নগরের বাসিন্দা কাহারা ছিলেন তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। সে-সব নগর প্রধানত রাষ্ট্ৰীয় এবং সামরিক প্রয়োজনে গড়িয়া উঠিয়াছিল, শাসনাধিষ্ঠান ছিল যে-সব নগরে, সেখানে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক কর্মচারীরা তো বাস করিতেনই-ইহারা সকলেই চাকুরিজীবী, ধনোৎপাদক কেহই নহেন। রাজা, মহারাজা, সামন্তরাও নগরবাসীই ছিলেন। তীৰ্থমহিমার জন্য বা শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে যে-সব নগর গড়িয়া উঠিত সেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও শিক্ষার গুরু, আচার্য, পুরোহিত প্রভৃতি বৃত্তিধারী লোকেরা, তাহাদের শিষ্য, ছাত্র প্রভৃতিরাও বাস করিতেন। অন্যান্য নগরবাসীদের ধর্মাচরণ ও অনুষ্ঠানের জন্যও প্রত্যেক নগরেই ব্ৰাহ্মণ আচার্য, পুরোহিতের একটা সংখ্যা থাকিতই। ইহারা তো অনেক রাজপাদোপজীবীর বৃত্তিও গ্রহণ করিয়াছিলেন। তীৰ্থচরণোদেশে এই সব নগরে লোক যাতায়াত ছিল; যাঁহারা আসিতেন। অর্থ ব্যয় করিতেই আসিতেন। কাজেই এই সব তীর্থনগরে নানাপ্রকার শিল্পদ্রব্যের ক্ৰয়-বিক্রয়ের কেন্দ্ৰও সহজেই গড়িয়া উঠিত। কিন্তু শুধু তীর্থ-প্রয়োজনেই নয়, অধিকাংশ নগরে ব্যাবসা-বাণিজ্যের একটা প্রেরণাও ছিল একথা আগে বলিয়াছি। এই ব্যাবসা-বাণিজ্য আশ্রয় করিয়া বহুসংখ্যক শ্রেষ্ঠী, সাৰ্থবাহ, কুলিক নগরেই বাস করিতেন, অষ্টম শতকপূর্ব লিপিগুলিতে এমন প্রমাণ প্রচুর পাওয়া যাইতেছে। রাজকর্মচারী রাষ্ট্রপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সঙ্গে ইহারাই নগরের প্রধান বাসিন্দা। ইহাদের নিগমকেন্দ্রগুলিও নগরে। তাহা ছাড়া, শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কয়েকটি রাজপদের উল্লেখও লিপিগুলিতে দেখা যায়; এই পদগুলি এবং নগর-শাসন সংক্রান্ত কয়েকটি রাজকীয় পদ (যেমন পুরপাল, পুরপালোিপরিক) রাজধানী, ভুক্তি অথবা বিষয়ের রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইহারা সকলেই যে নগরবাসী, এসম্বন্ধে কোনও সংশয়ই থাকিতে পারে না। দেওপাড়া লিপির “বরেন্দ্রকশিল্পীগোষ্ঠীচুড়ামণি” রাণিক শূলপাণিও নাগরিক। বৃহদ্ধর্ম ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে যে-সব শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের তালিকা আছে তাহাদের মধ্যে কর্মকার, কংসকার, শাঙ্খিক-শঙ্খকার, মালাকার, তক্ষণ-সূত্ৰধার, শৌণ্ডিক, তন্তুবায়-কুবিন্দক প্রভৃতি সম্প্রদায়ের অনেকেই নগরে বাস করিতেন, সন্দেহ নাই। স্বর্ণকার, সুবর্ণবণিক, গন্ধবণিক, অট্টালিকাকার, কোটক, অন্যান্য ছোট বড় শিল্পী ও বণিকেরা তো একান্তই নগরবাসী ছিলেন। ইহাদের ছাড়া, অথচ ইহাদের সেবার জন্য রাজক, নাপিত, গোপ প্রভৃতির কিছু সমাজ-সেবকও নগরে বাস করিতেন