ভূরিশিতে ভূপতি নরেন্দ্র রায় সুত।
কৃষ্ণচন্দ্ৰ পাশে রবে হয়ে রাজচ্যুত ৷
ভারতচন্দ্রের সত্যপীরের কথায়ও এই গ্রামের উল্লেখ আছে। মুসলমান ঐতিহাসিকেরা এই গ্রামকে ভোসট বলিয়া জানিতেন।
পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গ
পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের কয়েকটি গ্রামের একটু পরিচয় এইবার লওয়া যাইতে পারে। ষষ্ঠ শতকের বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর লিপিতে উত্তরমণ্ডলভুক্ত কন্তেড়দক গ্রামের একটু বিবরণ পাওয়া যাইতেছে। এই গ্রামের ভৌগোলিক সংস্থান আগেই কতকটা উল্লেখ করা হইয়াছে। গ্রামটি মহাযানিক অবৈবর্তিক ভিক্ষুসংঘের একটি বড় কেন্দ্র ছিল এবং অন্তত দুইটি বৌদ্ধ-বিহারও ছিল এই গ্রামে। তাহা ছাড়া প্ৰদ্যুন্নেশ্বরের একটি মন্দিরও ছিল। গ্রামটির অবস্থিতি যে নিম্নশায়ী জলাভূমিতে এই সম্বন্ধে লিপিগত সংবাদ কোনও সংশয়ই রাখে না। বিহারটির চতুঃসীমায় নৌযোগ, নৌখাট, নৌযোগখাট, বিলাল (বিল), খাল এবং হজিকখিলভূমিই তাহার প্রমাণ। নৌযোগ, নৌখট ইত্যাদির উল্লেখ হইতে মনে হয়, ছোট বড় নৌকা ইত্যাদির বৃহৎ আশ্রয়ও ছিল এই গ্রামে। গঞ্জ বা বন্দর ছিল বলিয়াই হয়তো এই সব নৌযোগ, নৌখট ইত্যাদি গড়িয়া উঠিয়াছিল। বর্তমান ত্রিপুরার ভাটি অঞ্চলে তোহা কিছু অসম্ভবও নয়। এই শতকেই ফরিদপুরের কোটালিপাড়া অঞ্চলে কয়েকটি গ্রামের পরিচয় পাওয়া যাইতেছে গোপচন্দ্ৰ-ধর্মাদিত্য-সমাচার দেবের পট্টোলীগুলিতে। বারকমণ্ডলের একটি গ্রামে বহু ভূমি পতিত পড়িয়াছিল; নিম্নভূমিও ছিল প্রচুর, এবং সেখানে বন্য জন্তুরা চরিয়া বেড়াইত; সেই ভূমি হইতে রাজকোষে কোনও অর্থাগম হইত না। কাজেই রাজা যখন.সেই ভূমি কর্মকার্যের জন্য বিক্রয় করিলেন তখন তাহার অর্থলাভ ও পুণ্যসঞ্চয় দুইই হইল। বিক্ৰীত ভূমির পূর্বদিকে ছিল একটি পিশাচৗধুষিত পার্কটি বা পাকুড় গাছ; দক্ষিণে বিদ্যাধর জ্যোটিকা (বিদ্যাধর খাল); পশ্চিমে চন্দ্ৰবৰ্মণকোটের একটি কোণ; উত্তরে গোপেন্দ্রচারক গ্ৰাম। বারকমণ্ডলের আর একটি গ্রামে বিক্ৰীত ভূমির চতুঃসীমায় পাইতেছি, পূর্বে হিমসেনের ভূমি; দক্ষিণে তিনটি ঘাট এবং অপর একজনের শাসনদত্তভূমি; পশ্চিমে পূর্বোক্ত তিনটি ঘাটে যাইবার পথ এবং শিলাকুণ্ড; উত্তরে নাবাতক্ষেণী এবং হিমসেনের ভূমি। নাবাতক্ষেণীর উল্লেখ দেখিয়া অনুমান হয়। এই গ্রামেও একটি গঞ্জ বা বন্দর ছিল। এই মণ্ডলেরই আর একটি