মহত্তর, মহামহত্তর, কুটুম্ব, প্রতিবাসী, জনপদবাসী ইত্যাদিরা কোন্ শ্রেণীর লোক ছিলেন, ইঁহাদের বৃত্তি কী ছিল? ইহাদের অধিকাংশই যে বিভিন্ন স্তরে ভূম্যধিকারী ছিলেন, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার অবসর কম। শাসনাবলীতে উল্লিখিত রাজপাদোপজীবী, ক্ষেত্রকর, ব্ৰাহ্মণ এবং নিম্নস্তরের চণ্ডাল পর্যন্ত লোকেদের বাদ দিলে যাঁহারা বাকী থাকেন, তাহাদের মধ্যে অধিকাংশ ভূমিসম্পদে এবং অল্পসংখ্যক ব্যক্তিগত গুণে ও চরিত্রে সমাজে মান্য ও সম্পন্ন হইয়াছিলেন; তাহারাই মহামহত্তর ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত হইয়াছেন এরূপ মনে করিলে অন্যায় হয় না। কুটুম্ব, প্রতিবাসী, জনপদবাসী— ইঁহারা সাধারণভাবে স্বল্পভূমিসম্পন্ন গৃহস্থ; কৃষি, গৃহ-শিল্প ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাবসা ইহাদের বৃত্তি ও জীবিকা। কৃষি ইঁহাদের বৃত্তি বলিলাম বটে, কিন্তু ইহারা নিজেরা নিজেদের হাতে চাষের কাজ করিতেন বলিয়া মনে করিতে পারিতেছি না। যদিও ভূমির মালিক পৃথকভাবে উল্লিখিত হইয়াছেন। অষ্টম শতকের দেবখড়েগর আম্রফপুর-লিপির একটি স্থানে দেখিতেছি, ভূমি ভোগ করিতেছেন। একজন, কিন্তু চাষ করিতেছে অন্য লোকেরা—“শ্ৰীশৰ্বান্তরেণ ভুজ্যমানকঃ মহত্তরশিখরাদিভিঃ কৃষ্যমাণকঃ” (এখানে মহত্তর একজন ব্যক্তির নাম)। এই ব্যবস্থা শুধু এখন নয়, প্রাচীন কালে এবং মধ্যযুগেও প্রচলিত ছিল।। বস্তুত, যিনি ভূমির মালিক, তাহার পক্ষে নিজের হাতেই সমস্ত ভূমি রাখা এবং নিজেরাই চাষ করা কিছুতেই সম্ভব ছিল না। জমি নানা শর্তে বিলি বন্দােবস্তু করিতেই হইত, সে ইঙ্গিত পূর্ববতী এক অধ্যায়ে ইতিপূর্বেই করিয়াছি। সাহিত্য-পরিষদে রক্ষিত বিশ্বরূপসেনের এক লিপিতে দেখিতেছি, হল্যায়ুধ শৰ্মা নামক জনৈক আবল্লিক মহাপণ্ডিত ব্ৰাহ্মণ একা নিজের ভোগের জন্য নিজের গ্রামের আশেপাশে তিন-চারিটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে ৩৩৬ই উন্মান ভূমি রাজার নিকট হইতে দানম্বরূপ পাইয়াছিলেন; এই ভূমির বার্ষিক আয় ছিল ৫০০ কপর্দক পুরাণ। এই ৩৩৬৪ উন্মানের মধ্যে অধিকাংশ ছিল নালভূমি অর্থাৎ চাষের ক্ষেত্র। ইহা তো সহজেই অনুমেয় যে, এই সমগ্ৰ ভূমি হলায়ুধ শৰ্মর সমগ্র পরিবার পরিজনবৰ্গ লইয়াও নিজেদের চাষ করা সম্ভব ছিল না, এবং হলায়ুধ শৰ্মা ক্ষেত্ৰকল্প বলিয়া উল্লিখিতও হইতে পারেন না। র্তাহাকে জমি নিম্নপ্রজাদের মধ্যে বিলি বন্দোবস্ত করিয়া দিতেই হইত। এই নিম্নপ্রজাদের মধ্যে যাঁহারা নিজেরা চাষবাস করেন, তাহারাই ক্ষেত্রকর। এইখানে এই ধরনের একটি অনুমান যদি করা যায় যে, সমাজের মধ্যে ভূমি-সম্পদে ও শিল্প-বাণিজ্যাদি সম্পদে সমৃদ্ধ নানা স্তরের একটি শ্রেণীও ছিল এবং এই শ্রেণীরই প্রতিনিধি হইতেছেন মহত্তর, মহামহত্তর, কুটুম্ব ইত্যাদি ব্যক্তিরা, তাহা হইলে ঐতিহাসিক তথ্যের বিরোধী বোধ হয় কিছু বলা যায় না। বরং যে প্রমাণ আমাদের আছে, তাহার মধ্যে তাহার ইঙ্গিত প্রচ্ছন্ন, এ-কথা স্বীকার করিতে হয়।
ধর্ম ও জ্ঞানজীবী শ্রেণী
