সেনরাজাদের এবং সমসাময়িক অন্যান্য রাজবংশের লিপিগুলি সম্বন্ধে বলিবার বিশেষ কিছু নাই; বক্ষ্যমাণ বিষয়ে তাহাদের সাক্ষ্য পাল-লিপিগুলিরই অনুরূপ। তবে পাল ও সমসাময়িক অন্য রাজাদের লিপিতে যেখানে পাইতেছি প্রতিবাসীদের কথা, পরবর্তী লিপিগুলিতে ঠিক সেইখনেই আছে জনপদবাসী (জনপদান কিংবা জনপদান)দের কথা। কিন্তু, একটি বিষয় বিশেষ উল্লেখযোগ্য বলিয়া মনে করি। পাল ও সমসাময়িক অনেকগুলি লিপিতে দেখা যায়, বিজ্ঞাপিত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষেত্রকর ইত্যাদির পরেই নিম্নস্তরের যে অগণিত লোক তাহাদিগকে সব একসঙ্গে গাথিয়া দিয়া বলা হইতেছে, “মেদান্ত্ৰচণ্ডালপর্যন্তান” অথবা “আচণ্ডালান”, অর্থাৎ, নিম্নতর স্তরের চণ্ডাল পর্যন্ত; অর্থাৎ বর্ণ-বিন্যাস অধ্যায়ে স্লেচ্ছ ও অন্ত্যজ পর্যায়ে যতগুলি উপবর্ণের উল্লেখ আমরা পাইয়াছি তাহারা সকলেই ঐ “মেদান্ধিচণ্ডাল” পদের মধ্যেই উক্ত হইয়াছে। পরবতী লিপিগুলিতে, অর্থাৎ কম্বোজ-বর্মণ-সেন আমলের লিপিগুলিতে কিন্তু এই পদটি কোথাও নাই; চণ্ডাল পর্যন্ত নিম্নতম শ্রেণী ও বর্ণের অন্যান্য লোকেরা একেবারে অনুল্লিখিত। পালযুগের পরে সেন-আমলে রাষ্ট্রের ও সমাজের উচ্চস্তরের, অর্থাৎ, এক কথায় উৎপাদন ও বণ্টন কর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি যেন বদলাইয়া গিয়াছিল। এই অনুমান অস্বীকার করা কঠিন।
সমসাময়িক সাহিত্য
সমসাময়িক সাহিত্যেও এই শ্রেণী-বিন্যাসের চেহারা কিছুটা ধরিতে পারা যায়; পূর্ববর্তী বর্ণ-বিন্যাস অধ্যায়ে বর্ণ ও শ্রেণী এবং বর্ণ ও কোম প্রসঙ্গে তাহার আভাস দিতে চেষ্টা করিয়াছি। বৌদ্ধ চর্যাগীতিতে কয়েকটি আদিবাসী কোম ও উপবর্ণ এবং তাঁহাদের বৃত্তির ইঙ্গিত আছে; সেন আমলের দুই-একটি লিপিতেও আছে। সমসাময়িক বঙ্গীয় স্মৃতি ও পুরাণে ইহারা অন্তজ বা স্লেচ্ছ পর্যায়ভুক্ত, এবং শুধু বর্ণ হিসাবেই নয়, অর্থনৈতিক শ্রেণী হিসাবেও ইহারা সমাজের নিম্নতম শ্রেণীর লোক; ইহাদের অনুসৃত বৃত্তিতেই তাহা পরিষ্কার। মেদ, অন্ধ ও চণ্ডালদের মতো কোল, পুলিন্দ, পুককস, শবর, বরুড় (বাউড়ী?), চর্মকার, ঘট্টজীবী, ডোলাবাহী (দুলিয়া, দুলে) ব্যাধ, হাড়ডি (হাড়ি), ডোম, জোলা, বাগাতীত (বাগদী?), ইত্যাদি সকলেই সমাজের শ্রমিক-সেবক, আজিকার দিনের ভাষায় দিনমজুর, এবং আজিকার মতোই ভূমিহীন প্রজা। ইহাদের