গ্রামের বিক্ৰীত ভূমিসীমায় পাইতেছি একটি গোযান চলাচলের পথ, পাকুড় গাছ এবং একটি নৌদণ্ডক। তদানীন্তন কোটালিপাড়া অঞ্চলের গ্রামগুলি যে নৌগামী ব্যাবসা-বাণিজ্যের সমৃদ্ধ কেন্দ্র ছিল, নৌদণ্ডক, নাবাতক্ষেণী, নৌযোগ, নৌখট প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার তাহার আংশিক প্রমাণ। অষ্টম শতকে ঢাকা অঞ্চলের (ঢাকা শহর হইতে ৩০ মাইল, শীতললক্ষ্যার অদূরে, আস্রফপুর গ্রাম) কয়েকটি গ্রামের পরিচয় পাইতেছি দেবখড়েগির আস্রফপুর লিপি দুইটিতে। এই অঞ্চলের একটি বা একাধিক গ্রামের বিভিন্ন পাটকে (পাড়ায়) চারিটি বৌদ্ধবিহার ও বিহারিক (ছোট বিহার) ছিল। এবং ইহাদের আচার্য ছিল বন্দ্য সংঘমিত্র। সংঘমিত্রের শিষ্যবর্গের মধ্যে শালিবািদক ছিলেন। অন্যতম। বিভিন্ন পাটকের বিভিন্ন কৃষক ও গৃহস্থদের অধিকার হইতে ভূমি বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়া (ইতাদের মধ্যে অন্যান্য অনেকের সঙ্গে রানী শ্ৰীপ্ৰভাবতী, শুভংসুক নামে একটি মহিলা, বন্দ্য জ্ঞানমতি নামে একজন বৌদ্ধ আচার্য (?) এবং শ্ৰীউদীর্ণখড়গ নামে রাজপরিবারের (?) একজন মাননীয় ব্যক্তিও আছেন)। পূর্বোক্ত চারিটি বিহার-বিহারিকের অধিকারে দান করা হইয়াছিল, আচার্য সংঘমিত্রের তত্ত্বাবধানে। বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মপ্রতিষ্ঠান, গঞ্জ, বন্দর, নৌকা-যাতায়াত পথ ইত্যাদি লইয়া ফরিদপুর ঢাকা-ত্রিপুরার পূর্বোক্ত গ্রামাঞ্চলগুলিতে সমৃদ্ধ জনপূর্ণ বসতি ছিল। এরূপ অনুমান অযৌক্তিক নয়।
ধর্মপালের খালিমপুর লিপিতে ব্যাঘ্ৰতটীমণ্ডলের মহন্তাপ্রকাশ-বিষয়ের অন্তর্গত ক্ৰৌঞ্চশ্বভ্র গ্রামের সীমা-পরিচয় প্রসঙ্গে এই গ্রাম ও অন্য আরও তিনটি গ্রামের কিছু কিছু পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। ক্ৰৌঞ্চশ্বভ্রাগ্রামের ‘পশ্চিমে গঙ্গিনিকা, উত্তরে কাদম্বরী অর্থাৎ সরস্বতীর দেউল (দেবকুলিকা) ও খেজুর গাছ। পূর্বোত্তরে রাজপুত্র দেবটকৃত আলি, এই আলি বীজপূরকে (টাবা লেবুর বাগান?)। গিয়া প্রবিষ্ট হইয়াছে। পূর্বদিকে বিকটকৃত আলি, তাহা খািটক-যানিকাতে (খালে) গিয়া প্রবেশ করিয়াছে; তাহার পর জম্বু-যানিক (যে-খালের দুই ধারে বা তাপী লেবুর গাছ?) আক্রমণ করিয়া তাহার পাশ দিয়া জম্বুযানক পর্যন্ত গিয়াছে। তথা হইতে নিঃসৃত হইয়া পুণ্যারামবিন্ধাৰ্দ্ধস্রোতিক পর্যন্ত গিয়াছে। তথা হইতে নিঃসৃত হইয়া, নলচৰ্মটের উত্তর সীমা পর্যন্ত গিয়াছে। নলচৰ্মটের দক্ষিণে নামুণ্ডি-কায়িকা-হইতে খণ্ডমুণ্ডমুখ পর্যন্ত, সেখান হইতে বেদস্যবিন্ধিকা, তাহার পর রোহিতবাটী-পিণ্ডারবিটি-জোটিকা (খােল)-সীমা, উক্তারযোটের দক্ষিণ এবং গ্রামবিন্ধের দক্ষিণ পর্যন্ত দেবিক সীমাবিটি ধর্ময়োজ্যোটিকা (খাল)। এই প্রকার মাঢ়াশাল্মিলী নামক গ্রাম (তুলনীয়, নিধনপুর লিপির ময়ুরশাল্মলী)। তাহার উত্তরেও গঙ্গিনিকার সীমা; তাহার পূর্বে অর্দ্ধস্রোতিকার সহিত মিলিত হইয়া আম্রযানকোলার্দ্ধ-যানিকা (আম্রকাননবতী খাল?) পর্যন্ত গিয়াছে। তাহার দক্ষিণে কালিকাশ্বত্র; তথা হইতেও নিঃসৃত (বর্তমান, গাঙ্গিনা) গিয়া প্রবিষ্ট হইয়াছে। পালিতকের সীমা দক্ষিণে কাণদ্বীপিকা, পূর্বে কোঠিয়া স্রোত, উত্তরে গঙ্গিনিকা, পশ্চিমে জেনন্দায়িকা। এই গ্রামের শেষ সীমায় পর্যকর্মকৃষ্ট্ৰীপ স্থলীঙ্কট-বিষয়ের অধীন আস্ৰষণ্ডিকা-মণ্ডলের অন্তর্গত গো-পিপ্পলী গ্রামের সীমা, পূর্বে উড়গ্রামমণ্ডলের (উড্রাগ্রাম কি সেই গ্রাম যে-গ্রামে ওড়ি বা ওড়িশাবাসীদের বসতি ছিল বেশি?) সীমায় অবস্থিত গোপথ। উপরোক্ত ব্যাঘ্রতটীমণ্ডল, যে দক্ষিণ-বঙ্গের ব্যাঘ্ৰ্যাধুষিত নিম্নশায়ী বনময় জনপদ, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। সমুদ্রতীরবর্তী নিম্নভূমি বলিয়াই এইসব গ্রামাঞ্চলে গঙ্গিনিকা, যানিকা, স্রোত, স্রোতিকা, জোটিকা, খাটিকা, দ্বীপ, দ্বীপিকা প্রভৃতির এত প্রাদুর্ভাব। বিশ্বরূপসেনের একটি লিপিতে বঙ্গের নাব্যভাগে রামসিদ্ধিপাটক নামে একটি গ্রামের উল্লেখ আছে; এই গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিমে বরাহকুণ্ড, পূর্বে দেওহারের দেবভোগ-সীমা; দক্ষিণে বঙ্গলবাড়া নামক গ্রামের ভূমি; পশ্চিমে একটি নদী; উত্তরে একই নদী। এই নাব্যভাগেই বিনয়তিলক নামে আর একটি গ্রাম ছিল; এই গ্রামের পূর্বে সমুদ্র; দক্ষিণে প্ৰণুল্লাভূমি; পশ্চিমে একটি বাধা (জাঙ্গলসীমা); উত্তরে স্বীয় শাসনসীমা। নাব্য জনপদ-ভাগটাই ছিল নৌচলাচল-নির্ভর আর এই গ্রাম একেবারে ছিল সমুদ্রশায়ী। কেশবসেনের ইদিলপুর লিপিতে বিক্রমপুর ভাগের অন্তর্গত তালপাড়া পাটক নামে আর একটি গ্রামের খবর পাওয়া যাইতেছে। এই গ্রামের পূর্বে শত্রকাদ্বি গ্রাম; দক্ষিণে শঙ্করপাশা (পাশা-অন্ত্য গ্রাম-নাম তো বরিশাল-ফরিদপুর অঞ্চলে সুপ্রচুর) এবং গোবিন্দকেলি নামে দুইটি গ্রাম, পশ্চিমে শংকর গ্রাম, উত্তরে বাংগুলীবিত্ত-গ্ৰাম। বিশ্বরূপসেনের