বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম নগর তাম্রলিপ্তির বাণিজ্যসমৃদ্ধির কথা সুপরিচিত। বহুপ্রসঙ্গে বারবার তাহা আলোচিত হইয়াছে। মহাভারত, পুরাণ হইতে আরম্ভ করিয়া টোডরমল্ল পর্যন্ত নানাগ্রন্থে নানা নামে ইহার উল্লেখ পাওয়া যায়-তাম্রলিপ্তি, তাম্রলিপ্ত, তামলিপ্তি, তাম্রলিপ্তক, তমালিনী, বিষ্ণুগৃহ, স্তম্বপুর, তামালিকা, বেলাকুল, তামোলিত্তি, দামলিপ্ত, টামালিটেস (Tamalites), টালকটেই (Taluctae), তম্বুলক ইত্যাদি। সপ্তম-অষ্টম শতক পর্যন্ত এই সামুদ্রিক বন্দরের খ্যাতি অক্ষুণ্ণ ছিল, একথা অন্যত্র আলোচনা করিয়াছি। টলেমি এই সামুদ্রিক বন্দর-নগরটির অবস্থিতি নির্দেশ করিতেছেন। গঙ্গার উপরেই; কথাসরিৎসাগরের একটি গল্পে দেখিতেছি, তাম্রলিপ্তিকা পূর্বঘুধির অদূরস্থ নগরী; দশকুমার চরিতের মতে দামলিপ্ত সমৃদ্ধ ব্যাবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র ও সামুদ্রিক বন্দর, গঙ্গার তীরে, সমুদ্রের অদূরে; য়ুয়ান-চোয়াঙও বলিতেছেন তাম্রলিপ্ত সমুদ্রের একটি খাড়ীর উপর অবস্থিত, যেখানে স্থলপথ ও জলপথ একত্র মিশিয়াছে। সমুদ্রমুখস্থিত এই বন্দর হইতেই ফাহিয়ান সিংহল এবং ইৎসিঙ শ্ৰীভোজ বা শ্ৰীবিজয়রাজ্যে (সুমাত্রা-যবদ্বীপ) যাইবার জন্য জাহাজে উঠিয়াছিলেন। রূপনারায়ণ-তীরবর্তী বর্তমান তমলুক শহর এই সুসমৃদ্ধ বাণিজ্য নগরীর স্মৃতিমাত্র বহন করিতেছে। অন্যত্র আমি দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছি, পুরাতন সরস্বতী বা গঙ্গার অন্য কোনও শাখানদীর উপর প্রাচীন তাম্রলিপ্তির অবস্থিতি ছিল, সেই নদীর খাত শুকাইয়া যাওয়ার ফলে তাম্রলিপ্তির বাণিজ্য-সমৃদ্ধি নষ্ট হইয়া যায় এবং নগর হিসাবেও তাহার প্রাধান্য আর থাকে নাই। কিন্তু তাম্রলিপ্তি শুধু দুই জলপথের সঙ্গমেই অবস্থিত ছিল না; স্থলপথেও রাজগৃহ-শ্রাবস্তি-গয়া-বারাণসীর সঙ্গেও এই নগরীর যোগ ছিল; জাতকের গল্পগুলিতে তাহার কিছু কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। সিংহলী মহাবংশ গ্রন্থের একটি গল্পে দেখিতেছি, সম্রাট অশোক সিংহলী কয়েকজন দূতকে বিদায়-সংবর্ধনা জানাইবার জন্য নিজে তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত আসিয়া সেই বন্দরে তাহাদিগকে জাহাজে তুলিয়া দিয়াছিলেন। গয়া হইতে স্থলপথে বিন্ধ্যপর্বত (ছোটনাগপুরের পাহাড়?) অতিক্রম করিয়া তাম্রলিপ্তি আসিতে তাহার ঠিক সাতদিন লাগিয়াছিল। বৃহৎ ব্যাবসা-বাণিজ্যকেন্দ্র ছাড়া তাম্রলিপ্তি শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও একটি বড় কেন্দ্র ছিল। পঞ্চম শতকে ফাহিয়ান এই নগরে দুই বৎসর ধরিয়া বৌদ্ধসূত্রের পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন ও পুনর্লিখন করিয়াছিলেন, কিছু কিছু বৌদ্ধ দেবদেবীর ছবিও আঁকিয়াছিলেন। সপ্তম শতকের শেষার্ধে ইৎসিঙ এই কেন্দ্ৰে বসিয়াই শব্দবিদ্যা অধ্যয়ন এবং সংস্কৃত শিক্ষা করিয়াছিলেন। বর্তমান তমলুক