অব্যবহিত উপরের স্তরেই আর-একটি শ্রেণীর আভাস ধরিতে পারা যায়; ইহারা বিভিন্ন উপবর্ণে বিভক্ত, প্রত্যেকের পৃথক পৃথক বৃত্তি ও উপজীবিকা। কিন্তু লক্ষণীয় এই যে, ইহারা প্রায় সকলেই বৃহদ্ধৰ্মপুরাণের মধ্যম-সংকর এবং ব্ৰহ্মবৈবর্তপুরাণের অসৎশুদ্র পর্যায়ভুক্ত। ইহাদের মধ্যে শিল্পজীবীও আছেন, কৃষিজীবীও আছেন, এমন-কি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও নাই, এমন নয়; শিল্পজীবী, যেমন তক্ষণ, সূত্ৰধার, চিত্রকার, অট্টালিকাকার, কোটক ইত্যাদি; কৃষিজীবী, যেমন রাজক, আভীর (বিদেশী কোম), নট, পৌণ্ডক (পোদ্য?), কৌয়ালী, মাংসচ্ছেদ ইত্যাদি; ব্যবসায়ী, যেমন তৈলকার, শৌণ্ডিক (শুড়ি), ধীবর-জালিক ইত্যাদি। নিজ নিজ বৃত্তিই ইহাদের জীবিকা সন্দেহ নাই, কিন্তু জীবিকার জন্য ইহারা কমবেশি আংশিকত কৃষিনির্ভরও ছিলেন, এরূপ অনুমান অত্যন্ত স্বাভাবিক। ইহাদের বৃত্তিগুলির প্রত্যেকটিই সামাজিক কর্তব্য; সেই কর্তব্যের বিনিময়ে ইহারা ভূমির উপর অথবা ভূমিলব্ধ দ্রব্যাদির উপর আংশিক অধিকার ভোগ করিতেন, এই অনুমানও স্বাভাবিক। ইহারাই অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের অস্থায়ী প্ৰজা, ভাগচাষী ইত্যাদি। অস্থায়ী প্রজা ও ভাগচাষের প্রজা যে ছিল, তাহা তো ভূমি-বিন্যাস অধ্যায়েই আমরা দেখিয়াছি। উন্নত সমাজাধিকার বা উৎপাদন ও বণ্টন-কর্তৃত্ব যে ইহাদের নাই তাহা বর্ণ-বিন্যাসের স্তর হইতেও কতকটা অনুমান করা যায়। ইহাদেরই অববাহিত উপরের স্তরে ক্ষুদ্র ভূম্যধিকারী, ভূমিস্বত্ববান কৃষক বা ক্ষেত্রকর, শিল্পী, ব্যবসায়ী, করণ-কায়স্থ বৈদ্যাক-গোপ -যুদ্ধ-চারণ প্রভৃতি বৃত্তিধারী বিভিন্ন লোক লইয়া একটি বৃহৎ মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের পরিচয়ও বৃহদ্ধর্মপুরাণ ও ব্ৰহ্মবৈবর্তপুরাণের বর্ণতালিকার মধ্যে ধরিতে পারা কঠিন নয়। তাহা ছাড়া, শিক্ষাদীক্ষা-ধৰ্মকর্মবৃত্তিধারী ব্ৰাহ্মণ ও বৌদ্ধ যতি সম্প্রদায় তো ছিলেনই।
০৪. বিবর্তন ও পরিণতি, রাজপাদোপজীবী শ্রেণী
