সিংহপুর
সিংহলী পুরাণে বিজয়সিংহ-কাহিনী প্রসঙ্গে লাল (রাঢ়) দেশান্তর্গত সিংহপুর নামে একটি নগরের উল্লেখ আছে; কেহ কেহ মনে করেন সিংহপুর বর্তমান হুগলী-জেলার শ্ৰীীরামপুর মহকুমার সিঙ্গুর। এ-সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা কঠিন।
প্রিয়ঙ্গু
দশম ও একাদশ শতকে দণ্ডভুক্তির কম্বোজরাজদের রাজধানী ছিল প্রিয়ঙ্গু নামক নগরে। এই নগরের অবস্থিতি বা অন্য কোনও প্রকার গুরুত্ব সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না, তবে মেদিনীপুর বা হুগলী জেলার কোথাও ইহার অবস্থিতি হওয়া বিচিত্র নয়।
কর্ণসুবর্ণ
কর্ণসুবর্ণ প্রাচীন পশ্চিম-বাঙলার অন্যতম সুপ্ৰসিদ্ধ নগর। সপ্তম শতকে এই নগর গৌড়রাজ শশাঙ্কের রাজধানী, এবং শশাঙ্কের মৃত্যুর পর স্বল্প কিছুদিনের জন্য কামরূপরাজ ভাস্করবর্মার জয়স্কন্ধাবার ছিল। এই শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাদে মহারাজ জয়নাগের রাজধানীও ছিল এই নগরে। যুয়ান-চোয়াঙ বলিতেছেন, এই নগরের পরিধি ছিল ২০ লি। বাঙলায় ভ্ৰমণকালে যুয়ান-চোয়াঙ, কর্ণসুবৰ্ণে আসিয়াছিলেন। সপ্তম শতকের কর্ণসুবর্ণ শুধু রাজধানী হিসাবেই খ্যাতি লাভ করে নাই; সমসাময়িক শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও প্রধান একটি কেন্দ্র ছিল এই নগর। নগরের বাহিরে অনতিদূরে রক্তমৃত্তিকা নামে একটি বৃহৎ বৌদ্ধ বিহার ছিল। মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি এবং কানসোনা গ্রাম যথাক্রমে আজও রক্তমৃত্তিকা বিহার এবং কর্ণসুবর্ণের স্মৃতি বহন করিতেছে। দুইই বহরমপুরের নিকটবর্তী গঙ্গাপ্রবাহের তীরে অবস্থিত ছিল, এরূপ অনুমান অযৌক্তিক নয়। জয়নাগের কালে ঔদুম্বরিক বিষয় নামে কর্ণসুবর্ণের একটি বিষয়-বিভাগ ছিল এবং এই বিষয়ের শাসনাধিষ্ঠান বোধ হয় ছিল ঔদুম্বর নামক নগর। ঔদুম্বরিক বিষয় যে আইন-ই-আকবরীর ঔদম্বর পরগণা তাহা তো আগেই বলিয়াছি; বীরভূমের অধিকাংশ এবং মুর্শিদাবাদের কিয়দংশ জুড়িয়া ছিল এই বিষয়ের বিস্তৃতি। রক্তমৃত্তিকা-রাঙ্গামাটির রক্তিম ধূসর ধ্বংসস্তুপে কিছু কিছু খনন কার্য হইয়াছে; এই স্তৃপ সমতল ভূমি হইতে প্রায় ৪০/৫০ ফুট উচু, কিন্তু ইহার অনেকাংশ ভাগীরথী প্রবাহে ভাঙিয়া ধুইয়া গিয়াছে। ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে প্রায় দুই মাইল জুড়িয়া ছিল রাজধানীর বিস্তৃতি; নদীপ্রবাহের ধ্বংসাবশেষের অনেক ভাঙিয়া ধুইয়া যাওয়া সত্ত্বেও ইহা বুঝিতে কিছু কষ্ট হয় না। রাক্ষসীডাঙার ধ্বংসস্তৃপ খননে আনুমানিক সপ্তম শতকীয় একটি বৌদ্ধ বিহারের ভিত্তিচিহ্নের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। রাজা কর্ণের স্তৃপ নামে খ্যাত যে-ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান, তাহাই বোধ হয় ছিল প্রাচীন রাজপ্রাসাদ।
