ভূম্যধিকারির শ্রেণীস্তর
রাজপাদোপজীবী সকলেই আবার একই অর্থনৈতিক স্তরভুক্ত ছিলেন না, ইহা তো সহজেই অনুমেয়। ইহাদের মধ্যে সকলের উপরে ছিলেন রাণক, রাজনক, সামন্ত, মহাসামন্ত, মাণ্ডলিক, মহামাণ্ডলিক ইত্যাদি সামন্ত প্রভুরা; স্ব স্ব নির্দিষ্ট জনপদে ইহাদের প্রভুত্ব মহারাজাধিরাজাপেক্ষা কিছু কম ছিল না। সর্বপ্রধান ভূস্বামী মহাসামন্ত-মহামাণ্ডলিকেরা; তঁহাদের নীচেই সামন্ত-মাণ্ডলিকেরা- সামন্তসৌধের দ্বিতীয় স্তর। তৃতীয় স্তরে মহামহত্তরেরা— বৃহৎভূস্বামীর দল; চতুর্থ স্তরে মহত্তর ইত্যাদি, অর্থাৎ ক্ষুদ্র ভূস্বামীর দল এবং তাহার পর ধাপে ধাপে নামিয়া কুটুম্ব অর্থাৎ সাধারণ গৃহস্থ বা ভূমিবানপ্রজা, ভাগীপ্ৰজা, ভূমিবিহীন প্রজা ইত্যাদি। সামন্ত, মহাসামন্ত, মাণ্ডলিক, মহামাণ্ডলিক— ইহারা সকলেই সাক্ষাৎভাবে রাজপাদোপজীবী; কিন্তু মহত্তর, মহামহত্তর। কুটুম্ব প্রভৃতিরা রাজপাদোপজীবী নহেন, রাজসেবক মাত্র। রাষ্ট্রের প্রয়োজন আহূত হইলে রাজপুরুষদের সহায়তা ইহারা করিতেন, এমন প্রমাণ পঞ্চম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া প্ৰায় সকল লিপিতেই পাওয়া যায়।
রাজসেবক শ্রেণী
পূর্বোক্ত রাজপাদোপজীবী শ্রেণীর বাহিরে আর-একটি শ্ৰেণীর খবর আমরা পাইতেছি। অষ্টম শতক-পূর্ব লিপিগুলিতে এই শ্রেণীর লোকেদের খবর পাওয়া যায়। ইহারা রাজসরকারে চাকুরি করিতেন। কিনা ঠিক বলা যায় না, তবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে আহূত হইলে রাজপুরুষদের সহায়তা করিতেন, তাহা বুঝা যায়; ইহাদের উল্লেখ আগেই করা হইয়াছে। পাল ও সেন আমলের লিপিগুলিতেও ইহাদের উল্লেখ আছে, কিন্তু এখানে ইহারা উল্লিখিত হইতেছেন রাষ্ট্রসেবক রূপে। ইঁহারা হইতেছেন, জ্যেষ্ঠ কায়স্থ, মহত্তর, মহামহত্তর, দাশগ্রামিক, করণ, বিষয়-ব্যবহারী ইত্যাদি। কোনও কোনও লিপিতে মহত্তর, মহামহত্তর ইতু্যাদি স্থানীয় ব্যক্তিদের এই শ্রেণীর লোকেদের মধ্যে উল্লেখ করা হয় নাই, কিন্তু চাটভাট ইত্যাদি অন্যান্য নিম্নস্তরের রাজকর্মচারীরা সর্বদাই সেবকাদি অর্থাৎ (রাজ)-সেবকরূপে উল্লিখিত হইয়াছেন। অষ্টম শতক-পূর্ব লিপিগুলির জ্যেষ্ঠ কায়স্থ বা প্রথম কায়স্থ তো রাজপুরুষ বলিয়াই মনে হয়; যে পাঁচ জন মিলিয়া স্থানীয় অধিকরণ গঠন করেন, তিনি ছিলেন তাহাদের একজন। পরবর্তীকালে রাজপুরুষ না হইলেও তিনিও যে একজন রাজসেবক, তাহাতে আর সন্দেহ কী? এই (রাজ)-সেবকদের মধ্যে গৌড়মালব-খস-তৃণ-কুলিক-কর্ণাট-লাট-চোড় ইত্যাদি জাতীয় ব্যক্তিদের উল্লেখ পাইতেছি। ইহারা কাহারা? এটুকু বুঝিতেছি, ইহারাও কোনও উপায়ে রাষ্ট্রের সেবা করিতেন। যে-ভাবে ইহাদের উল্লেখ পাইতেছি, আমার তো মনে হয়, এই সব ভিনাপ্রদেশী লোকেরা বেতনভুক সৈন্যরূপে রাষ্ট্রের সেবা করিতেন। পুরোহিতরূপে লাট বা গুজরাটদেশীয় ব্ৰাহ্মণদের উল্লেখ তো খালিমপুর-লিপিতেই আছে। কিন্তু ঐ দেশীয় সৈন্যরাও এদেশে রাজসৈনিকররূপে আসিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। বিভিন্ন সময়ে অন্য প্রদেশ হইতে যে-সব যুদ্ধাভিযান বাঙলাদেশে আসিয়াছে, যেমন কর্ণাটীদের, তাহাদের কিছু কিছু সৈন্য এদেশে থাকিয়া যাওয়া অসম্ভব নয়। অবশ্য, অন্যান্য বৃত্তি অবলম্বন করিয়াও যে তাহারা আসেন নাই, তাহাও বলা যায় না। তবে, যে-ভাবেই হউক, এদেশে তাহারা যে-বুত্তি গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা রাজসেবকের বৃত্তি। অবশ্য, সমাজে সঙ্গে ইহাদের সম্বন্ধ খুব ঘনিষ্ঠ ছিল বলিয়া মনে হয় না।
যাহাই হউক, রাজপদোপজীবী শ্রেণীরই আনুষঙ্গিক বা ছায়ারূপে পাইলাম রাজসেবকশ্রেণী। এই দুই শ্রেণীর সমস্ত লোকেরাই এক স্তরের ছিলেন না, পদমর্যাদা এবং বেতনমর্যাদাও এক ছিল না, তাহা তো সহজেই অনুমান করা যায়। উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন স্তরের বিত্ত ও মর্যাদার লোক এই উভয় শ্রেণীর মধ্যেই ছিল; কিন্তু যে স্তরেই হউক, ইহাদের স্বার্থ ও অস্তিত্ব রাষ্ট্রের সঙ্গেই যে একান্তভাবে জড়িত ছিল, তাহা স্বীকার করিতে কল্পনার আশ্রয় লইবার প্রয়োজন নাই।
আমলাতন্ত্রের শ্রেণীস্তর
রাজ্যপাদোপজীবী শ্রেণীর বিভিন্ন স্তরগুলি ধরিতে পারা কঠিন নয়। সামন্ত, মহাসামন্ত, মাণ্ডলিক, মহামাণ্ডলিক প্রভূতির কথা আগেই বলিয়াছি। ইহাদের নীচের স্তরেই পাইতেছি উপরিক বা ভুক্তিপতি, বিষয়পতি, মণ্ডলপতি, অমাতা, সান্ধিবিগ্রহিক, মন্ত্রী, মহামন্ত্রী, ধর্মাধ্যক্ষ, দণ্ডনায়ক, মহাদণ্ডনায়ক, দৌঃসাধসাধনিক, দৃত, দূতক, পুরোহিত, শান্ত্যাগরিক, রাজপণ্ডিত, কুমারামোত্য, মহাপ্ৰতীহার, রাজামাতা, রাজস্থানীয় ইত্যাদি। সুবৃহৎ আমলাতন্ত্রে ইহারাই উপরতম স্তর এবং ইহাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, অর্থাৎ শ্রেণী:স্বাৰ্থ একদিকে যেমন রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত, তেমনই অন্যদিকে ক্ষুদ্র বৃহৎ ভূস্বামীদের সঙ্গে। এই উপরতম স্তরের নীচেই একটি মধ্যবিত্ত, মধ্যক্ষমতাধিকারী রাজকর্মচারীর স্তর; এই স্তরে বোধ হয় অগ্রহারিক, ঔদ্রঙ্গিক, আবস্থিক, চৌরোদ্ধািরণিক, বলাধ্যক্ষ, নাবাধ্যক্ষ, দাণ্ডিক, দণ্ডপাশিক, দণ্ডশক্তি, দশাপরাধিক, গ্রামপতি, জ্যেষ্ঠকায়স্থ, খণ্ডরক্ষ, খোল, কোট্টাপাল, ক্ষেত্রপ, প্ৰমাতৃ, প্রান্তপাল, ষষ্ঠাধিকৃত ইত্যাদি। ইঁহাদের নিম্নবর্তী স্তরে শৌল্বিক, গৌল্মিক, গ্রামপতি, হট্টপটি, লেখক, শিরোরক্ষিক, শান্তকিক, বাসাগরিক, পিলুপতি ইত্যাদি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে এই সব রাজপুরুষদের ক্ষমতা ও মর্যাদার তারতম্য হইত, ইহা সহজেই অনুমেয়। সর্বনিম্ন স্তরও একটি নিশ্চয়ই ছিল; এই স্তরে স্থান হইয়াছিল ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্রসেবকদলের, এবং এই দলে কুণ-মালব –খস-লাট -কর্ণাট-চোড় ইত্যাদি বেতনভুক সৈন্যরা ছিলেন, ক্ষুদ্র করণ বা কেরানিরা ছিলেন, চাটভাটেরা ছিলেন এবং ছিলেন আরও অনেকে।
