আসীদ্দক্ষিণরাঢ়ায়াং দ্বিজানাং ভুরিকর্মণাম।
ভূরিসৃষ্টিরিতি গ্রামো ভূরিশ্রেষ্ঠিজনাশ্রয়ঃ ॥
লিপিগুলিতে অসংখ্য গ্রামের উল্লেখ পাইতেছি, একথা আগেই বলা হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে আয়তনে ও মর্যাদায় গুরুত্বসম্পন্ন কয়েকটি গ্রামের লিপি-প্রদত্ত বিবরণ উল্লেখ করিলে প্রাচীন বাঙলার গ্রামগুলি সংস্থান ও বিন্যাস সম্বন্ধে ধারণা একটু পরিষ্কার হইতে পারে।
০৩. কয়েকটি প্রধান প্রধান গ্রামের বিবরণ
পশ্চিমবঙ্গ
পশ্চিম-বাঙলার গ্রাম লইয়াই আরম্ভ করা যাক। ঔদুম্বরিক বিষয়ের বপ্যঘোষবাট গ্রামের কথা আগেই বলিয়াছি। মল্লসরুল লিপিতে কয়েকটি বাটক-পাটক এবং অগ্রহার গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে। নয়পালের ইর্দা লিপিতে বৃহৎ-ছত্তিব্যগ্লা নামে এক গ্রামের উল্লেখ আছে; এই গ্রাম ছিল বর্ধমান ভুক্তির দণ্ডভুক্তিমণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত। বৃহৎ-ছত্তিব্যগ্লা নাম দেখিয়া মনে হয়, ক্ষুদ্রছত্তিবান্না গ্রামও একটি ছিল। ছত্তিবগ্ন বাঁকুড়া জেলার চণ্ডীদাসম্মুতি-বিজড়িত ছাতনা কিংবা সুবৰ্ণরেখা নদী তীরবর্তী ছাতনা গ্রাম হওয়া অসম্ভব নয়। ভোজবৰ্মার বেলাব লিপিতে উত্তর রাঢ়ের অন্তর্গত সিদ্ধল গ্রামের উল্লেখ আছে; ভট্ট ভবদেবের প্রশস্তিতে এই গ্রামকে আর্যাবর্তের ভূষণ, সমস্ত গ্রামের অগ্রগণ্য এবং রাঢ়লক্ষ্মীর অলংকার বলিয়া বৰ্ণনা করা হইয়াছে। প্রাচীন সিদ্ধল গ্রাম এবং বর্তমান বীরভূম জেলার লাভপুর থানার অন্তর্গত সিদ্ধল গ্রাম এক এবং অভিন্ন, এ-বিষয়ে সন্দেহ করিবার কারণ নাই। পূর্বোক্ত লিপিতেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে যে সাবর্ণগোত্রীয় বেদবিদ ব্ৰাহ্মণদের আবাসস্থল বলিয়া এই গ্রামের একটা বিশেষ মর্যাদা ছিল। উত্তরাঢ়মণ্ডলের স্বল্পদক্ষিণবীথির অন্তর্গত বাল্লহিটুঠা নামে আর একটি গ্রামের ভৌগোলিক বিন্যাসের একটু বিস্তৃততর খবর পাওয়া যাইতেছে বল্লালসেনের নৈহাটি লিপিতে। বাল্লহিটুঠা বর্তমান নৈহাটির ৬ মাইল পশ্চিমে বালুটিয়া গ্রাম। এই বাল্লিহিটুঠ গ্রামের চতুঃসীমা এই ভাবে দেওয়া হইয়াছে : ১. খণ্ডয়িল্লা (বর্তমান খাড়ালিয়া) গ্রামের উত্তর দিক দিয়া যে সিঙ্গটিয়া নদী প্রবহমানা তাহার উত্তরে; নাড়িচা গ্রামের উত্তর দিক দিয়া এরই সিঙ্গটিয়া প্রবহমানা, তাহারও উত্তর-পশ্চিমে; ২. অম্বয়িল্লা (বর্তমান অম্বল গ্রাম) গ্রামের পশ্চিম বাহিয়া এই একই নদী প্রবহমানা, তাহার পশ্চিমে; ৩. কুড়ুম্বমাির দক্ষিণ সীমালির দক্ষিণে; কুড়ম্বমাির পশ্চিমে পশ্চিমাভিমুখী সীমালিরও দক্ষিণে; আউহাগডিয়ার দক্ষিণ গোপথেরও দক্ষিণে; এই আউহাগডিয়ার উত্তর দিকে আর একটি গোপথ, এই গোপথ হইতে একটি সীমালি সোজা পশ্চিম অভিমুখী হইয়া সুরকোণাগডিয়াকিয়ের উত্তর সীমালিতে গিয়া মিশিয়াছে, তাহারও দক্ষিণে; ৪. নাডিনা গ্রামের পূর্ব সীমালির পূর্বে; জলসোখী গ্রামের (বর্তমান মুর্শিদাবাদে ঐ নামীয় গ্রাম) পূর্ব গোপথেরও কতকটা পূর্বে; মোলাড়ন্তী (বর্তমান মুড়ুন্দি) গ্রামে পূর্বদিকে সিঙ্গটীয়া নদী পর্যন্ত যে গোপথ, তাহারও কথঞ্চিৎ পূর্বদিকে। খাণ্ডয়িল্লা (খান্ডুলিয়া), অম্বয়িল্লা (অম্বলগ্রাম), জেলাসোথী (বর্তমানেও ঐ নাম), মোেলাড়ন্তী (মুড়ুন্দি) এবং বাল্লহিটুঠা (বালুটিয়া) গ্রাম তাহাদের প্রাচীন নামস্মৃতি লইয়া এখনও বিদ্যমান; ইহাদের বর্তমান সংস্থান হইতে প্রাচীন বাঙলার গ্রাম-সংস্থানের কতকটা আভাস পাওয়া