনকেন্দ্র হিসাবে ইহার মর্যাদা ও আয়তন বাড়িয়াই গিয়াছিল, এমন অনুমান অযৌক্তিক নয়। সন্ধ্যাকর নদীর রামচরিতে বলা হইয়াছে, পুণ্ড্রবর্ধনপুর বরেন্দ্রীর মুকুটমণি, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম স্থান (বসুধাশিরো বরেন্দ্রী-মণ্ডল চূড়ামণৈঃ কুলস্থানম)। আনুমানিক দ্বাদশ শতকের করতোয়া-মাহাত্ম্য গ্রন্থে পুণ্ড্রবর্ধনপুরকে পৃথিবীর আদিভবন বলিয়া বৰ্ণনা করা হইয়াছে (আদ্যম ভুবোভবনম)। এই গ্রন্থেই পবিত্র করতোয়া-তীরবর্তী মহাস্থানকে পুণ্য পৌণ্ড্যুক্ষেত্র বা পৌণ্ডনগর বলিয়া উল্লেখও করা হইয়াছে। বগুড়া হইতে ৭ মাইল দূরবতী করতোয়াতীরে মহাস্থান; এখনও এখানে প্রতি বৎসর স্নানপুণ্যদিবসে সহস্ৰ সহস্ৰ লোক করতোয় স্নান করিতে আসেন। পৌণ্ড্যুক্ষেত্রে করতোয়ার এই তীৰ্থমহিমার কথা করতোয়া-মোহাস্ত্ৰ্যে সবিস্তারে উল্লিখিত হইয়াছে। মহাস্থানের সুবিস্তৃত প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, সেই ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মৌর্য-ব্রাহ্মী লিপিখণ্ডের আবিষ্কার এবং লিপিখণ্ডে পুন্দনগলের উল্লেখ এবং করতোয়া-মাহান্ত্র্যের উক্তি পুণ্ড্রনগর ও মহাস্থান যে এক এবং অভিন্ন তাহা নিঃসংশয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছে।
করতোয়ার বাম তীরে ৩০ বর্গমাইল জুড়িয়া মহাস্থানের ধ্বংসাবশেষ বিস্তৃত। নগর-প্রাকার, প্রাসাদ, অট্টালিকা, মূর্তি, মন্দির, পরিখা, নগরোপকণ্ঠের বিহার, মন্দির, ঘরবাড়ি প্রভৃতির আবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষ হইতে প্রাচীন নগরটির যে-চিত্ৰ ফুটিয়া উঠে তাহা কোনও অংশেই প্রাচীন বৈশালী-শ্রাবস্তি-কৌশাস্বীর নগরসমৃদ্ধির তুলনায় খর্ব বলিয়া মনে হয় না। অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক, মাটি-পাথর-ধাতব মূর্তি, প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ, মুদ্রা, লিপি ইত্যাদি প্রচুর এই সুবিস্তৃত ধ্বংসাবশেষের ভিতর হইতে আবিষ্কৃত হইয়াছে।
নগরটির দুই অংশ। একটি অংশ পরিখাচিহ্নিত ও প্রাকার বেষ্টিত; এই অংশই যথার্থতি নগর। অন্য অংশ প্রাকারের বাহিরে; এই অংশ নগরোপকণ্ঠ। নগরটি চারিধারের সমতল ভূমি হইতে প্রায় ১৫ ফুট উচু, চারিদিকে সুপ্রশস্ত সুউচ্চ প্রাকার; চারিকোণে চারিটি উচ্চতর প্রাকারমঞ্চ; প্রাকারের বাহিরেই উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমদিকে পরিখা; পূর্বদিকে করতোয়া প্রবহমানা। নগরটি দৈর্ঘ্যে উত্তর-দক্ষিণে আনুমানিক ৫,০০০ ফুট, প্রস্থে ৪,২০০ ফুট; সমস্ত নগরটি ক্ষুদ্র বৃহৎ মাটি-ইট-পাথরের স্তুপ এবং ভগ্ন মৃৎপাত্রের টুকরায় আকীর্ণ। নগর হইতে নগরোপকণ্ঠ এবং বাহিরে যাতায়াতের জন্য উত্তর ও দক্ষিণদিকে দুইটি করিয়া সুপ্ৰশস্ত নগরদ্বার। পশ্চিমদিকে উত্তর কোণের কাছে প্রধান নগরদ্বার; এখনও এই দ্বার তাম্র-দরওয়াজা নামে খ্যাত। পূর্বদিকে ঠিক ইহার বিপরীত কোণে শিলাদেবীর ঘাটে যাইবার জন্য আর একটি দ্বার; এই শিলাদেবীর ঘােটই করতোয়া স্থানের প্রধান তীর্থকেন্দ্র। একটি প্রশস্ত লম্ববান সোজা পথ একদ্বার হইতে আর একদ্বারে বিলম্বিত; এখনও সেই পথ দূরাপসৃত করতোয়ায় গিয়া নামিয়াছে। নগরাভ্যন্তরের বৈরাগীর ভিটা ও নগরোপকণ্ঠের গোবিন্দ ভিটায় যতটুকু খনন কার্য হইয়াছে তাহার ফলে দুই জায়গায় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে। পূর্বদিকে শিলাদেবীর ঘাটের কাছে নগর-প্রাকারের কিয়দংশের খননে দেখা গিয়াছে, করতোয়ার জলস্রোতের গতি পরিবর্তনের জন্য ঐ স্থানে প্রাকার দৃঢ়তর করিয়া দুইস্তরে গাথা হইয়াছিল। খনন-বিশারদ প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করেন এই সব ধ্বংসাবশেষ ও নগরপ্রাকার, পরিখা প্রভৃতি সমস্তই পাল আমলের।