অষ্টম শতকের শেষার্ধে অনৰ্ঘারাঘবের গ্রন্থকার মুরারী চম্পকে গৌড়ের রাজধানী বলিয়া বৰ্ণনা করিয়াছেন। এই চম্পা গঙ্গাতীরবর্তী এবং বর্তমান ভাগলপুরের নিকটবর্তী চম্পানগরী-চম্পাপুরী হওয়াই স্বাভাবিক; তবে, আইন-ই-আকবরী গ্রন্থের মন্দারণ-সরকারের (হুগলী-মেদিনীপুর) অন্তৰ্গত চম্পানগরী হওয়াও একেবারে অসম্ভব নয়।
বিজয়পুর
ধোয়ী কবির পবনদূতের সাক্ষ্য প্রমাণিক হইলে স্বীকার করিতে হয়, সেন-রাজাদের (অন্তত লক্ষ্মণসেনের) প্রধান রাজধানী ছিল বিজয়পুর (স্কন্ধাবারং বিজয়পুরিমতুন্নতাম রাজধানীম)। ধোয়ীর বিবরণীর আক্ষরিক অনুসরণ করিলে বিজয়পুর যে তপন-তনয়া যমুনা ও ভাগীরথী সঙ্গমের অদূরে অবস্থিত ছিল (ভাগীরথ্যািস্তপনতনয়া যত নির্যাতি দেবী), তাহা অস্বীকার করিবার উপায় থাকে না। কেহ কেহ বিজয়পুরকে নবদ্বীপ নদীয়া বা রাজশাহী জেলার বিজয়নগরের সঙ্গে এক এবং অভিন্ন বলিয়া মনে করিয়াছেন। ধোয়ীর পবনদূত কখনও গঙ্গা অতিক্রম করিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ নাই; কাজেই বিজয়পুর উত্তর বঙ্গে অবস্থিত হওয়া অসম্ভব। নবদ্বীপ-নদীয়া ত্ৰিবেণীর কিছুটা দূরে; পবনদূতের বর্ণনা অনুসারে বিজয়পুর ত্ৰিবেণী হইতে এতদূরে হইতে পারে না। বিজয়পুরের যে বর্ণনা ধোয়ী দিতেছেন তাহাতে উচ্ছসময় অত্যুক্তি আছে, সন্দেহ নাই; তবু, রাজধানীর নাগরিক ঐশ্বর্যাড়ম্বরের খানিকটা পরিচয় পাওয়া যায়।
দণ্ডভুক্তি
পশ্চিম-দক্ষিণবঙ্গের আর একটি সুপ্ৰসিদ্ধ নগর দণ্ডভুক্তি। এই নগর দণ্ডভুক্তির এবং পরে দণ্ডিভুক্তি-মণ্ডলের শাসনাধিষ্ঠানরূপে খ্যাতিলাভ করিয়াছিল। মেদিনীপুর জেলার দাঁতন থানা ও দাঁতন শহর প্রাচীন দণ্ডভুক্তির স্মৃতি বহন করিতেছে।
ত্ৰিবেণী
যমুনা-সরস্বতী-ভাগীরথীর তিন ‘মুক্তবেণী’র সঙ্গমে অবস্থিত ত্ৰিবেণী প্রাচীন বাঙলার অন্যতম প্রধান তীর্থনগরী। অন্তত সেন-রাজাদের আমল হইতে আরম্ভ করিয়া তুকী আমল পর্যন্ত তীর্থ ও ব্যাবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রসিদ্ধ কেন্দ্র হিসাবে ত্ৰিবেণীর খ্যাতি অক্ষুন্ন ছিল। আজ সরস্বতী-প্রবাহ শুষ্ক, যমুনা প্রবাহের চিহ্নও অনুসন্ধানের বস্তু, কিন্তু ত্রিবেণীর তীর্থস্মৃতি আজও বিদ্যমান, যদিও আজ তাহা গণ্ডগ্ৰাম মাত্র। ত্ৰিবেণীর অবস্থান ছিল সেই দেশে যে দেশকে ধোয়ী বলিয়াছেন, “গঙ্গাবীচিপ্লুতপরিসরঃ সৌধমালাবতংসো যাস্যতুচ্চৈস্তুয়ি রসময়ো বিস্ময়ং সুহ্মদেশঃ।”
সপ্তগ্রাম
ত্ৰয়োদশ শতকের মধ্যভাগে বা শেষার্ধে ত্ৰিবেণীর দুই মাইল দূরে, ভাগীরথী সঙ্গমের সন্নিকটে সরস্বতীর তীরে সপ্তগ্রামে এক সুবৃহৎ বন্দর-নগর গড়িয়া উঠে এবং সেন-রাজাদের রাজধানী বিজয়পুরের মর্যাদা অবলুপ্ত করিয়া দেয়। ষোড়শ শতক পর্যন্ত সপ্তগ্রাম শুধু বৃহত্তম বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, দক্ষিণ-পশ্চিম বাঙলার রাজধানী, মুসলমান রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্ৰকেন্দ্র। বিপ্রদাসের মনসামঙ্গলে সপ্তগ্রামের সুন্দর ও বিস্তৃত বর্ণনা আছে।