যায়। লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর পট্টোলীতে বিডডােরশাসন নামে আর একটি গ্রামের পরিচয় পাইতেছি; এই গ্রাম বর্ধমানভুক্তির পশ্চিমখাটিকাভুক্ত বেতডডচতুরকের (হাওড়া জেলার বর্তমান বেতড়) অন্তর্গত। বিডডাশাসন গ্রামের পূর্বার্ধ সীমা স্পর্শ করিয়া জাহ্নবী নদী (বর্তমান হুগলী নদী) প্রবহমানা; দক্ষিণে লেংঘদেব মণ্ডপী (শিবলিঙ্গ মন্দির?); পশ্চিমে একটি ডালিম্বক্ষেত্র সীমা; উত্তরে ধর্মনগর সীমা। এই রাজারই শক্তিপুর শাসনে আরও কতকগুলি গ্রামের পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। উত্তররাঢ়ের কঙ্কগ্রামভুক্তির (বর্তমান কাকজোল অঞ্চল) মধুগিরিমণ্ডলের (বর্তমান মহুয়াগঢ়ি, কাকজোলের ২২ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে) কুন্তীনগর-প্রতিবদ্ধ (বর্তমান কুন্ধীর, মহুয়াগঢ়ি হইতে ২০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে, বীরভূম জেলার রামপুরহাট থানায়), দক্ষিণ-বীথীর অন্তর্গত কুমারপুর চতুরক। মোর বা বর্তমান ময়ূরাক্ষী নদীর ৩২ মাইল উত্তরে মৌরেশ্বর থানার অন্তর্গত কুমারপুর গ্রাম এখনও বিদ্যমান। যাহাই হউক। এই চতুরকের অন্তর্গত পাঁচটি পাটকের উল্লেখ শক্তিপুর শাসনে আছে, যথা বারহকোণা, বাল্লিহিটা, নিমা, রাঘবহট্ট এবং ডামরবড়াবদ্ধ বিজহারপুর পাটক। বারহকোণা সিউড়ি থানার বারকুণ্ডা (মোর নদীর আধ মাইল উত্তরে), বা মৌরেশ্বর থানার বারণ (মোর নদীর উত্তরে), অথবা মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার পাচগুপীর সন্নিকটে বারকোনার সঙ্গে এক এবং অভিন্ন বলিয়া বিভিন্ন পণ্ডিতেরা মত প্ৰকাশ করিয়াছেন। নিমা এবং বাল্লিহিটা যথাক্রমে বর্তমান নিমা এবং বলুটি (মৌরেশ্বর থানা) গ্রামের সঙ্গে এক এবং অভিন্ন বলিয়া প্রস্তাবিত হইয়াছে। বারকুণ্ডা, বারণ, নিমা এবং বলুটি প্রত্যেকটি গ্রামই বর্তমানে মোর নদীর উত্তরে; অথচ শক্তিপুর শাসনে ইহারা এই নদীর দক্ষিণে বলিয়া উক্ত হইয়াছে। হইতে পারে ময়ূরাক্ষী-মোর প্রবাহপথ পরিবর্তন করিয়া পুরাতন গ্রাম ধ্বংস করিয়া দিয়াছিল, কিন্তু পুরাতন নামগুলি বিলুপ্ত করিতে পারে নাই; পরে ঐ নামগুলি আশ্রয় করিয়া নূতন গ্রামের পত্তন হইয়াছে। যাহাই হউক, শক্তিপুর শাসনে দেখিতেছি, বাহরকোণা, বাল্লিহিটা, নিমা এবং রাঘবহট্ট এই চারিটি গ্রাম একত্র সংলগ্ন, এবং এক সঙ্গে একই চতুঃসীমার মধ্যে উল্লিখিত ও বর্ণিত হইয়াছে। এই চারিটি গ্রামের (চতুরকের?) পূর্বদিকে অপরাজোলী (পশ্চিম খাল?) সমেত মালিকুণ্ডা (গ্রামের) ভূমি; দক্ষিণে ব্ৰহ্মস্থল অন্তর্গত ভাগড়ীখণ্ডের ভূমি; পশ্চিমে আচ্ছমা গোপথ; উত্তরে মোর, নদী সীমা। বিজহারপুর পাটকের পশ্চিমে লাঙ্গলজোলী (লাঙ্গল-খাল?); উত্তরে পরজণ গোপথ; দক্ষিণে বিপ্রবদ্ধজোলী; পূর্বে চাকুলিয়া-জোলী। আর একটি গ্রামের উল্লেখ করিয়াই পশ্চিম-বাঙলার গ্রাম-বর্ণনা শেষ করা যাইতে পারে। ভূরিসৃষ্টি গ্রামের কথা আগেই বলিয়াছি। কৃষ্ণমিশ্রের প্রবোধচন্দ্ৰোদয় নাটকেও রাঢ়দেশান্তৰ্গত ভূরিশ্রেষ্ঠিকা নামে সুপ্ৰসিদ্ধ গ্রামের উল্লেখ আছে (একাদশ শতক)। হুগলী জেলার দামোদর নদের দক্ষিণ তীরে এই গ্রাম আজও ভুরসুট নামে পরিচিত; সমস্ত মধ্যযুগ ধরিয়া এই গ্রাম ব্ৰাহ্মণ্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি বড় কেন্দ্র ছিল। অষ্টাদশ শতকের বাঙলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায় ভুরসুটের জমিদার নরেন্দ্র রায়ের পুত্র ছিলেন। অন্নদামঙ্গলে আছে :
