গ্রামগুলির আপেক্ষিক আয়তন সম্বন্ধে কিছু ইঙ্গিত সেন-আমলের লিপিগুলিতে পাওয়া যায়। বল্লালসেনের নৈহাটি লিপিতে দেখি, বাল্লহিটুঠ গ্রামের আয়তন ৭ ভূপাটক ৭ দ্রাণ ১ আঢ়ক ৩৪ উন্মান এবং ৩। কাক (বাস্তু, ক্ষেত্র, পতিত ভূমি এবং খাল সহ), এবং বার্ষিক উৎপত্তিক ৫০০ কপর্দক পুরাণ। এই গ্রাম ছিল বর্ধমানভুক্তির উত্তররাঢ় মণ্ডলের স্বল্পদক্ষিণবীথীর অন্তর্গত। লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর লিপিতে দেখিতেছি, একই বর্ধমানভুক্তির পশ্চিম খাটিকার অন্তর্ভুক্ত বেতডডচতুরকের অন্তর্গত বিডডােরশাসন গ্রামের আয়তন (অরণ্য, জল, স্থল, গর্তভূমি, উষরভূমি, ইত্যাদি সহ) ৬০ ভূদ্রোণ ১৭ উন্মান; দ্রোণ প্রতি ১৫ পুরাণ হিসাবে বার্ষিক উৎপত্তিক ৯০০ পুরাণ। এই রাজারই তৰ্পণদীঘি লিপিতে দেখিতেছি, বিক্রমপুরের অন্তর্গত বেলহিষ্ঠী গ্রামের আয়তন মাত্র ১২০ আঢ়াবাপ (আঢক) ৫ উন্মান; বার্ষিক উৎপতি মাত্র ১৫০ কপর্দক পুরাণ। স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে, তিনটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রাম তিন বিভিন্ন আয়তনের , পাল ও সেন আমলের, এমন-কি আগেকার পর্বের লিপিগুলি বিশ্লেষণ করিলেও দেখা যাইবে, অধিকাংশ গ্রামই কোনও নদনদী, খাল, বিল, খাটিকা, খাড়ীক প্রভৃতির তীরে অবস্থিত। অধিকাংশ গ্রামে ঘাট (সঘট্ট), পুষ্করিণী ইত্যাদিও দেখা যায়। কোটালিপাড়ার একটি পট্টোলীতে গ্রামের প্রান্তে বলদের গাড়ির রাস্তাও একটি ভূমির সীমারূপে উল্লিখিত হইয়াছে। গ্রাম্যসমাজ যে কৃষিপ্রধান সমাজ তাহা তো বারবারই বলিয়াছি। কিন্তু ইহার অর্থ এই নয় যে, গ্রামে শিল্পীদের বাস ছিল না। বাঁশ ও বেতের শিল্প, কাষ্ঠশিল্প, মৃৎশিল্প, কার্পাস ও অন্যান্য বস্ত্ৰশিল্প, লৌহশিল্প ইত্যাদির কেন্দ্ৰ তো গ্রামেই ছিল, এরূপ অনুমান সহজেই করা যায়। কৃষিকর্মের প্রয়োজনীয় বাঁশ ও বেতের নানাপ্রকার পাত্র ও ভাণ্ড, ঘরবাড়ি ও নৌকা, মাটির হাঁড়িভাণ্ড প্রভৃতি দা’-কুড়াল-কোদাল, লাঙ্গলের ফলা, খন্ত ইত্যাদি নিত্য ব্যবহার্য কৃষি যন্ত্রাদি ইত্যাদির প্রয়োজন তো গ্রামেই ছিল বেশি। কার্পাস ফুল ও বীচি, তাত, তুলা, তুলাধূনা ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় যে গ্রামের লোকদেরই বেশি তাহার ইঙ্গিত পাইতেছি বিজয়সেনের দেওপাড়া লিপিতে, চর্যাগীতিগুলিতে এবং সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থের দু-একটি শ্লোকে। শেষোক্ত গ্রন্থের একটি শ্লোকে কবি শুভাঙ্ক বলিতেছেন, নির্ধন শ্রোত্রিয়গণের ঝটিকাবাহিত কুটীর প্রাঙ্গণ কার্পাস বীজ দ্বারা আকীর্ণ থাকিত। সূতাকটা দরিদ্র ব্রাহ্মণ-গৃহস্থবাড়ির মেয়েদেরও দৈনন্দিন কর্ম ছিল; কাপড় বুনিতেন তন্তুবায়-কুবিন্দকেরা, যুঙ্গি বা যুগীরা। কিন্তু এই সব শিল্প ছাড়া কোনও কোনও গ্রামে দুই-একটি সমৃদ্ধতির শিল্পও প্রচলিত