উত্তরবঙ্গ
দামোদরপুরে প্রাপ্ত গুপ্ত আমলের একটি লিপিতে (৩ নং) পলাশবৃন্দক নামে একটি স্থানের উল্লেখ আছে; এই স্থান হইতেই ভূমি বিক্রয়ের রাজকীয় আদেশ নিঃসৃত হইয়াছিল। পলাশবৃন্দক যে একটি গ্রাম, এই ইঙ্গিত লিপিতেই পাওয়া যায়। দিনাজপুর শহরের ষোল মাইলের মধ্যে পলাশবাড়ি নামে দুইটি গ্রাম এখনও বিদ্যমান, পলাশডাঙ্গা নামে আর একটি গ্রামও আছে দিনাজপুর শহরের ১১ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে। এই তিনটি গ্রামই দামোদরপুরের খুব সন্নিকটে। গুপ্ত আমলের পলাশবৃন্দক বোধ হয় খুব বড় গ্রাম ছিল এবং ইহা যে একাধিক ‘পলাশ-পূর্বনাম গ্রামের সমষ্টি ছিল তাহা ‘বৃন্দক’ শব্দের ব্যবহার হইতেও অনুমেয়। রেনেলের নকশায়ও (১৭৬৪-৭৬) দেখিতেছি, পলাশবাড়ী বেশ বড় ও মর্যাদাসম্পন্ন স্থান। এই লিপিতেই চণ্ডীগ্রাম নামে আর একটি গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে। গুপ্ত আমলের লিপিগুলিতে অনেক গ্রামের উল্লেখ আছে; তন্মধ্যে স্বচ্ছন্দপাটক, সাতুবনাশ্ৰমক, হিমবচ্ছিখরাবস্থিত ডোঙ্গাগ্রাম, বায়িগ্রাম (বর্তমান বৈগ্রাম, বগুড়া জেলা), পুরাণবৃন্দিকহরি, পৃষ্ঠিমপেট্টিক, গোষাটপুঞ্জক, নিত্বগোহালী, পলাশাট্ট, বট-গোহালী প্রভৃতি গ্রাম উল্লেখযোগ্য। এই গ্রামগুলি প্রায় সবই দিনাজপুর-রাজশাহী-বগুড়া জেলার অন্তর্গত। বায়িগ্রাম যে একাধিক গ্রামখণ্ডের সমষ্টি ছিল তাহা তো আগেই বলিয়াছি। শ্ৰীগোহালী এবং ত্ৰিবৃত এই গ্রামের অন্তৰ্গত ছিল। দামোদরপুরের ১৪ মাইল উত্তরে বৃন্দকুড়ি নামে একটি গ্রাম এখনও বিদ্যমান; এই গ্রাম হয়তো পুরাণবৃন্দিকহরির স্মৃতি বহন করিতেছে। নিত্বগোহালী গ্রাম মূল নাগিরট্টমণ্ডলের (অর্থাৎ, মণ্ডল-শাসনাধিষ্ঠানের) সংলগ্ন ছিল, পাহাড়পুর লিপিতেই এইরূপ ইঙ্গিত আছে। পৃষ্ঠিমপেট্টিক, গোষাটপুঞ্জক এবং পলাশষ্ট্র গ্রাম ছিল নাগিরট্টমণ্ডলান্তৰ্গত। দক্ষিণাংশকবীথীর অন্তর্গত। বটগোহালী পাহাড়পুরের সংলগ্ন গোয়ালভিটা গ্রাম হওয়া অসম্ভব নয়। মুঙ্গের জেলার নন্দপুর গ্রামে প্রাপ্ত একটি লিপিতে অম্বিল গ্রামাগ্রহার নামে একটি অগ্রহার গ্রামের উল্লেখ পাইতেছি। এই গ্রামে বিষয়পতি ছত্ৰমহের অধিষ্ঠান-অধিকরণের অবস্থিতি হইতে গ্রামটির আয়তন ও মর্যাদা অনুমান করা কঠিন নয়। শাসনাধিষ্ঠানরূপে কোনও কোনও গ্রাম যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করিয়া আয়তনে ও গুরুত্বে বাড়িয়া উঠিত, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। অম্বিলগ্রামাগ্রহারের মতো পলাশবৃন্দকও ছিল এই রকম একটি গ্রাম; এই গ্রাম হইতে রাজকীয় শাসনের নির্গতি দেখিয়া এই অনুমান করা চলে যে, পশালবৃন্দকেও শাসনাধিষ্ঠানের একটি কেন্দ্র ছিল।
প্রথম মহীপালের বাণগড় লিপিতে কোটীবর্ষ-বিষয়ের গোকলিক-মণ্ডলের অন্তর্গত কুরটুপল্লিকা গ্রামের উল্লেখ পাইতেছি। এই গ্রামের একটি অংশের নাম ছিল চুটপল্লিকা (অর্থাৎ ছোটপল্লী বা ছোটপাড়া)। দ্রাবিড়ী চুটি শব্দের অর্থই তো ছোট। তৃতীয় বিগ্রহপালের আমগাছি লিপিতে কোটীবৰ্ষ-বিষয়ান্তর্গত ব্ৰাহ্মণীগ্ৰামমণ্ডল নামে একটি মণ্ডলের উল্লেখ আছে; ব্ৰাহ্মণীগ্রামই সম্ভবত মণ্ডলের শাসনাধিষ্ঠান ছিল এবং সেইহেতু ঐ গ্রামকে আশ্রয় করিয়াই মণ্ডলটির নামকরণ হইয়াছিল। বিষমপুর নামক স্থানের দণ্ডত্ৰহেশ্বরের