মদনপাড়া লিপিতে পিঞ্জোকাস্টি এবং কন্দপশংকর নামে দুইটি গ্রামের উল্লেখ আছে। পিঞ্জোকাস্টি বর্তমান ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া পরগণার পিঞ্জারি গ্রাম। যাহা হউক, পিঞ্জোকাস্টি গ্রামের পূর্বদিকে আঠপাগ গ্রামের বাধ (জাঙ্গলভূ); দক্ষিণে বারট্রয়ীপাড়া (বারুইপাড়া?); পশ্চিমে উঞ্চোকাস্টি গ্রাম; উত্তরে বীরকাটি গ্রামের বাঁধ (কাস্টি, কাটি-বর্তমান কাটি; তুলনীয়, বরিশাল-ফরিদপুর, অঞ্চলের ঝালকাটি, কলসকাটি, লক্ষ্মণকাটি ইত্যাদি)। এই রাজারই সাহিত্য-পরিষদ লিপিতে বিক্রমপুর ভাগের লাউহণ্ডা। চতুরকের অন্তর্গত দেউলহস্তি গ্রামের বর্ণনা প্রসঙ্গে দেখিতেছি, এই গ্রামের পূর্ব ও পশ্চিমে রাজহতা নদী। শ্ৰীমৎ ডোম্মনপালের সুন্দরবন লিপিতে পূর্বখাটিকার অন্তর্গত ধামহিথা নামে একটি গ্রামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় একটু পাইতেছি; এই গ্রামের বাহিরে বোধ হয় একটি বৌদ্ধবিহার ছিল (রত্নত্ৰয়বহিঃ)। লক্ষ্মণসেনের আনুলিয়া লিপির মাথরণ্ডিয়া নামে আর একটি গ্রামের অবস্থিতি ছিল ব্যাঘ্ৰতটীতে; এই গ্রামে একটি বটবৃক্ষ এবং একটি জলপিল্লের (জলময় নিম্নভূমি?) উল্লেখ আছে। ইহারই সংলগ্ন ছিল আর দুইটি গ্রাম; শান্তিগোপী এবং মালামঞ্চবটী। বাঙলার পূর্ব-দক্ষিণতম প্রান্তের চাটিগ্রাম আনুমানিক দশম শতক হইতেই একটি সমৃদ্ধ ও মর্যাদাসম্পন্ন গ্রাম ছিল বলিয়া মনে হইতেছে। তিব্বতী বৌদ্ধপুরাণ মতে, চাটিগ্রাম বৌদ্ধ তান্ত্রিক গুরু তিল-যোগীর জন্মভূমি ছিল (দশম শতক)। এই গ্রামে পণ্ডিত বিহার নামে সুবৃহৎ একটি বৌদ্ধবিহার ছিল এবং বিহারে বসিয়া বৌদ্ধ-আচার্যরা সমবেত বিরুদ্ধবাদী পণ্ডিতদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক করিতেন। এই চাটিগ্রামই কিছুদিন পরে মধ্যযুগে পূর্ব-বাঙলার বৃহত্তম সামুদ্রিক বাণিজ্যের বন্দর-নগরে পরিণত হইয়াছিল চট্টগ্রাম নাম লইয়া। রাজা গোবিন্দকেশবদেবের ভাটেরা লিপিতে একসঙ্গে ২৮টি গ্রামের উল্লেখ আছে; ভট্টপাটক গ্রামের শিবমন্দিরের পরিচালনার জন্য এই ২৮টি গ্রামে ২৯৬টি বাড়ি (ঘর?) এবং ৩৭৫ হল জমি দান করা হইয়াছিল। ভট্টপাটক বর্তমান ভাটেরা গ্রাম, কুলাউড়া-শ্ৰীহট্ট রেলপথের ধারেই। বাকী ২৮টি গ্রামের নাম প্রায় অবিকৃত ভাবে এখনও ভাটেরার আশেপাশে বিদ্যমান। এই গ্রামগুলি হইতে প্রায় ৯০০ শত বৎসরের পূর্বেকার গ্রাম-বিন্যাসের চেহারা এখনও কতকটা অনুমান করা চলে।