ছিল। শ্ৰীহট্ট জেলার ভাটেরা গ্রামে প্রাপ্ত গোবিন্দকেশবের লিপিতে দেখিতেছি, এক কাংসকার (বা কঁসারী) গোবিন্দ, এক নাবিক দ্যোজে এবং এক দন্তকার (হাতির দাতের শিল্পী) রাজবিগ নিজ নিজ গ্রামে বসিয়াই তাঁহাদের স্বীয় বৃত্তি অভ্যাস করিতেন • কাংসকার গোবিন্দ বেশ সম্পন্ন গৃহস্থ ছিলেন বলিয়া মনে হয়; তাহার বাড়িতে পাঁচখানা ঘর ছিল। নাবিক দ্যোজেরও ছিল দুইখানা ঘর। অথচ অন্যান্য সকলেরই প্রায় দেখিতেছি এক একখানা ঘর। দুই চারিজন ছোটখাট ব্যবসায়ী যে গ্রামে বাস করিতেন না তাহা নয়; পাল-সম্রাট মহারাজাধিরাজ মহীপালের রাজত্বের তৃতীয়-চতুর্থ বৎসরে যে দুই বণিক যথাক্রমে একটি নারায়ণ ও একটি গণেশ মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, সেই দুইজনই ছিলেন ত্রিপুরা জেলার বিলকীন্দক গ্রামবাসী। ষষ্ঠ শতকের কোটালিপাড়ার দুইটি পট্টোলীতে উল্লিখিত ভূমিসীমা প্রসঙ্গে যে “নৌদণ্ডক”, “ঘাট” এবং “নাবাতাক্ষেণী”র উল্লেখ পাইতেছি তাহাতে মনে হয়, কোনও কোনও গ্রাম সমৃদ্ধ নৌবাণিজ্যের কেন্দ্রও ছিল।
গ্রামে কাহারা প্রধানত বাস করিতেন তাহাও অনুমান করা কঠিন নয়; লিপিগুলিতে তাহার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়, একেবারে পঞ্চম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত। তাহা ছাড়া, বৃহদ্ধর্ম ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণেও তাহার কিছু কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। গ্রামবাসী ছিলেন সাধারণত ব্ৰাহ্মণেরা, ভূমিবান মহামহত্তর, মহত্তর, কুটুম্বারা; ক্ষেত্ৰকরেরা, বারজীবীরা, ভূমিহীন কৃষি-শ্রমিকেরা; তন্তুবায়-কুবিন্দক, কর্মকার, কুম্ভকার, কংসকার, মালাকার, চিত্রকার, তৈলকার, সূত্ৰধার প্রভৃতি শিল্পীরা; তীেলিক, মোদক, তাম্বুলী, শৌণ্ডিক, ধীবর-জালিক প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা; গোপ, নাপিত, রাজক, আভীর, নট-নৰ্তক প্রভৃতি সমাজ-সেবকরা; বরুড় (বাউড়ী), চর্মকার, ঘট্টজীবী (পাটনী), ডোলবাহী (ডুলে, ডুলিয়া), ব্যাধ, হাড়ডি (হাড়ি), ডোম, জোলা, বাগাতীত (বাগদী?), বেদিয়া (বেদে), মাংসচ্ছেদ, চর্মকার, চণ্ডাল, কোল, ভীল্ল, শবর, পুলিন্দ, মেদ, পৌণ্ডক (পোদ ঃ) প্রভৃতি অন্ত্যজ ও আদিবাসী পর্যায়ের লোকেরা। শেষোক্ত পর্যায়ের লোকেরা সাধারণত বাস করিতেন গ্রামের এক প্রান্তে, আজও যেমন করিয়া থাকেন। ভাটেরা গ্রামের পূর্বোক্ত লিপিটিতে গ্রামবাসীদের মধ্যে পাইতেছি। কয়েকজন গোপ, অন্তত একজন রাজক এবং একজন নাপিতকে। কোনো কোনো গ্রামে সমৃদ্ধ শ্রেষ্ঠীরাও বাস করিতেন বলিয়া মনে হইতেছে, যেমন দক্ষিণরাঢ় দেশের ভূরিসৃষ্টি বা বর্তমান ভুরসুন্টু গ্রামে। এই গ্রামটি ব্ৰাহ্মণদের একটি বড় কেন্দ্ৰস্থল তো ছিলই, তাহা ছাড়া বহু সংখ্যক শ্রেষ্ঠীজনের আশ্রয়ও ছিল। শ্ৰীধরাচার্যের ন্যায়কন্দলী গ্রন্থে (৯৯১-৯২) আছে,