ব্ৰাহ্মণেরা বর্ণ হিসাবে যেমন, শ্রেণী হিসাবেও তেমনই পৃথক শ্রেণী; এবং এই শ্রেণীর উল্লেখ তো পরিষ্কার। দান-ধ্যান-ক্রিয়াকর্ম যাহা-কিছু করা হইতেছে, ইহাদের সম্মাননা করার পর। ভূমিদানি ইহারাই লাভ করিতেছেন, ইহাদের মধ্যে কেহ কেহ রাজপদোপজীবী শ্রেণীতে উল্লিখিত হইয়াছেন; মন্ত্রী, এমন-কি, সেনাপতি, সামন্ত, মহাসামন্ত, আবস্থিক, ধর্মধ্যক্ষ ইত্যাদিও হইয়াছেন সন্দেহ নাই, কিন্তু তাহারা সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। সাধারণ নিয়মে ইহারা পুরোহিত, ঋত্বিক, ধৰ্মজ্ঞ, নীতিপাঠক, শাস্ত্যাগারিক, শান্তিবারিক, রাজপণ্ডিত, ধৰ্মজ্ঞ, স্মৃতি ও ব্যবহারশাস্ত্ৰাদির লেখক, প্রশস্তিকার, কাব্য, সাহিত্য ইত্যাদির রচয়িতা। ইহাদের উল্লেখ পাল ও সেন আমলের লিপিগুলিতে, সমসাময়িক সাহিত্যে বারংবার পাওয়া যায়। এই ব্ৰাহ্মণ-শাসিত ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম ছাড়া পাল আমলের শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রাধান্যও কম ছিল না। ব্ৰাহ্মণেরা যেমন শ্রেণী-হিসাবে সমাজের ধর্ম, শিক্ষা, নীতি ও ব্যবহারের ধারক ও নিয়ামক ছিলেন, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মসংঘগুলিও ঠিক তেমনই সমাজের কতকাংশের ধর্ম, শিক্ষা ও নীতির ধারক ও নিয়ামক ছিল, এবং তাঁহাদের পোষণের জন্যও রাজা ও অন্যান্য সমর্থ ব্যক্তিরা ভূমি ইত্যাদি দান করিতেন; ভূমিদান, অর্থদান ইত্যাদি গ্রহণ করিয়া তাহারা প্রচুর ভূমি ও অর্থ-সম্পদের অধিকারী হইতেন, তাহার প্রমাণের অভাব নাই। এই বৌদ্ধ-জৈন স্থবির ও সংঘ-সভ্যদের এবং ব্ৰাহ্মণদের লইয়া প্রাচীন বাঙলার বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান-ধর্মজীবী শ্রেণী।
কৃষক বা ক্ষেত্রকর শ্রেণী
ক্ষেত্রকর শ্রেণীর কথা তো প্রসঙ্গক্রমে আগেই বলা হইয়াছে। অষ্টম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া যতগুলি লিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাদের প্রায় প্রত্যেকটিতেই ক্ষেত্রকরদের বা কৃষক-কর্ষকদের উল্লেখ আছে। অথচ আশ্চর্য এই অষ্টম শতকের আগে প্রায় কোনও লিপিতেই ইহাদের উল্লেখ নাই, যদিও উভয় যুগের লিপিগুলি, একাধিকবার বলিয়াছি, ভূমি ক্ৰয়-বিক্রয় ও দানেরই পট্টোলী। এ তর্ক করা চলিবে না যে, ক্ষেত্রকর বা কৃষক পূর্ববর্তী যুগে ছিল না, পরবর্তী যুগে হঠাৎ দেখা দিল। খিল অথবা ক্ষেত্রভূমি দান ক্রয়-বিক্রয় যখন হইতেছে, চাষের জন্যই হইতেছে। এ-সম্বন্ধে তর্কের সুযোগ কোথায়? আর, ভূমি দান বিক্রয় যদি মহত্তর, কুটুম্ব, শিল্পী, ব্যবসায়ী, রাজপুরুষ, সাধারণ ও অসাধারণ (প্রকৃতয়ঃ এবং অক্ষুদ্র-প্রকৃতয়ঃ) লোক, ব্রাহ্মণ ইত্যাদি সকলকে বিজ্ঞাপিত করা যায়, তাহা হইলে ভূমিব্যাপারে র্যাহার স্বাৰ্থ সকলের চেয়ে বেশি, সেই কর্ষকের উল্লেখ নাই কেন? আর, অষ্টম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া পরবর্তী লিপিগুলিতে র্তাহাদের উল্লেখ আছে কেন? তর্ক তুলিতে পারা যায়, পূর্ববর্তী যুগের লিপিগুলিতে কৃষকদের অনুল্লেখের কথা যাহা বলিতেছি, তাহা সত্য নয়; কারণ তাহারা হয়তো ঐ গ্রামবাসী কুটুম্ব, গৃহস্থ, প্রকৃতয়ঃ অর্থাৎ সাধারণ লোক, ইহাদের মধ্যেই তীহাদের উল্লেখ আছে। ইহার উত্তর হইতেছে, তাহা হইলে এই সব কুটুম্ব প্রতিবাসী, জনপদবাসী জনসাধারণের কথা তো অষ্টম শতক-পরবর্তী লিপিগুলিতেও আছে, তৎসত্ত্বেও পৃথকভাবে ক্ষেত্রকরদের, কৃষকদের উল্লেখ আছে কেন? আমার কিন্তু মনে হয়, পঞ্চম হইতে সপ্তম শতক পর্যন্ত লিপিগুলিতে কৃষকদের অনুল্লেখ এবং পরবতী লিপিগুলিতে প্রায় আবশ্যিক উল্লেখ একেবারে আকস্মিক বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া যায় না। ইহার একটি কারণ আছে এবং এই কারণের মধ্যে প্রাচীন বাঙলার সমাজ-বিন্যাসের ইতিহাসের একটু ইঙ্গিত আছে। একটু বিস্তারিত ভাবে সেটি বলা প্রয়োজন।
