এই সব কারণেই প্রাচীন বাঙলার সমাজ-বিন্যাসের পূর্ণতর পরিচয় পাইতে হইলে গ্রাম ও নগর-বিন্যাস সম্বন্ধে যতদূর সম্ভব সমস্ত তথ্যই জানা প্রয়োজন। দুঃখের বিষয়, অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতন এ-বিষয়েও যথেষ্ট তথ্য-সাক্ষ্য আমাদের সম্মুখে উপস্থিত নাই। যাহা আছে তাহার মধ্যে লিপিগুলিই প্রধান এবং প্রামাণিক; কিছু কিছু সাক্ষ্য প্রমাণ সমসাময়িক সাহিত্যগ্রন্থাদি হইতেও পাওয়া যায়। তাহা ছাড়া, ধনসম্বল অধ্যায়ে ও সমাজ-বিন্যাস খণ্ডের বিভিন্ন অধ্যায়ে যে-সব তথ্যের আলোচনা করা হইয়াছে তাহা হইতে যুক্তিসিদ্ধ কিছু কিছু অনুমানও করা চলে। গ্রাম ও নগর সম্বন্ধে অনেক কথাই প্রসঙ্গক্রমে এই সব অধ্যায়ে বলা হইয়াছে; এই অধ্যায়ে সে-সবের পুনরাবৃত্তি না করিয়া মোটামুটি ভাবে গ্রাম ও নগরের সংস্থান, কিছু কিছু গ্রাম-নগরের বিবরণ, গ্রাম ও নগরের সম্বন্ধ, গ্ৰাম্য ও নগর সভ্যতা ও সংস্কৃতির পার্থক্য ইত্যাদি সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাইতে পারে।(১)
—————-
(১) এই অধ্যায়ে বাঙলার লিপি-সাক্ষ্যের এবং ইতিপূর্বে উল্লিখিত অন্যান্য সংক্ষ্যেরও পাঠনিৰ্দেশ দেওয়া হইতেছে না।
০২. গ্রাম ও গ্রামের সংস্থান
বাঙলার লিপিগুলিতে রাজসরকার হইতে বিক্ৰীত বা দত্ত ভূমিগুলির বিবরণ ও তৎসংলগ্ন গ্রামগুলির বিবরণ যে-ভাবে পাইতেছি তাহা হইতে বাঙলার গ্রামের সংস্থান ও সংগঠন সম্বন্ধে কতকগুলি সুস্পষ্ট ধারণা করিতে পারা যায়। মহাস্থান লিপি (খৃষ্টপূর্ব তৃতীয়-দ্বিতীয় শতক, আনুমানিক) এবং চন্দ্ৰবৰ্মার শুশুনিয়া লিপির (খ্ৰীষ্টাত্তর চতুর্থ শতক) কথা ছাড়িয়া দিয়া পঞ্চম শতক হইতেই আলোচনা আরম্ভ করা যাইতে পারে। এই শতকের সাত-আটখানা লিপির প্রত্যেকটিতেই দেখিতেছি, বাস্তুভূমির চেয়ে খিলভূমির চাহিদা অনেক বেশি, এবং খিলভূমি যে চাষের জন্যই দান-বিক্রয় হইতেছে। এ-সম্বন্ধেও সন্দেহ নাই; পরবর্তী লিপিগুলিরও সাক্ষ্যও তাহাই।। বস্তুত, আদিপর্বের শেষ পর্যন্ত সমস্ত সাক্ষ্যেই দেখিতেছি, কৃষিযোগ্য এবং কৃষিভূমির উপরই গ্রাম্য সমাজের নির্ভর এবং তাহার চাহিদাই উত্তরোত্তর বাড়িয়া চলিয়াছে। এমন-কি। খ্ৰীষ্টপূর্ব তৃতীয়-দ্বিতীয় শতকের মহাস্থান-লিপিতে যে-ধান্যকে দেখিতেছি লোকের প্রাণধারণের প্রধান উপায় সেই ধান্যও তো স্থানীয় অর্থাৎ এই দেশেরই কৃষিক্ষেত্ৰলব্ধ সম্পদ বলিয়া মনে না। করিবার কোনও কারণ নাই। লিপিগুলির বিশ্লেষণে স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে, এই সব খণ্ড খণ্ড কৃষিক্ষেত্র সমস্তই একে অন্যের সঙ্গে সংলগ্ন, এক খিলক্ষেত্রের সীমা আর-এক ক্ষেত্রের সীমার একেবারে গাত্রলগ্ন; বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রভূমি প্রায় নাই বললেই চলে। অনেক দৃষ্টান্ত এমনও আহরণ করা যায়, যেখানে একই ব্যক্তি যো-পরিমাণ ক্ষেত্রভূমি চাহিতেছেন তাহা এক গ্রামে পাওয়া যাইতেছে না, বিভিন্ন গ্রাম হইতে সংগ্ৰহ করিতে হইতেছে। আবার নূতন গ্রামের পত্তন যেখানে হইতেছে। সেখানে সমস্ত বাস্তু ও ক্ষেত্রভূমি একত্র নেওয়া হইতেছে, বিচ্ছিন্নভাবে নয়।
কয়েকটি দৃষ্টান্ত আহরণ করা যাইতে পারে। পঞ্চম শতকের পাহাড়পুর পট্টোলীতে দেখিতেছি, এক ব্রাহ্মণদম্পতি ১ কুল্যবাপ ২ ১/২ (আড়াই), দ্রোণবাপ ক্ষেত্ৰভূমি ক্রয় করিতেছেন তিনটি বিভিন্ন গ্রাম হইতে। এই শতকেই বৈগ্রাম লিপিতে দেখা যাইতেছে, ভোয়িল নামে জনৈক গৃহস্থ বায়িগ্রামের ত্ৰিবৃত নামক পাড়ায় (?); ৩ কুল্যবাপ খিলক্ষেত্র এবং এক দ্রোণবাপ বাস্তুভূমি কিনিয়াছিলেন শ্ৰীগোহালী পাড়ায় (?); ভোয়িলের সহোদর ভ্রাতা ভাস্করও একই সঙ্গে কিছু বাস্তুভূমি কিনিয়াছিলেন শেষোক্ত গ্রামে। স্পষ্টতই বোঝা যাইতেছে শ্রীগোহালীতে খিলভূমি সহজলভ্য আর ছিল না। ত্ৰিবৃত-পাড়ায় যে ভূমিখণ্ড কিনিয়াছিলেন তাহার সম্বন্ধে স্পষ্ট বলা হইয়াছে যে, ঐ ভূমি হইতে রাজার কোনও আয় এ-যাবৎ হইতেছিল না, অর্থাৎ ভূমিখণ্ডটি পতিত পড়িয়াছিল। ষষ্ঠ শতকের গুণাইঘর পট্টোলীতে একসঙ্গে অনেকগুলি খবর পাওয়া যাইতেছে। মহারাজ রুদ্রদত্তের অনুরোধে শ্ৰীমহারাজ বৈন্যগুপ্ত উত্তরমণ্ডলের অন্তর্গত কন্তেড়দক গ্রামে মহাযানিক অবৈবর্তিক ভিক্ষুসংঘকে পাচটি পৃথক ভূখণ্ডে ১১ পাটক কর্ষণযোগ্য অথচ অকৃষ্ট ভূমিদান করিয়াছিলেন। প্রথম ভূখণ্ডের সীমার পূর্বদিকে গুণিকাগ্রহার গ্রাম এবং বিষ্ণুবৰ্ধকর (?) ক্ষেত্র, দক্ষিণে মৃদুবিলাল (?) নামক জনৈক গৃহস্থের ক্ষেত্র এবং রাজবিহারের ক্ষেত্র, পশ্চিমে সূরীনশীর-পূৰ্গকের ক্ষেত্র; উত্তরে দোষীভোগ পুষ্করিণী— এবং বম্পিয়ক ও আদিত্যবন্ধুর ক্ষেত্ৰসীমা। দ্বিতীয় ভূখণ্ডের সীমায় পূর্বদিকে গুণিকাগ্রহার