শহরের অদূরে কয়েকটি ধ্বংসস্তৃপ ছাড়া এই নগরের আর কিছুই এখন বর্তমান নাই। মাঝে মাঝে ভূমি চাষ করিতে গিয়া কিংবা গর্ত খুঁড়িতে গিয়া অথবা আকস্মিকভাবে কিছু কিছু প্রাচীনমুদ্রা, পোড়ামাটির মূর্তি ও ফলক ইতস্তত পাওয়া গিয়াছে; কোনও কোনও মুদ্রা ও মূর্তির তারিখ প্রায় খ্ৰীষ্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকের। সমৃদ্ধ ঐশ্বর্যশালী ব্যাবসা-বাণিজ্যপ্রধান তাম্রলিপ্তিতে যাতায়াতের পথঘাট দস্য তস্কর-বিরহিত ছিল না, এমন অনুমান স্বভাবতই করা চলে। বণিক, সাৰ্থবাহ, তীর্থযাত্রী, পর্যটক প্রভৃতিরা দল বাধিয়াই যাতায়াত করিতেন; কিন্তু তৎসত্ত্বেও ইৎসিঙ নালন্দার নিকট হইতে তাম্রলিপ্তি যাইবার সময় একবার পথে দাসুন্দল দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিলেন এবং অত্যন্ত আয়াসে কোনও প্রকারে তাহাদের হাত থেকে পরিত্ৰাণ লাভ করিয়াছিলেন।
পুষ্করণ, বর্ধমান
খ্ৰীষ্টীয় চতুর্থ শতকে পুষ্করণ নামে একটি নগরের উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে মহারাজ চন্দ্ৰবৰ্মার শুশুনিয়া লিপিতে। এই নগর বাঁকুড়া জেলায় দামোদরের দক্ষিণ-তীরবর্তী বর্তমান পোখরণা গ্রামের স্মৃতির মধ্যে আজও বঁচিয়া আছে। শুঙ্গ আমলের একটি ব্যক্ষিণী মূর্তির পোড়ামাটির ফলক এবং আরও কয়েকটি প্রত্নবস্তু পোখারণা গ্রামে পাওয়া গিয়াছে।
বর্ধমানও অতি প্রাচীন নগর। জৈন কল্পসূত্র, সোমদেবের কথাসরিৎসাগর, বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা প্রভৃতি গ্রন্থে এই নগরের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। কথাসরিৎসাগরে বর্ধমান বসুধার অলঙ্কার বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। জৈন কল্পসূত্রের মতে মহাবীর একবার অস্থিাকগ্রামে কিছুদিন বাস করিয়াছিলেন; চীকাকার বলিতেছেন পূর্বে এই স্থানের নাম ছিল বর্ধমান। তিনি এই নাম-পরিবর্তনের একটা কারণও উল্লেখ করিয়াছেন। খ্ৰীষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের মল্লসরুল লিপিতে, দশম শতকের ইর্দা লিপিতে এবং দ্বাদশ শতকের নৈহাটি ও গোবিন্দপুর লিপিতে দেখিতেছি। এই নগর ভুক্তি-বিভাগের শাসনাধিষ্ঠান ছিল। অনুমান হয়, এই নগর দামোদরের তীরেই অবস্থিত ছিল, যদিও বর্তমান বর্ধমান শহর ও দামোদরের বাবধান অনেক। বর্ধমান প্রাচীনকালের অতি জনপ্রিয় নাম; বাঙলার বাহিরেও স্থান নাম হিসাবে ইহার প্রচলন দেখা যায়। হর্ষবর্ধনের বাঁশখেরা লিপিতে এক বর্ধমানকোটির উল্লেখ আছে; আর্যমঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পগ্রন্থে কামরূপদেশে এক বর্ধমানপুরের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়; কান্তিদেবের চট্টগ্রাম লিপিতে (নবম শতক) হরিকেল-মণ্ডলান্তৰ্গত। আর এক বর্ধমানপুরের দেখা মিলিতেছে; এই বর্ধমানপুরেই কান্তিদেবের রাজধানী ছিল। হরিকেল যে ব্ৰহ্মপুত্র-পূর্ব পূর্ববঙ্গের অন্তর্ভুক্ত তাহা তো অন্যত্র বলিয়াছি।
