সদ্যোক্ত মন্তব্য ঐতিহাসিক অনুমান সন্দেহ নাই, তবু আমার যুক্তিটি যদি ঐতিহাসিক মর্যাদার বিরোধী না হয় এবং ধনসম্বল অধ্যায়ে সামাজিক ধনের বিবর্তনের ইঙ্গিত, মুদ্রার ইঙ্গিত আমি যে-ভাবে নির্দেশ করিয়াছি, ভূমি-বিন্যাস অধ্যায়ে আমি যাহা বলিয়াছি তাহা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে এই অনুমানও ঐতিহাসিক সত্যের দাবি রাখে, সবিনয়ে আমি এই নিবেদন করি। তবে, এই অনুমানের সপক্ষে সমসাময়িক যুগের (দ্বাদশ শতক) একটি কবির একটি শ্লোক আমি উদ্ধার করিতে পারি। এই শ্লোক ঐতিহাসিক দলিলের মূল্য ও মর্যাদা দাবি করে না। সত্য কিন্তু আমার ধারণা, এই শ্লোকটিতে উপরোক্ত সামাজিক বিবর্তনের অর্থাৎ বণিক-ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অবনতি এবং কৃষক-ক্ষেত্রকর সম্প্রদায়ের উন্নতির ইঙ্গিত অত্যন্ত সুস্পষ্ট। গোবর্ধন আচার্য ছিলেন লক্ষ্মণসেনের অন্যতম সভাকবি; তাহারই রচনা এই পদটি। প্রাচীনকালে শ্রেষ্ঠীরা শক্ৰধ্বজোত্থান পূজা (ইন্দ্রের ধ্বজার পূজা) উৎসব করিতেন; দ্বাদশ শতকেও উৎসবটি হাইত কিন্তু তখন শ্রেষ্ঠীরা আর ছিলেন না।
তে শ্রেষ্ঠানঃ রূ সম্প্রতি শক্ৰধ্বজ যৈঃ কৃতস্তবোচ্ছায়াঃ।
ঈষাং বা মেঢ়িং বাধূনাতনাস্ত্ৰাং বিধিৎসন্তি ৷।
হে শক্ৰধ্বজ! যে শ্রেষ্ঠীরা (একদিন) তোমাকে উন্নত করিয়া গিয়াছিলেন, সম্প্রতি সেই শ্রেষ্ঠীরা কোথায়! ইদানীংকালে লোকেরা তোমাকে (লাঙ্গলের) ঈষ অথবা মেঢ়ি (গরু বাধিবার গোজ) করিতে চাহিতেছে।
এই একটি শ্লোকে ব্যাবসা-বাণিজ্যের অবনতিতে এবং একান্ত কৃষিনির্ভরতায় বাঙালী সমাজের আক্ষেপ গোবর্ধন আচার্যের কণ্ঠে যেন বাণীমূর্তি লাভ করিয়াছে। একটু প্রচ্ছন্ন শ্লেষও কি নাই!
