শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ী শ্রেণী
কিন্তু অষ্টম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া এই যে বিভিন্ন শ্রেণীর সুস্পষ্ট ও অস্পষ্ট ইঙ্গিত আমরা পাইলাম, ইহার মধ্যে শিল্পী, বণিক-ব্যবসায়ী শ্রেণীর উল্লেখ কোথায়? এই সময়ের ভূমি দান-বিক্রয়ের একটি পট্টোলীতেও ভুল করিয়াও বণিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর কোনও ব্যক্তির উল্লেখ নাই; ইহা আশ্চর্য নয় কি? অষ্টম শতক-পূর্ববর্তী লিপিগুলিও ভূমি দান-বিক্রয়ের দলিল, সেখানে তো দেখিতেছি, স্থানীয় অধিকরণ উপলক্ষেই যে শুধু নগরশ্ৰেষ্ঠী, প্রথম সার্থিবাহ ও প্রথম কুলিকের নাম করা হইতেছে, তাহাই নয়, কোনও কোনও লিপিতে “প্রধানব্যাপারিণঃ’ বা প্রধান ব্যবসায়ীদেরও উল্লেখ করা হইতেছে, অন্যান্য শ্রেণীর ব্যক্তিদের সঙ্গে বণিক ও ব্যবসায়ীদেরও বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে। রাষ্ট্র-ব্যাপারেও তাঁহাদের বেশ কতকটা আধিপত্য দেখা যাইতেছে। কিন্তু অষ্টম শতকের পর এমন কি হইল, যাহার ফলে পরবর্তী লিপিগুলিতে এই শ্রেণীটির কোনো উল্লেখ রইল না? ভূমিদানের ব্যাপারে শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ীদের বিজ্ঞাপিত করিবার কোনও প্রয়োজন হয় নাই, এই তর্ক উঠিতে পারে। এ যুক্তি হয়তো কতকট সত্য, কিন্তু প্রয়োজন কি একেবারেই নাই? যে-গ্রামে ভূমিদান করা হইতেছে, সে-গ্রামের সকল শ্রেণী ও সকল স্তরের লোক, এমন কি চণ্ডাল পর্যন্ত সকলের উল্লেখ করা হইতেছে, অথচ শ্রেণী হিসাবে শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ীদের কোনও উল্লেখই হইতেছে না। এতগুলি নাম ও তৎসম্পৃক্ত ভূমিদানের উল্লেখ আমরা পাইতেছি, অথচ তাহার মধ্যে একটি গ্রামেও শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর লোক কি ছিলেন না? আর যেখানে রাজসেবকদের উল্লেখ করা হইতেছে, সেখানেও তো নগরশ্ৰেষ্ঠী বা সার্থবহ বা কুলিক ইত্যাদির কাহারও উল্লেখ পাইতেছি না। অথচ, সপ্তম শতক পর্যন্ত তাহারাই তো স্থানীয় অধিকরণের প্রধান সহায়ক, তাহারা এবং ব্যাপারীরাই স্থানীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সংব্যবহারী। অথচ ইহাদের কোনো উল্লেখ নাই। এখানেও আমার মনে হয়, এই অনুল্লেখ আকস্মিক নয়। অষ্টম শতকের পরে শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী ছিলেন না, এইরূপ অনুমান মুখতা মাত্র। দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা যাইতে পারে, খালিমপুর লিপির “প্ৰত্যাপণে মানপৈঃ”— দোকানে দোকানে মানপদের দ্বারা ধর্মপালের যশ কীর্তনের কথা, তারনাথ কথিত শিল্পী ধীমান ও বীটপালের কথা, শিল্পী মহীধর, শিল্পী শশিদেব, শিল্পী কর্ণভদ্র, শিল্পী তথাগতসর, সূত্ৰধার বিষ্ণুভদ্র এবং আরও অগণিত শিল্পী যাহারা পাল লিপিমালা ও অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তি উৎকীর্ণ করিয়াছিলেন তাহাদের কথা; বণিক বুদ্ধমিত্র ও বণিক লোকদত্তের কথা। মহারাজাধিরাজ মহীপালের রাজত্বের যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ রােজ্যাঙ্কে বিলকিন্দক (ত্রিপুরা জেলার বিলকান্দি) গ্রামবাসী শেষোক্ত দুই বণিক একটি নারায়ণ ও একটি গণেশমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। শুধু পাল আমলেই তো নয়; সেন আমলেও শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ীদের অপ্রাচুর্য ছিল না। শিল্পীদের তো গোষ্ঠীই ছিল এবং বিজয়সেনের আমলে জনৈক রাণিক শিল্পীগোষ্ঠীর অধিনায়ক ছিলেন। পূর্বোক্ত ভাটেরা গ্রামের গোবিন্দকেশবের লিপিতে এক কাংস্যকার (কঁসারী) এবং দন্তকারের (হাতির দাতের কাজ যাহারা করেন) খবর পাওয়া যাইতেছে। বল্লালচরিতে বণিক ও বিশেষভাবে সুবর্ণবণিকদের উল্লেখ তো সুস্পষ্ট। আর বৃহদ্ধর্ম ও ব্ৰহ্মবৈবর্ত পুরাণ দুটিতে তো শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর অগণিত উপবর্ণের তালিকা পাওয়া যাইতেছে। শিল্পীদের মধ্যে উল্লেখ করা যায়, তন্তুবায়-কুবিন্দক, কর্মকার, কুম্ভকার, কংসকার, শঙ্খকার, তক্ষণ-সূত্ৰধার, স্বর্ণকার, চিত্রকার, অট্টালিকাকার, কোটক ইত্যাদি। বণিক-ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা পাইতেছি, তৈলিক, তৌলিক, মোদক, তাম্বলী, গন্ধৰ্ব্বণিক, সুবর্ণবণিক, তৈলকর, ধীবর ইত্যাদির।
শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী সমাজে তাহা হইলে নিশ্চয়ই ছিলেন; কিন্তু অষ্টম শতকের পূর্বে শ্রেণী হিসাবে তাহাদের যে প্রাধান্য রাষ্ট্রে ও সমাজে ছিল, সেই প্রাধান্য ও আধিপত্য সপ্তম শতকের পর হইতেই কমিয়া গিয়াছিল। বণিক ও ব্যবসায়ী বৃত্তিধারী যে-সব বর্ণের তালিকা উপরোক্ত দুই পুরাণ হইতে উদ্ধার করা হইয়াছে, লক্ষণীয় এই যে, ইহারা সকলেই ক্ষুদ্র বণিক ও ব্যবসায়ী স্থানীয় দেশান্তর্গত ব্যাবসা-বাণিজ্যেই যেন ইহাদের স্থান। প্রাচীনতর কালের, অর্থাৎ পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের এবং হয়তো তাহারও আগেকার কালের শ্রেষ্ঠী ও সার্থবাহরা কোথায় গেলেন? ইহাদের উল্লেখ সমসাময়িক সাহিত্যে বা লিপিতে নাই কেন? আমি এই অধ্যায়েই পূর্বে দেখাইতেই চেষ্টা করিয়াছি, ঠিক এই সময় হইতেই অর্থাৎ মোটামুটি অষ্টম শতক হইতেই প্রাচীন বাঙলার সমাজ কৃষিনির্ভর হইয়া পড়িতে আরম্ভ করে, এবং ক্ষেত্রকর-কর্ষকেরাও বিশেষ একটি শ্রেণীরূপে গড়িয়া উঠেন, এবং সেইভাবেই সমাজে স্বীকৃত হন। অষ্টম শতকের আগে তাহাদের সুনির্দিষ্ট শ্রেণী হিসাবে গড়িয়া উঠিবার কোনও প্রমাণ নাই। শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর পক্ষে হইল ঠিক ইহার বিপরীত। পঞ্চম হইতে সপ্তম শতক পর্যন্ত দেখি— বোধহয় খ্ৰীষ্টপূর্ব তৃতীয়-দ্বিতীয় শতক হইতেই– বিশেষভাবে শ্রেণী হিসাবে তাঁহাদের উল্লেখ না থাকিলেও রাষ্ট্র ও সমাজে ইহাৱাই ছিলেন প্রধান, তাহাদেরই আধিপত্য ছিল অন্যান্য শ্রেণীর লোকদের অপেক্ষা বেশি। ইহার একমাত্র কারণ, তদানীন্তর বাঙালী সমাজ প্রধানত শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্য নির্ভর। এই তিন উপায়েই ধনোৎপাদনের প্রধান তিন পথ, এবং সামাজিক ধন বণ্টনও অনেকাংশে নির্ভর করিত ইহাদের উপর। কৃষিও। তখন ধনোৎপাদনের অন্যতম উপায় বটে, কিন্তু প্রধান উপায় শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্য। অষ্টম শতক হইতে সমাজ অধিকতর কৃষিনির্ভর, এবং উত্তরোত্তর এই নির্ভরতা বাড়িয়াই গিয়াছে; শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্য ধনোৎপাদনের প্রধান ও প্রথম উপায় আর থাকে নাই, এবং সেইজন্যই রাষ্ট্র ও সমাজে ইহাদের প্রাধান্যও আর থাকে নাই। ব্যক্তি হিসাবে কাহারও কাহারও মর্যাদা স্বীকৃতি হইলেও শ্রেণী হিসাবে সপ্তম শতক-পূর্ব মর্যাদা আর তাহারা ফিরিয়া পান নাই। লক্ষণীয় যে, অনেক শিল্পী ও বণিক-ব্যবসায়ী শ্রেণীর লোক বৃহদ্ধর্ম ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে মধ্যম-সংকর বা অসৎশদ্র পর্যায়ভুক্ত; যাঁহারা উত্তম-সংকর বা সৎশদ্র পর্যায়ভুক্ত তীহাদেরও মর্যাদা কারণ-কায়স্থ, বৈদ্য-অম্বষ্ঠ, গোপ, নাপিত প্রভৃতির নীচে। ব্ৰহ্মবৈবর্তপুরাণের সাক্ষ্যে দেখিতেছি, শিল্পী, স্বর্ণকার, সূত্ৰধার ও চিত্রকার এবং কোনও কোনও বণিক সম্প্রদায়কে মধ্যম সংকর পর্যায়ে স্থান দেওয়া হইয়াছে। বল্লালচরিতের সাক্ষ্য প্রামাণিক হইলে স্বীকার করিতে হয়, বণিক ও বিশেষভাবে সুবৰ্ণ বণিকদের তিনি সমাজে পতিত করিয়া দিয়াছিলেন। স্পষ্টই বুঝা যাইতেছে, রাষ্ট্র ও সমাজে ইহাদের প্রাধান্য থাকিলে, ধনোৎপাদন ও বণ্টন ব্যাপারে। ইহাদের আধিপত্য থাকিলে এইরূপ স্থান নির্দেশ বা অবনতিকরণ কিছুতেই সম্ভব হইত না।