এই বিশ্লেষণের ফলে কী পাওয়া গেল, তাহা এইবার দেখা যাইতে পারে। রাজপুরুষদের লইয়াই আরম্ভ করা যাক। পঞ্চম হইতে সপ্তম শতক পর্যন্ত লিপিগুলিতে দেখিয়াছি, বিভিন্ন রাজপুরুষদের উল্লেখ আছে। মহারাজাধিরাজের অধীনে রাজা, রাজক, রাজনক-রাজন্যক, সামন্ত-মহাসামন্ত, মাণ্ডলিক-মহামাণ্ডলিক, এই সব লইয়া যে অনন্ত সামন্তচক্র ইহারাও রাজপদোপজীবী। রাজা-রাজনক-রাজপুত্র হইতে আরম্ভ করিয়া তরিক-শোন্ধিক -গৌলিক প্রভৃতি নিম্নস্তরের রাজকর্মচারী পর্যন্ত সকলের উল্লেখই শুধু নয়, তাহাদের সকলকে একত্রে একমালায় গাথিয়া বলা হইয়াছে “রাজ্যপাদোপজীবীনঃ”, এবং সুদীর্ঘ তালিকায়ও যখন সমস্ত রাজপুরুষের নাম শেষ হয় নাই, তখন তাহার পরই বলা হইয়াছে “অধ্যক্ষপ্রচারোক্তানিহকীর্তিতান”, অর্থাৎ আর যাঁহাদের কথা এখানে কীর্তিত বা উল্লিখিত হয়। নাই। কিন্তু তাহাদের নাম (অর্থশাস্ত্ৰ জাতীয় গ্রন্থের) অধ্যক্ষ পরিচ্ছেদে উল্লিখিত আছে। এই-যে সমস্ত রাজপুরুষকে একসঙ্গে গাথিয়া একটি সীমিত শ্রেণীতে উল্লেখ করা, তাহা পাল আমলেই যেন প্রথম আরম্ভ হইল; অথচ আগেও রাজপুরুষ, রাজপাদোপজীবীরা ছিলেন না, তাহা তো নয়। বোধ হয়, এইরূপভাবে উল্লেখের কারণ আছে। মোটামুটি সপ্তম শতকের সূচনা হইতে গৌড় স্বাধীন, স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় সত্তা লাভ করে; বঙ্গ এই সত্তার পরিচয় পাইয়াছিল। ষষ্ঠ শতকের তৃতীয় পাদ হইতে। যাহা হউক, সপ্তম শতকেই সর্বপ্রথম বাঙলাদেশ নিজস্ব রাষ্ট্র লাভ করিল, নিজস্ব শাসনতন্ত্র গড়িয়া তুলিল। গৌড় ও কর্ণসুবর্ণাধীপ শশাঙ্ককে আশ্রয় করিয়াই তাহার সূচনা দেখা গেল; কিন্তু তাহা স্বল্পকালের জন্য মাত্র। কারণ, তাহার পরই অর্ধ শতাব্দীরও অধিককাল ধরিয়া সমস্ত দেশ জুড়িয়া রাষ্ট্ৰীয় আবর্ত, মাৎস্যন্যায়ের উৎপীড়ন। এই মাৎস্যন্যায় পর্বের পর পাল রাষ্ট্র ও পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙলাদেশ আবার আত্মসম্বিৎ ফিরিয়া পাইল, নিজের রাষ্ট্র ও রাজ্য লাভ করিল, রাষ্ট্ৰীয় স্বােজাত্য ফিরিয়া পাইল, এবং পাইল পূর্ণতর বৃহত্তর রূপে। মর্যাদায় ও আয়তনে, শক্তিতে ও ঐক্যবোধে বাঙলাদেশ নিজের এই পূর্ণতর বৃহত্তর রূপ আগে কখনও দেখে নাই। বোধ হয়, এই কারণেই রাষ্ট্র ও রাজপাদোপজীবীদের শুধু সবিস্তার উল্লেখই নয়, শাসনযন্ত্রের যাঁহারা পরিচালক ও সেবক, তাহারা নূতন এক মর্যাদার অধিকারী হইলেন, এবং তাহাদিগকে একত্রে গাথিয়া স্বসীমায় সুনির্দিষ্ট একটি শ্রেণীর নামকরণ করাটাও সহজ ও স্বাভাবিক হইয়া উঠিল। যাহাই হউক, সোজাসুজি রাজপাদোপজীবী অর্থাৎ সরকারী চাকুরীয়দের একটা সুস্পষ্ট শ্রেণীর খবর এই আমরা প্রথম পাইলাম।
