অষ্টম হইতে ত্ৰয়োদশ শতক পর্ব
অষ্টম হইতে ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত অর্থাৎ আদিপর্বের শেষ পর্যন্ত বাঙালী সমাজ প্রধানত ও প্রথমত কৃষিনির্ভর। সামন্ত প্রথা সুপ্রতিষ্ঠিত, ভূমিই সমাজের প্রধান সম্পদ এবং সেই ভূমির অধিকারের বিচিত্র ক্রমসংকুচীয়মান স্তর লইয়াই এই যুগের সমাজ। ইহার একপ্রান্তে জনপদজোড়া ভূমির অধিকার লইয়া দোর্দণ্ডপ্রতাপে দণ্ডায়মান মুষ্টিমেয় মহামাণ্ডলিকমহাসামন্তরা; অন্যদিকে লেশমাত্র ভূমিবিহীন অসংখ্য প্রজার দল; মধ্যস্থলে ভূমিস্বত্বাধিকারের নানা স্তর। এই বিচিত্র স্তরই প্রধানত শ্রেণীনির্দেশের দ্যোতক। ইহাই এই যুগের প্রথম ও প্রধান সামাজিক বৈশিষ্ট্য। যেহেতু সমাজ প্রধানত ভূমিনির্ভর সেই হেতু এই পর্বে কৃষক-ক্ষেত্রকর শ্রেণীও সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট সীমারেখা লইয়া চোখের সম্মুখে ফুটিয়া উঠিয়াছে। একই কারণে গ্রাম্য সমাজে ভূমিসম্পদসমৃদ্ধ একটি ভূম্যধিকারী, এবং আর একটি কৃষিসম্পদসমৃদ্ধ গ্রাম্য কুটুম্ব, গৃহস্থ, ভদ্র শ্রেণীও গড়িয়া উঠিয়াছে। ইহাদের ঠিক পৃথক একটি। শ্রেণী বলা হয়তো উচিত নয়, বরং একই শ্রেণীর বিভিন্ন স্তর বলিলেই যথাৰ্থ বলা হয়। শিল্পী, বণিক এবং ব্যবসায়ীরাও সমাজে আছেন; শিল্পকর্ম, ব্যাবসা-বাণিজ্যও চলিতেছে। কিন্তু ভূমিনির্ভর, কৃষিনির্ভর সমাজে শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্য ধনোৎপাদনের অন্যতম উপায় মাত্র, প্রধান উপায় আর নহে। সেইজন্য শ্রেণী হিসাবে এই শ্রেণীদের অস্তিত্বের খবর নাই, রাষ্ট্রে এবং সমাজে তাহাদের প্রাধান্যও আর নাই। স্বতন্ত্র স্বাধীন স্বসীমাবদ্ধ রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিবার ফলে রাজপাদোপজীবী বলিয়া একটি বিশেষ সুস্পষ্ট শ্রেণী এই পর্বে গড়িয়া উঠিয়াছে। ইহাদের মধ্যেও আবার বিভিন্ন স্তর; একপ্রান্তে উপরিক, রাজস্থানীয়, মহাসেনাপতি, মহাধৰ্মাধ্যক্ষ, মহামন্ত্রী ইত্যাদি; অন্যপ্রান্তে তরিক, শৌন্ধিক, গৌলিক, চাটভাট, ক্ষুদ্র করণ, বেতনভুক সৈন্য, প্রহরী ইত্যাদি। যাহাই হউক, রাজপদোপজীবী শ্রেণীরই আনুষঙ্গিক ছায়ারূপে রাষ্ট্ৰসেবক শ্রেণীর আভাসও সুস্পষ্ট। ইহাদের মধ্যে ভূমিসম্পদ-নির্ভর শ্রেণী:স্তর সমূহের লোকেদের দর্শনও মিলিতেছে। বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান-ধৰ্মজীবী শ্রেণীও সুস্পষ্ট; এই শ্রেণীতেও বিভিন্ন স্তর। একপ্রান্তে তিন্তিড়িপত্র ও শাকান্নভুক বিনয়নম্র ব্রাহ্মণ পুরোহিত বা পণ্ডিত; অন্যপ্রান্তে প্রভূত অর্থসমৃদ্ধ রাজপণ্ডিত বা পুরোহিত, পেঁৗরোহিত্য ও অধ্যাপনার ছদ্মবেশে সমৃদ্ধ ভূম্যধিকারী। ভূমিহীন সমাজ শ্রমিকশ্রেণীও সুস্পষ্ট; ইহারা অধিকাংশ অস্ত্যজ বা স্লেচ্ছ বর্ণবদ্ধ, স্বল্পসংখ্যক মধ্যম-সংকর বা অসৎশুদ্র পর্যায়ের নিম্নস্তরে। পালপর্বে চণ্ডাল পর্যন্ত সমাজের নিম্নতম শ্রমিক শ্রেণী:স্তর সমাজদৃষ্টির সম্মুখে উপস্থিত; কিন্তু সেন-আমলে ব্রাহ্মণ্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির অত্যুচ্চারণের ফলে, সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দৃষ্টির আচ্ছন্নতার ফলে তাহাদিগকে সমাজদৃষ্টির বাহিরে রাখিয়া দেওয়া হইয়াছে। বৌদ্ধ মহাযান-বজ্ৰযান। —মন্ত্রযান-সহজযানে ডোম-ডোন্ধী, শবর-শবরীদেরও স্বীকৃতি ছিল; চর্যাগীতিই তাহার প্রমাণ। ব্রাহ্মণ্য সংস্কার ও সংস্কৃতিতে তাহা ছিল না, কাজেই সেন-আমলে সমাজ-শ্রমিক শ্রেণীর এই অবজ্ঞা কিছু অস্বাভাবিক নয়।