০৫. সার সংক্ষেপ – শ্রেণী-বিন্যাস০৫. সার সংক্ষেপ – শ্রেণী-বিন্যাস
প্রমাণ ও যুক্তিসিদ্ধ অনুমানের সাহায্যে আমরা যাহা পাইলাম তাহার সারমর্ম এখন এইভাবে আমরা প্রকাশ করিতে পারি। সুপ্রাচীন বাঙলার শ্রেণী-বিন্যাস সম্বন্ধে পঞ্চম শতকের আগে উপাদানের অভাবে কিছু বলা কঠিন। তবে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্ৰ, জাতকের গল্প, মিলিন্দপঞহ, পেরিপ্লাস-গ্রন্থ, টলেমির বিবরণ, কথাসরিৎসাগরের গল্প, বাৎস্যায়নের কামসূত্র, মহাভারতের গল্প, গ্ৰীক ঐতিহাসিকদের বিবরণ, এবং সমসাময়িক সাহিত্যে প্রাচীন বাঙলার শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্যের সমৃদ্ধির যে পরিচয় পাওয়া যায় তাহাতে মনে হয়, শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ীদের একাধিক সুসমৃদ্ধ সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক শ্রেণী দেশে বিদ্যমান ছিল, এবং রাষ্ট্রে ও সমাজে তাহাদের প্রভাব এবং আধিপত্যও ছিল যথেষ্ট। ধনোৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থায় এই শ্রেণীগুলির প্রভুত্ব সহজেই অনুমেয়। বাৎস্যায়নের কামসূত্রে গৌড়, বঙ্গ, পুণ্ডে যে নাগর-সভ্যতার পরিচয় পাওয়া যায় তাহা যে সদাগরী ধনতন্ত্রেরই সৃষ্টি এ-সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশের কোনও কারণ দেখি না। ধর্ম ও অধ্যাপনাজীবী একটি শ্রেণীর আভাসও পাওয়া যায়, এবং এই শ্রেণী জৈন এবং বৌদ্ধ যতি ও ব্রাহ্মণদের লইয়া গঠিত। অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের ব্ৰাহ্মণদিগকে অর্জন অনেক ধনরত্ন উপহার দিয়াছিলেন, এ-তথ্য মহাভারতেই উল্লিখিত আছে (১৷৷২১৬)। বাৎস্যায়নও গৌড়-বঙ্গের ব্রাহ্মণদের কথা বলিতেছেন (৬।৩৮,৪১); সদাগরী ধনতন্ত্রপুষ্ট নাগর-সভ্যতা তাহাদেরও স্পর্শ করিয়াছিল। বাঙলায় স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র তখন ছিল না। কিন্তু কৌম সমাজযন্ত্রের কথা ছাড়িয়া দিলেও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের রাষ্ট্রযন্ত্র তো একটা ছিলই; মহাস্থানশিলাখণ্ড-লিপিই তাহার প্রমাণ। সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে কেন্দ্ৰ করিয়া যত ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণই হউক, রাজপদোপজীবীদের একটি শ্রেণীও গড়িয়া উঠিয়াছিল, এই অনুমান অসঙ্গত নয়। ইহাদেরই অভিজাত প্রতিনিধি হইতেছেন গলদন— বাঙলায় মৌর্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধি অর্থাৎ মহামাত্র। সর্বনিম্ন শ্রেণী:স্তরের একটু আভাসও পাওয়া যাইতেছে। বাৎস্যায়নের কামসূত্রে; এই স্তরে ছিল ক্ৰীতদাসেরা। বাৎস্যায়ন এই ক্রীতদাসদের কথা বলিয়াছেন। (৬৩৮)। পৃথিবীর সর্বত্রই সদাগরী ধনতন্ত্রের সঙ্গে ক্রীতদাস প্রথা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত; বাঙলাদেশেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। হিন্দু আমলের শেষ পর্যন্ত এই প্রথা বাঙলাদেশে প্রচলিত ছিল, জীমূতবাহন তাহার দায়ভাগ গ্রন্থে সেই সাক্ষ্য দিতেছেন। বাঙলায় দাস ক্রয়-বিক্রয়ের প্রথা অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকেও প্রচলিত ছিল, তাহার প্রমাণস্বরূপ পট্ৰিকৃত দলিলপত্র আজও বাঙলার সর্বত্র পাওয়া যায়। ক্রমপ্রসারমান আর্য-ব্রাহ্মণ্য-বৌদ্ধ সমাজ ও সংস্কৃতির প্রান্তসীমায় যে-সমস্ত আদিবাসী কোম স্থান পাইতেছিলেন তাহারাও অর্থনৈতিক শ্রেণীসমূহের নিম্নস্তরেই নিবদ্ধ হইতেছিলেন, এ-অনুমানও খুব অসঙ্গত নয়।