বলিয়া অনুমান করা যাইতে পারে। ম্লেচ্ছ ও অন্ত্যজ পর্যায়ের কিছু কিছু সমাজ-শ্রমিকদেরও নগরে বাস করিতে হইত, যেমন ডোম, চণ্ডাল, ডোলাবাহী, চর্মকার, মাংসচ্ছেদ ইত্যাদি। কিন্তু ইহারা সাধারণত বাস করিতেন নগরের বাহিরে; চর্যাগীতে স্পষ্টতই বলা হইয়াছে ‘ডোম্বীর কুঁড়িয়া’ নগরের বাহিরে। এইসব সমাজ-সেবক ও সমাজ-শ্রমিকেরা নগরবাসী বটে, কিন্তু যথার্থত নাগরিক ইহারা নহেন; নাগরিক বলা যায় প্রধানত শ্রেষ্ঠী, শিল্পী, বণিকদের, নগরবাসী রাজ ও সম্প্রদায়ের, রাষ্ট্রপ্রধানদের এবং বিত্তবান ব্ৰাহ্মণদের।
এই নাগরিকেরাই সামাজিক ধনের প্রধান বণ্টনকর্তা, এবং যেহেতু নগরগুলিই ছিল সামাজিক ধন্যবণ্টনের প্রধান কেন্দ্র, সেইহেতু নগরগুলিতেই সামাজিক ধন কেন্দ্রীকৃত হইবার দিকে ঝোক স্বাভাবিক। সপ্তম-অষ্টম শতক পর্যন্ত বাঙলার সামাজিক ধন যতদিন প্রধানত শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্য নির্ভর ছিল ততদিন তো নগরগুলি সামাজিক ধনলব্ধ ঐশ্বৰ্য-বিলাসাড়ম্বরের কেন্দ্র ছিলই, এবং তোহা স্বাভাবিকও; কিন্তু লক্ষণীয় এই যে, অষ্টম হইতে ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত সামাজিক ধনের উৎপাদন যখন প্রধানত গ্রাম্য কৃষি ও গৃহশিল্প হইতে, তখনও নগরগুলিই সামাজিক ধনের কেন্দ্র, এবং সেই হেতু ঐশ্বৰ্যবিলাসাড়ম্বরেরও। বস্তুত, রামচরিত, পবনদূত প্রভৃতি কাব্য, সদুক্তিকর্ণামৃত ধূত বিচ্ছিন্ন শ্লোকাবলী, এবং সমসাময়িক লিপিগুলি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, গ্রাম ও নগরের প্রধান পার্থক্যই এই ধনৈশ্বর্যের তারতম্যদ্বারা চিহ্নিত। তৃতীয়-চতুর্থ শতকে বাৎস্যায়ন হইতে আরম্ভ করিয়া একাদশ-দ্বাদশ শতকের কাব্য ও প্রশস্তিগুলিতেই সর্বত্রই নগরে নগরে দেখিতেছি শ্রেণীবদ্ধ প্রাসাদাবলী, নরনারীর প্রসাধন ও অলংকার প্রাচুর্য, বারাঙ্গনাদের কটাক্ষবিস্তার, নানাপ্রকার বিলাসের উপকরণ এবং অত্যুগ্র ঐশ্বর্যের লীলা, আর, সঙ্গে সঙ্গে পাশে পাশে দেখিতেছি গ্রামবাসীদের সারল্যময় সহজ দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, এবং কখনো কখনো দারিদ্র্যের নিষ্করুণ চিত্র। অথচ, এই সব চিত্র যে-যুগের সেই যুগে গ্রামের কৃষি এবং গৃহশিল্পলব্ধ ধনই একমাত্র না হউক, প্রধান সামাজিক ধন।
০৫. কয়েকটি প্রধান প্রধান নগরের বিবরণ
প্রাচীন লিপিমালা ও সমসাময়িক সাহিত্যে অনেক নগরের উল্লেখ ও বিবরণ পাইতেছি। সকল নগর গুরুত্বে, মর্যাদায়, আয়তনে বা অর্থসম্পদে সমান ছিল না, একথা বলাই বাহুল্য। তবু, ক্ষুদ্র বৃহৎ কয়েকটি নগরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ জানিতে পারিলে প্রাচীন বাঙলার নগর-বিন্যাস সম্বন্ধে ধারণা একটু স্পষ্ট হইতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ : তাম্রলিপ্তি
