ভূমি-ব্যবস্থা সম্বন্ধে পূর্বতন একটি অধ্যায়ে আমি দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছি, লোকসংখ্যা বৃদ্ধির জন্যই হউক বা অন্য কোনও কারণেই হউক— অন্যতম একটি কারণ পরে বলিতেছি— সমাজে ভূমির চাহিদা ক্রমশ বাড়িতেছিল, সমাজের মধ্যে ব্যক্তিবিশেষকে কেন্দ্র করিয়া ভূমি কেন্দ্রীকৃত হইবার দিকে একটা ঝোক একটু একটু করিয়া দেখা দিতেছিল। সামাজিক ধনোৎপাদনের ভারকেন্দ্রটি ক্রমশ যেন ভূমির উপরই আসিয়া পড়িয়াছিল; পাল ও বিশেষ করিয়া সেন-আমলের লিপিগুলি তন্ন তন্ন করিয়া পড়িলে এই কথাই মনের মধ্যে জুড়িয়া বসিতে চায়। কোন ভূমির উৎপন্ন দ্রব্য কী, ভূমির দাম কত, বার্ষিক আয় কত, ইত্যাদি সংবাদ খুঁটিনাটি সহ সবিস্তারে যে-ভাবে দেওয়া হইতেছে, তাহাতে সমাজের কৃষি-নির্ভরতার ছবিটাই যেন দৃষ্টি ও বুদ্ধি অধিকার করিয়া বসে। তাহা ছাড়া, জনসংখ্যা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নূতন নূতন ভূমি আবাদ, জঙ্গল কাটিয়া গ্রাম বসাইবার ও চাষের জন্য জমি বাহির করিবার চেষ্টাও চোখে পড়ে। বুস্তুত, তেমন প্রমাণও দু-একটি আছে; দৃষ্টান্তস্বরূপ সপ্তম শতকের লোকনাথের ত্রিপুরা-পট্টোলীর উল্লেখ করা যাইতে পারে। এই ক্রমবর্ধমান কৃষিনির্ভরতার প্রতিচ্ছবি সামাজিক শ্রেণী-বিন্যাসের মধ্যে ফুটিয়া উঠিবে তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই, এবং পাল ও সেন-আমলের লিপিগুলিতে তাহাই হইয়াছে। সপ্তম শতক পর্যন্ত লিপিগুলিতে বর্ণিত ও উল্লিখিত ব্যক্তিদের মধ্যে পৃথক ও সুনির্দিষ্টভাবে কৃষক বা ক্ষেত্রকর বলিয়া যে কাহারও উল্লেখ নাই তাহার কারণ এই নয় যে, তখন কৃষক ছিল না, কৃষিকর্ম হইত না; তাহার যথার্থ ঐতিহাসিক কারণ, সমাজ তখন একান্তভাবে কৃষিনির্ভর হইয়া উঠে নাই, এবং কৃষক বা ক্ষেত্রকর সমাজের মধ্যে থাকিলেও তাহারা তখনও একটা বিশেষ অথবা উল্লেখযোগ্য শ্রেণী হিসাবে গড়িয়া উঠেন নাই। আমার এই যে অনুমান তাহার সবিশেষ সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ঐতিহাসিক গবেষণার বর্তমান অবস্থায় দেওয়া সম্ভব নয়; কিন্তু আমি যে-যুক্তির মধ্যে এই অনুমান প্রতিষ্ঠিত করিতে চেষ্টা করিলাম তাহা সমাজতাত্ত্বিক যুক্তি নিয়মের বহির্ভূত, পণ্ডিতেরা আশা করি তাহা বলিবেন না।
যাহাই হউক, এই পর্যন্ত শ্রেণী-বিন্যাসের যে-তথ্য আমরা পাইলাম তাহাতে দেখিতেছি, রাজপাদোপজীবীরা একটি সুসংবদ্ধ, সুস্পষ্ট সীমারেখায় নির্দিষ্ট একটি শ্রেণী এবং তাঁহাদেরই আনুষঙ্গিক ছায়ারূপে আছেন (রাজ)-সেবক শ্রেণী। ইহার রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালক ও সহায়ক। ইহাদের মধ্যে আবার বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্তর বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। বিদ্যা-বুদ্ধি -জ্ঞান-ধৰ্মজীবীরা আর-একটি শ্রেণী; ইহারা সাধারণভাবে জ্ঞান-ধর্ম-সংস্কৃতির ধারক ও নিমামক। ইহাদের মধ্যে ব্ৰাহ্মণদের সংখ্যাই অধিক; বৌদ্ধ এবং জৈনধর্মের সংঘগুরু এবং যতিরাও আছেন, সিদ্ধাচার্যরা আছেন এবং স্বল্পসংখ্যক কারণ-কায়স্থ, বৈদ্য এবং উত্তম-সংকর বা সৎশূদ্র পর্যায়ের কিছু কিছু লোকও আছেন। