কিন্তু দৃষ্টান্ত উল্লেখের আর প্রয়োজন নাই। উদ্ধৃত দৃষ্টান্ত হইতে দুইটি তথ্য পরিষ্কার। প্রথম, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাস্তু ও কৃষিক্ষেত্র বিস্তৃত হইয়াছে, সর্বপ্রকার ভূমির চাহিদা বাড়িয়াছে, বন-অরণ্যভূমি পরিষ্কার করিয়া নূতন গ্রামের পত্তন হইয়াছে, পতিত অথচ কর্ষণযোগ্য ভূমি কর্ষণাধীন করা হইয়াছে। দ্বিতীয়ত, বাস্তু ও ক্ষেত্রভূমি লইয়া প্রত্যেকটি গ্রাম পৃথক অথচ ঘনসন্নিবিষ্ট, দৃঢ়সংবদ্ধ অর্থাৎ গ্রামান্তর্গত গৃহস্থবাড়িগুলি এবং কৃষিক্ষেত্রখণ্ডগুলি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত নয়। তাহা না হইবার কারণও আছে। যে ভূমি-নির্ভর সমাজের জীবিকা প্রধানত শুধু পশুপালন এবং পশুচারণ, সেখানে চারণভূমি যেমন দেখা যায় দূরে দূরে বিক্ষিপ্ত তেমনই বাস্তুও থাকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন। কিন্তু একান্তভাবে কৃষিনির্ভর গ্রামে তাহা হইতে পারে না, বরং প্রবণতা দেখা যায় ঠিক তাহার বিপরীত দিকে। তাহা ছাড়া, কৃষিজীবী সমাজে নূতন গ্রামের যখন পত্তন হয়, তখন প্রথমেই বৃহৎ বসতি ও ক্ষেত্রভূমির বিস্তার দেখা যায় না। কয়েকটি গৃহস্থ বাড়ি ও তাহাদের প্রয়োজন মতো ক্ষেত্রভূমি লইয়া গ্রামের পত্তন হয়; তাহার পর গ্রামের লোকবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেই কয়েকটি বাড়ি ও ক্ষেত্রভূমিকে কেন্দ্ৰ করিয়া দুয়েরই ক্রমবিস্তার ঘটিতে থাকে। লিপিসংবদ্ধ সংবাদ একটু সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করিলে প্রাচীন বাঙলার গ্রামগুলির এই গঠন-প্রকৃতি ধরিতে পারা কঠিন নয়। তাহা ছাড়া, গ্রামগুলি ঘনসন্নিবিষ্ট ও দৃঢ়সংবদ্ধ হইবার অন্য কারণও আছে। ভয়-ভীতি, নানাপ্রকারের বিপদ-উৎপাত প্রভৃতি হইতে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেও গ্রামবাসীরা ঘনসন্নিবিষ্ট হইয়া বাস করিত এবং সাধারণত এক এক বৃত্তি আশ্রয় করিয়া সমশ্রেণীর লোকেদের লইয়া এক-একটি পাড়া গড়িয়া উঠিত। এই ধরনের পাড়া ও গ্রামের গঠন প্রাচীন কৌমসমাজেরই দান।
প্রাচীন লিপিমালায় অসংখ্য গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে। সব গ্রামের আয়তন ও লোকসংখ্যা সমান ছিল না, ইহা তো সহজেই অনুমেয়; প্রকৃতিও একপ্রকার ছিল না, এরূপ অনুমানেও বাধা নাই। ছোট ছোট গ্রাম বা গ্রামাংশের নাম ছিল পাটক (বা পাড়া)। বৈগ্রাম পট্টোলীতে তো স্পষ্টই দেখিতেছি, বায়িগ্রামের অন্তত দুইটি ভাগ ছিল, ত্রিবৃতা ও শ্ৰীগোহলী, যদিও ইহাদের পাটক বলা হইতেছে না। কিন্তু ষষ্ঠ শতকের ৫ নং দামোদরপুর পট্টোলীতে পরিষ্কার স্বচ্ছন্দ পাটক এবং পুরাণ-বৃন্দিকহরি অন্তর্গত। আর-একটি পাটকের উল্লেখ দেখিতেছি। মল্লসরুল লিপিতে বাটক নামে একটি জনপদ বিভাগের নাম পাওয়া যাইতেছে, যেমন নিৰ্ব্বত-বািটক, কপিস্থ-বািটক, শাল্মলী-বািটক, মধু-বাটক