গ্রাম, দক্ষিণে পঙ্কবিললের ক্ষেত্র, পশ্চিমে রাজবিহার, উত্তরে বৈদ্যনাম গৃহস্থের ক্ষেত্র। তৃতীয় ভূখণ্ডের সীমায় পূর্বদিকে জনৈক গৃহস্থের ক্ষেত্রভূমি, দক্ষিণে আর একজন গৃহস্থের ক্ষেত্ৰসীমা,; পশ্চিমে জোলারির ক্ষেত্ৰসীমা; উত্তরে নগিজোদকের ক্ষেত্ৰসীমা। চতুর্থ ভূমিখণ্ডের সীমায়, পূর্বে বুদুকের ক্ষেত্ৰসীমা, দক্ষিণে কলকের ক্ষেত্ৰসীমা; পশ্চিমে সূর্যের ক্ষেত্ৰসীমা, উত্তরে মহীপালের ক্ষেত্ৰসীমা। পঞ্চম ভূমিখণ্ডের পূর্বসীমায় খন্দবিন্দুগগুরিকের ক্ষেত্র, দক্ষিণে মণিভদ্রের ক্ষেত্র, পশ্চিমে যজ্ঞরাতের ক্ষেত্র, উত্তরে নাদভদক গ্রাম। সপ্তম শতকে জয়নাগের বপ্যঘোষবাট পট্টোলী দ্বারা বপ্যঘোষবাট গ্রামখানা ব্ৰাহ্মণ ভট্ট বীরস্বামীকে দান করা হইয়াছিল। এই গ্রামের পশ্চিম সীমায় কুকুট গ্রামের ব্ৰাহ্মণদিগকে প্রদত্ত ক্ষেত্ৰভূমির সীমা; উত্তরে নদীর খাত; পূর্বে একই নদীর খাত্ এবং এই খাত হইতে আরম্ভ করিয়া আমলপস্তিক গ্রামের পশ্চিম সীমা স্পর্শ করিয়া যে সর্ষপযানিক একেবারে চলিয়া গিয়াছে ভট্ট উন্মীলনস্বামীর ক্ষেত্ৰভূমি পর্যন্ত; সেইখান হইতে আরম্ভ করিয়া দক্ষিণে সোজা ভরাণিস্বামীর ক্ষেত্র পর্যন্ত এবং সেখান হইতে সোজা লম্ববান হইয়া ভট্ট উন্মীলনস্বামীর ক্ষেত্ৰসীমায় অবস্থিত বখটস্মালিকার পুষ্করিণী ভেদ করিয়া কুকুট গ্রামের ব্ৰাহ্মণদিগকে প্রদত্ত ভূমিসীমা পর্যন্ত বিলম্বিত। এই শতকেরই ত্রিপুরার লোকনাথ পট্টোলীতে দেখিতেছি, জনৈক ব্ৰাহ্মণ মহাসামন্ত প্রদোষশৰ্মা দুই শতাধিক ব্ৰাহ্মণের বসবাসের জন্য সুব্ববুঙ্গ বিষয়ের অরণ্যময় প্রদেশে বাস্তু ও ক্ষেত্রভূমি রাজার নিকট হইতে দানস্বরূপ গ্রহণ করিতেছেন। এক্ষেত্রে স্পষ্টতই বনভূমি পরিষ্কার করিয়া নূতন গ্রামের পত্তন হইতেছে, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ থাকিতে পারে না। অষ্টম হইতে ত্ৰয়োদশ শতকের শেষাশেষি পর্যন্ত লিপি প্রমাণ অপর্যাপ্ত এবং সমগ্র বাঙলাদেশ জুড়িয়া, শ্ৰীহট্ট হইতে মেদিনীপুর, এবং বরেন্দ্ৰ হইতে খাড়ীমণ্ডল এই সব লিপির ব্যাপ্তি। যে সব ক্ষেত্রভূমি, বাস্তুভূমি এবং গ্রামের বর্ণনা এই লিপিগুলিতে পাওয়া যায় তাহাতে দেখা যাইতেছে, ক্ষেত্রভূমি ক্ষেত্রভূমির সঙ্গে, এবং বাস্তুভূমি বাস্তুভূমির সঙ্গে একেবারে সংলগ্ন, এবং কোথাও কোথাও গ্রামও গ্রামের সংলগ্ন।