পঞ্চম-সপ্তম শতক পর্ব
পঞ্চম শতকের গোড়া হইতে প্রায় অষ্টম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত শ্রেণীবিন্যাসগত সামাজিক চেহারাটা সুস্পষ্ট ধরিতে পারা অনেক সহজ। এই পর্বে বাঙালী সমাজ প্রধানত শিল্প ও ব্যাবসা-বাণিজ্য নির্ভর; অর্থনৈতিক শ্রেণী হিসাবে শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ীর উল্লেখ না থাকিলেও সমাজে ও রাষ্ট্রে তীহাদের প্রাধান্য পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে। কৃষক, ক্ষেত্রকর, কৃষিকর্ম, সবই সমাজে রহিয়াছে, কৃষিকর্মের বলে সমাজে ধনোৎপাদনও হইতেছে, কিন্তু যেহেতু সমাজ প্রথমত ও প্রধানত শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্য নির্ভর, এবং ভূমি সম্পদ ও কৃষিকৰ্ম সামাজিক ধনের স্বল্প অংশ মাত্র, সেই হেতু কৃষকরা তখনও সুসমৃদ্ধ-সুসম্বন্ধ শ্রেণী হিসাবে গড়িয়া উঠিবার অবকাশ পান নাই, এবং সেইভাবে রাষ্ট্রে ও সমাজে স্বীকৃতিলাভও করিতে পারেন নাই। কিন্তু ষষ্ঠ শতকেই সামন্ত প্রথা স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠালাভ করিতেছে, ভূমির চাহিদা বাড়িতে আরম্ভ করিয়াছে; বুঝা যাইতেছে, সমাজ ভূমিসম্পদকেই যেন প্রধান সম্পদ বলিয়া মানিয়া লইবার দিকে অগ্রসর হইতেছে। সপ্তম শতকের শেষার্ধ ও অষ্টম শতকের প্রথমার্ধপ্রায় জুড়িয়া রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আবর্ত এবং পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্যধর্মের দ্রুত অগ্রগতির স্রোতে এই বিবর্তন যেন সম্পূর্ণ হইল; শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্য যেন ধনোৎপাদনের প্রথম ও প্রধান উপায় আর রহিল না। ইহার কারণ একাধিক; ভুমি-বিন্যাস, বর্ণবিন্যাস, ধনসম্বল, রাজবৃত্ত প্রভৃতি অধ্যায়ে নানা প্রসঙ্গে আমি এই সব কারণের উল্লেখ করিয়াছি; এখানে পুনরুল্লেখ করিয়া লাভ নাই। যাহা হউক, এই পর্বে অভিজাত ও অনভিজাত রাজপুরুষ, সংব্যবহারী ও রাজসেবকদের দেখা পাইতেছি; কিন্তু স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র দেশে তখনও গড়িয়া উঠে নাই বলিয়া রাজকর্মচারী বা রাজসেবকদের সুনির্দিষ্ট শ্ৰেণী তখনও গড়িয়া উঠে নাই; তাহার সূচনামাত্র দেখা যাইতেছে। জৈন, বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির ধারক ও নিয়ামক বুদ্ধি-বিদ্যা-জ্ঞান-ধৰ্মজীবী শ্রেণীর পরিচয় এই যুগে সুস্পষ্ট। তাহাদের মর্যাদা ও সম্মাননা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হইয়া গিয়াছে, এবং তাহারা যে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিপাল্য সেই দাবিও স্বীকৃত হইয়াছে। নিম্নতর শ্রেণী:স্তরের লোকেরা তো নিশ্চয়ই ছিলেন; কিন্তু তাহারা সমাজের প্রধান শ্রেণীগুলির বাহিরে। অর্থনৈতিক শ্রেণী হিসাবে তাহারা গড়িয়া উঠেন নাই, সেই হিসাবে তাহাদের কোনো মূল্য স্বীকৃতও হয় নাই; উল্লেখও সেই হেতু নাই।