ইত্যাদি। এই বাটক ও পাটক সমার্থক, এবং একই শব্দ বলিয়া মনে হইতেছে। এই লিপিরই খণ্ডজ্যোটিকা বোধ হয় কোনও জোটিকা বা খাড়ীকা-তীরবর্তী গ্ৰাম। যাহা হউক, এই সময় হইতে আরম্ভ করিয়া আদিপর্বের শেষ পর্যন্ত এই পাটক বিভাগ বিদ্যমান। যে-সব গ্রামের অবস্থিতি প্রশস্ত জল ও স্থলপথের উপর, বাস্তুক্ষেত্র ও কৃষিক্ষেত্র যেখানে সুলভ ও সুপ্রচুর, যে-সব গ্রামে শিল্প-বাণিজ্যের সুযোগ ও প্রচলন বেশি কিংবা যে-সব গ্রামে শাসনকার্য পরিচালনার কোনও কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত থাকিত, শিক্ষা, সংস্কৃতি বা ধর্মকর্মের কেন্দ্ৰ বলিয়া পরিগণিত হইত, সেই সব গ্রাম সদ্যোক্ত এক বা একাধিক কারণে আয়তনে, লোকসংখ্যায় এবং মর্যাদায় অন্যান্য গ্রামাপেক্ষা অধিকতর গুরুত্বলাভ করিত, সন্দেহ নাই। এই রকম দুই-চারিটি বৃহৎ এবং মর্যাদাসম্পন্ন গ্রামের খবর লিপিমালা ও সমসাময়িক সাহিত্যে পাওয়া যায়; পরে তাহাদের কথা বলিতেছি। আকৃতি ও প্রকৃতির এই পার্থক্য সত্ত্বেও প্রত্যেক গ্রামই কতকগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে একপ্রকার; যেমন, প্রত্যেক গ্রামই কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিভক্ত। বাস্তুভূমি ও ক্ষেত্রভূমি দুই প্রধান অঙ্গ; ইহা ছাড়া প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই উষরভূমি, মালভূমি, গর্তভূমি, তলভূমি, গোচরীভূমি, বাটক-বাট, গোপথ-গোবাট-গোমার্গভূমি ইত্যাদির উল্লেখ পাইতেছি, একেবারে পঞ্চম হইতে আরম্ভ করিয়া ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত। তাহা ছাড়া, খাল, বিল, খাটিকা, খাটা, পুষ্করিণী, নদী, নদীর খাত, গঙ্গিনিকা ইত্যাদির উল্লেখ তো আছেই। গোচর বা গোচারণভূমি সর্বদাই গ্রামের ক্ষেত্রভূমির প্রান্তসীমানায় অথবা একেবারে এক পাশে এবং সেইখান হইতে গ্রামের সীমা ঘেষিয়া গ্রামের ভিতর পর্যন্ত গোবাট-গোমার্গ-গোপথ। কোনও কোনও গ্রামে হট্ট, হট্টীয় গৃহ, আপণ ইত্যাদির উল্লেখ পাইতেছি; নানা দেবতার মন্দির, দেবকুল, জৈন ও বৌদ্ধ বিহার ইত্যাদির উল্লেখও আছে। সব গ্রামে হাট, বাজার, মন্দির ইত্যাদি থাকিত না; লিপিতেও তেমন উল্লেখ নাই; যে-সব গ্রামে ছিল সে-সব ক্ষেত্রেই উল্লেখ পাইতেছি মাত্র। কোনও কোনও গ্রামে বনজঙ্গল, ঝাড়, বড় বড় গাছ ইত্যাদিও ছিল (সবন, সব্বােটবিটপ ইত্যাদি); লিপিতে তাহাও উল্লিখিত হইয়াছে। এই সব বনজঙ্গল হইতে লোক জ্বালানি কাঠ, ঘর-বাড়ি প্রস্তুত করিবার জন্য বাঁশ, খুঁটি ইত্যাদি সংগ্ৰহ করিত। বিক্ৰীত ও দত্তভূমির শ্রেণীবিভাগের যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ লিপিগুলিতে পাওয়া যায় তাহাতে এ-তথ্য সুস্পষ্ট যে, পঞ্চম শতকের আগেই বাঙলার গ্রাম কৃষিনির্ভর সমাজ সুশৃঙ্খল সুবিন্যস্ত ভাবে সমস্ত অধিগম্য ও প্রয়োজনীয় ভূমিকে সামাজিক স্বার্থসাধনের বিষয়ীভূত করিয়াছিল।