মন্দির এই মণ্ডলের অন্তর্গত ছিল। লক্ষ্মণসেনের মাধ্যাইনগর লিপিতে পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তিবদ্ধ বরেন্দ্রীর অন্তর্গত কান্তাপুর-আবৃত্তিতে দাপনিয়া পাটক নামে এক গ্রামের উল্লেখ আছে; এই গ্রামের নিকটেই রাবণসরসী নামে একটি দীঘির উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এই লিপি-প্রদত্ত ভূমির পূর্বে চড়সপালা-পাটকের পশ্চিম সীমা; দক্ষিণে গায়নগরের উত্তরাংশ; পশ্চিমে গুণ্ডাস্থিরা-পাটকের পূর্বাংশ; উত্তরে গুন্তী-দাপনিয়ার দক্ষিণাংশ। এই রাজারই তৰ্পণদীঘি শাসন বরেন্দ্রীর অন্তর্গত বেলহিষ্ঠী গ্রামের পূর্বসীমায় বৌদ্ধবিহারসীমাজ্ঞাপক একটি বাঁধ; দক্ষিণ সীমায় নিচড়হার পুষ্করিণী; পশ্চিমে নন্দিহরিপাকুণ্ডী গ্রাম ও মোল্লাণ-খাড়ী নামে খাল। কামরূপরাজ জয়পালের সময়ের (একাদশ শতক) সিলিমপুর লিপিতে বালগ্রাম নামে আর একটি গ্রাম সম্বন্ধে বলা হইয়াছে যে, পুণ্ড্রদেশান্তর্গত এই গ্রাম বরেন্দ্রীর অলঙ্কার স্বরূপ ছিল (বরেন্দ্রীমণ্ডনং গ্রাম) এবং এই গ্রাম ও তর্কারির মধ্যে সকটি নদীর ব্যবধান ছিল (সকাটীব্যবধানবান)। তর্কারি ব্রাহ্মণ ও করণদের খুব বড় কেন্দ্র ছিল, তর্কারি-তর্কারিকা-তর্কার-টক্কার-টকারীর উল্লেখ সমসাময়িক অনেক লিপিতেই পাওয়া যায়। সন্দেহ নাই যে, এই গ্রাম সমসাময়িক কালে বাঙলায় এবং বাঙলার বাহিরে একাধিক কারণে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিল। এই গ্রামের অবস্থিতি-নির্দেশ লইয়া পণ্ডিতমহলে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে কিন্তু ইহা যে প্রাচীন বরেন্দ্রীর অন্তর্গত, এ সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। বিশ্বরূপসেনের মদনপাড়া লিপি এবং কেশবসেনের ইদিলপুর লিপি দুইই নিৰ্গত হইয়াছিল “ফল্পগ্রাম পরিসর সমাবাসিত-শ্ৰীমজ্জয়স্কন্ধাবারাৎ।” লক্ষ্মণসেনের মাধাইনগর লিপিও নির্গত হইয়াছিল। ধার্যগ্রাম জয়স্কন্ধাবার হইতে। ফন্মগ্রাম ও ধার্যগ্রামে জয়স্কন্ধাবার স্থাপনার ইঙ্গিত হইতে এই অনুমান স্বাভাবিক যে, সমসাময়িক কালের সেনারাষ্ট্রে এই গ্রাম দুইটির বিশেষ একটা মর্যাদা ও গুরুত্ব ছিল, নহিলে মহারাজের জয়স্কন্ধাবার গ্রামে স্থাপিত হইতে পারিত না; অন্তত জয়স্কন্ধাবার স্থাপনের পর তো গুরুত্ব ও মর্যাদা নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। কোনও কোনও গ্রামে যে শাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হইত। তাহার কতকটা যুক্তিসিদ্ধ অনুমান তো ব্ৰাহ্মণীগ্ৰামমণ্ডল হইতেই পাওয়া যায়। সেন আমলের শেষের পর্বে কোনও কোনও গ্রাম জয়স্কন্ধাবারের মর্যাদাও লাভ করিয়াছে, দেখিতেছি।
০৪. নগর ও নগরের সংস্থান
বাঙলাদেশের কৃষিপ্রধান প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতি যেমন বহুলাংশে সুপ্রাচীন অস্ট্রিক-ভাষাভাষী আদিবাসীদের দানের উপর গড়িয়া উঠিয়াছে, নাগরিক সভ্যতা, মনে হয়, তেমনই পরিমাণে ঋণী দ্রাবিড়-ভাষাভাষী লোকেদের নিকট। এ-সম্বন্ধে নরতাত্ত্বিক গবষেণালব্ধ কিছু কিছু তথ্যের ঐতিহাসিক ইঙ্গিত দ্বিতীয় অধ্যায়ে ধরিতে চেষ্টা করিয়াছি। প্রাচীন বাঙলার অনেক ব্যক্তি ও স্থান নাম সম্বন্ধে যে সুদীর্ঘ শব্দতাত্ত্বিক গবেষণা হইয়াছে, তাহাও এই ইঙ্গিতের সমর্থক।