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, লক্ষ্মণসেনের অন্যতম সভাকবি ধোয়ী তন্তুবায় ছিলেন এবং সমসাময়িক অন্য আর একজন কবি, জনৈক পাপীপ, জাতে ছিলেন কেবাট্ট বা কৈবর্ত। ব্ৰহ্মদেয় অথবা ধর্মদেয় ভূমি, দক্ষিণালব্ধ ধন ও সাময়িক পুরস্কার হইল এই শ্রেণীর প্রধান আর্থিক নির্ভর। ভূম্যধিকারীর একটি শ্রেণীও অল্পবিস্তর সুস্পষ্ট এবং এই শ্রেণীও বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত। সর্বোপরি স্তরে সামন্ত শ্রেণী এবং নীচে স্তরে স্তরে মহত্তর, মহামহত্তর ইত্যাদি ভূমিসম্পৃক্ত অভিজাত শ্রেণী হইতে আরম্ভ করিয়া একেবারে কুটুম্ব ও প্রধান প্রধান গৃহস্থ পর্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূস্বামীর স্তর। ইহারা, বিশেষভাবে নিম্নতর স্তরের ভূস্বামীরাই শাসনোক্ত ‘অক্ষুদ্র প্রকৃতয়ঃ’। চতুর্থ একটি শ্রেণী হইতেছে ক্ষেত্রকর বা কৃষকদের লইয়া। দেশের ধনোৎপাদনের অন্যতম উপায় ইহাদের হাতে; কিন্তু বণ্টন ব্যাপারে ইহাদের কোনও হাত নাই; ইহারা অধিকাংশই স্বল্পমাত্র ভূমির অধিকারী অথবা ভাগচাষী ও ভূমিহীন চাষী। পাল ও সেন লিপিতে পঞ্চম একটি শ্রেণীর উল্লেখ আছে; এই শ্রেণীর লোকেরা সমাজের শ্রমিক-সেবক, অধিকাংশই ভূমি-বঞ্চিত, রাষ্ট্ৰীয়-সামাজিক অধিকার বঞ্চিত। এই শ্রেণী তথাকথিত অন্ত্যজ ও স্লেচ্ছাবর্ণের ও আদিবাসী কোমের নানা বৃত্তিধারী লোকেদের লইয়া গঠিত। লিপিগুলিতে বিশদভাবে ইহাদের কথা বলা হয় নাই, এবং যেটুকু বলা হইয়াছে তাহাও পালপর্বের লিপিমালাতেই। অষ্টম শতকের আগে ইহাদের উল্লেখ নাই; পালপর্বের পরেও ইহাদের উল্লেখ নাই। পালপর্বেও ইহাদের সকলকে লইয়া নিম্নতম বৃত্তি ও স্তরের নাম পর্যন্ত করিয়া এক নিঃশ্বাসে বলিয়া দেওয়া হইয়াছে, “মেদাস্ত্ৰচণ্ডালপর্যন্তান”— একেবারে চণ্ডাল পর্যন্ত। কিন্তু পাল ও সেন-আমলের সমসাময়িক সাহিত্যে— কাব্যে, পুরাণে, স্মৃতিগ্রন্থে— ইহাদের বর্ণ ও বৃত্তিমর্যাদা সম্বন্ধে বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়। আগেই বর্ণ-বিন্যাস ও বর্তমান অধ্যায়ে সে-সাক্ষ্য উপস্থিত করিয়াছি। লিপি প্রমাণদ্বারাও সমসাময়িক সাহিত্যের সাক্ষ্য সমর্থিত হয়। রাজক ও নাপিতরাও সমাজশ্রমিক, সঙ্গে সঙ্গে তাহারা আবার কর্ষক বা ক্ষেত্ৰকারও বটে। জনৈক রাজক সিরাপা ও নাপিত গোবিন্দের উল্লেখ পাইতেছি। শ্ৰীহট্ট জেলার ভাটেরা গ্রামে প্রাপ্ত গোবিন্দকেশবের লিপিতে। মেদ, অন্ধ, চণ্ডাল ছাড়া আরও দু’একটি অস্ত্যজ ও স্লেচ্ছ পর্যায়ের, অর্থাৎ নিম্নতম অর্থনৈতিক স্তরের লোকেদের খবর সমসাময়িক লিপিতে পাওয়া যায়, যেমন পুলিন্দ, শবর ইত্যাদি। চর্যাপদে যে ডোম, ডোম্বী বা ডোিমনী, শবর-শবরী, কাপালিক ইত্যাদির কথা বার বার পাওয়া যায় তাহারাও এই শ্রেণীর। একটি পদে স্পষ্টই বলা হইয়াছে, ডোন্ধীর কুঁড়িয়া (কুঁড়ে ঘর) নগরের বাহিরে; এখনও তো তাহারা গ্রাম ও নগরের বাহিরেই থাকে। বাশের চাংগাড়ী ও বাঁশের তাত তৈরী করা তখন যেমন ছিল ইহাদের কাজ, এখনও তাঁহাই। শিল্পীশ্রেণীর মধ্যে তন্তুবায় সম্প্রদায়ের খবরও চর্যাগীতিতে পাওয়া যায়; সিদ্ধাচার্য তন্ত্রীপাদ সিদ্ধিপূর্বজীবনে এই সম্প্রদায়ের লোক এবং তািতগুরু ছিলেন বলিয়াই তো মনে হয়।