০৬. শ্রেণী ও রাষ্ট্র
বর্ণ ও শ্রেণীর পারস্পরিক সম্বন্ধের কথা বর্ণ-বিন্যাস অধ্যায়ে এবং বর্তমান অধ্যায়ে কতকটা সবিস্তারেই বলা হইয়াছে। রাষ্ট্র ও শ্রেণীর পরস্পর সম্বন্ধের ইঙ্গিতও এই অধ্যায়ের ইতস্তত ইতিপূর্বেই প্রসঙ্গক্রমে দেওয়া হইয়াছে। এইখানে সে সব ইঙ্গিত সংক্ষেপে একটু ফুটাইয়া তোলা যাইতে পারে। পঞ্চম শতকের আগে এ-সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছু বলিবার উপায় নাই। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে দেখা যাইতেছে একটি শ্রেণী বরাবর রাষ্ট্রের আনুকূল্য লাভ করিতেছে; রাষ্ট্রযন্ত্রে এই শ্রেণীর প্রভাব অক্ষুঃ— ইহারা শিল্পী, শ্রেষ্ঠী, সার্থিবাহ, ব্যাপারী ইত্যাদি। দেখিয়াছি, ইহারাই ছিলেন সেই যুগের প্রধান ধনোৎপাদক শ্রেণী; কাজেই রাষ্ট্রের পক্ষে ইহাদের আনুকূল্য খুবই স্বাভাবিক। আর একটি শ্রেণীও রাষ্ট্রের আনুকূল্য লাভ করিতে আরম্ভ করিয়াছিল; ইঁহারা জ্ঞান-ধৰ্মজীবী শ্রেণীর জৈন-বৌদ্ধ যতি সম্প্রদায় ও ব্রাহ্মণ। কিন্তু এই শ্রেণী এখনও সম্পূর্ণ গড়িয়া উঠিয়া রাষ্ট্রের সঙ্গে পরস্পর স্বার্থের সম্বন্ধে আবদ্ধ হয় নাই; তাহার সূচনা দেখা যাইতেছে মাত্র।
ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে ভূমি-নির্ভর সামন্তপ্রথার স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠার এবং ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম, সংস্কার ও সংস্কৃতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দুইটি শ্রেণীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হইল, একটি বহুস্তরবদ্ধ ভূম্যধিকারী শ্রেণী, এবং আর একটি জ্ঞান-ধৰ্মজীবী শ্রেণীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ। সামন্তচক্র ছিল রাষ্ট্রের শক্তি ও নির্ভর; এবং এই সামন্তচক্রকে আশ্রয় করিয়া ভূম্যধিকারী শ্রেণীর অস্তিত্ব। কাজেই এই শ্রেণীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ হওয়া কিছু বিচিত্র নয়। জ্ঞান ধৰ্মজীবী ব্ৰাহ্মণদের জীবিকানির্ভর ছিল ধর্মদেয়, ব্ৰহ্মদেয় ভূমি ও দক্ষিণা-পুরস্কারলব্ধ অর্থ। এই ভূমি ও অর্থপ্রাপ্তি নির্ভর করিত একদিকে রাষ্ট্র ও অন্যদিকে অভিজাত ভূম্যধিকারী শ্রেণীর কৃপার উপর। কাজেই ব্ৰাহ্মণেরা এই দুইয়েরই পোষক ও সমর্থক হইবেন, ইহাই তো স্বাভাবিক। তবে এই পর্বের রাষ্ট্রযন্ত্রে ব্ৰাহ্মণদের প্রভুত্ব বা আধিপত্য বড়ো একটা এখনও দেখা যাইতেছে না। ব্ৰাহ্মণের সংখ্যায়। তখনও স্বল্প, দেশে নবাগত অথবা নববর্ধিত; ব্ৰহ্মদেয়, ধর্মদেয় ভূমি লইয়া পূজা, যাজযজ্ঞ, অধ্যয়ন, অধ্যাপনাতেই প্রধানত তাহারা নিযুক্ত; কাজেই প্রভুত্ব বিস্তারের সময় তখনও আসে নাই। পরে সংখ্যা ও ক্ষমতাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রে ও সমাজে তাঁহাদের আধিপত্য বিস্তৃত হয়, এবং মোটামুটি সপ্তম-অষ্টম শতক হইতেই পীের ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে তাহাদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়; সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণের ক্ষমতা এবং অধিকারও হ্রাস পাইতে থাকে।
