এই বিশ্লেষণ হইতে আমরা যাহা পাইলাম, তাহা হইতে এক শ্রেণীর লোক আমরা পাইতেছি। যাঁহারা রাজপুরুষ, রাজপ্রতিনিধি। কিন্তু লক্ষ করিবার বিষয় এই যে, কোথাও তাঁহাদের রাজপুরুষ বা রাজপ্রতিনিধি বলা হইতেছে না, এবং সেই ভাবে বিশেষ কোনও একটি শ্রেণীভুক্তও করা হইতেছে না। আর এক ধরনের লোকের উল্লেখ পাইতেছি, যাঁহারা বিশেষ প্রয়োজনে আহূত হইলে রাষ্ট্রব্যাপারে রাজপুরুষদের সহায়তা করিয়া থাকেন, ইহাদিগকে কোথাও ব্যবহারিণঃ, কোথাও সংব্যবহারিণঃ, বিষয়ব্যবহারিণঃ, প্রধান-ব্যবহারিণঃ ইত্যাদি বলা হইয়াছে। ইহাদের বৃত্তি কী ছিল, আমরা জানি না; তবে ইহাই অনুমেয় যে, নানা বৃত্তির প্রধান প্রধান লোকেদেরই আহ্বান করা হইত; বিষয় বা অধিষ্ঠান-অধিকরণের সভ্য, নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম সাৰ্থবাহ, প্রথম কুলিক, ইহারাও সেই হিসাবে সংব্যবহারী এবং কোনও কোনও পট্টোলীতে তাহারাও এই আখ্যায়ই উল্লিখিত হইয়াছেন। মহত্তর অর্থাৎ প্রধান প্রধান সম্পন্ন গৃহস্থ, কুটুম্ব অর্থাৎ সাধারণ গৃহস্থ, (তাহারা বিষয়েরই হোন বা গ্রামেরই হোন বা জনপদেরই হোন), অক্ষুদ্র প্রকৃতি বা শুধু প্রকৃতি অর্থাৎ প্রধান প্রধান অধিবাসী অথবা সাধারণ অধিবাসী প্রভৃতি যাঁহাদের উল্লেখ পাইতেছি, তাহাদের কাহার কী বৃত্তি ছিল অনুমানের উপায় থাকিলেও সুনির্দিষ্টভাবে বলিবার উপায় নাই, কিংবা ইহারা কে কোন শ্রেণীর লোক, তাহাও জানা যায় না। তবে, রাজপুত্র ও রাজপ্রতিনিধি ছাড়া এমন কতকগুলি ব্যক্তির খবর পাওয়া গেল যাঁহাদের বৃত্তি সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নাই, যেমন নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম সার্থিবাহ ও প্রথম কুলিক। ইহাদের কথা আগেই বলিয়াছি। যে-ভাবে ইহাদের উল্লেখ পাইতেছি, তাহাতে ইহারা যে এক-একটি বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর প্রতিভূ তাহা বুঝা যাইতেছে, এবং তাহা সমর্থিত হইতেছে গোপচন্দ্রের একটি পট্টোলীতে ‘প্রধান-ব্যাপরিণঃ’ বা প্রধান প্রধান ব্যবসায়ীদের উল্লেখ দ্বারা। রাজপুরুষ ও এই বণিক-ব্যবসায়ী-শিল্পীশ্রেণী ছাড়া আর একটি শ্রেণীর পরোক্ষ উল্লেখও আছে; সেটি ব্রাহ্মণদের। ইহাদের বৃত্তি কী ছিল, তাহাও সহজেই অনুমেয়; পূজা, ধর্মকর্ম ইত্যাদির জন্যই তো ইহারা ভূমিদানি গ্রহণ করিতেছেন। অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনাও ইহাদের অন্যতম বৃত্তি ছিল। অবশ্য, ইহাদের মধ্যে অনেকে রাজপুরুষের বৃত্তি কিংবা অন্যান্য বৃত্তিও গ্রহণ করিতেন, লিপিগুলিতে তাহার প্রমাণও আছে, কিন্তু তাহা ব্যতিক্রম মাত্র; সাধারণ ভাবে এই সব বৃত্তি র্তাহাদের ছিল না। এবং সর্বদাই লিপিগুলিতে তাহারা পৃথকভাবে বর্ণবদ্ধ শ্রেণী হিসাবেই উল্লিখিত হইয়াছেন। এইবার অষ্টম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত লিপিগুলি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই দুই পর্বের, অর্থাৎ পঞ্চম হইতে অষ্টম, এবং অষ্টম হইতে ত্ৰয়োদশ শতকের লিপিগুলির স্বরূপের মধ্যে পার্থক্য কোথায়, তাহা আগেই ইঙ্গিত করিয়াছি। এখানে পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।
ধর্মপালের খালিমপুর-শাসনে দেখিতেছি, নরপতি ধর্মপাল দুইটি গ্রাম দান করিতেছেন। দানের প্রার্থনা জানাইতেছেন মহাসামন্তাধিপতি শ্ৰীনারায়ণ বৰ্মা; দানের হেতু হইতেছে নারায়ণ বর্মী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নারায়ণবিগ্রহের পূজা এবং বিগ্রহের পূজারী লাট (গুজরাট) দেশীয় ব্ৰাহ্মণদের এবং মন্দির-ভৃত্যদের ব্যবহার। যাহাই হউক, এই দান এইভাবে বিজ্ঞাপিত করা হইতেছ :
“এযু চতুৰ্ম্ম গ্রামেষু সমুপগতান সর্বানের রাজ-রাজনক – রাজপুত্র – রাজামাত্য – সেনাপতি – বিষয়পতি – ভোগপতি – ষষ্ঠাধিকৃত – দণ্ডশক্তি – দণ্ডপশিক – চৌরোদ্ধরণিক – দৌঃসাধসাধনিক – দূতখেলে – সমাগামিকা – ভিত্বরমাণ – হস্তাশ্ব – গোমহিষাজবিকাধ্যক্ষ’ – নাকাধ্যক্ষ – বলাধ্যক্ষ – তরিক – শৌল্কিক – গৌল্মিক – তদাযুক্তক – বিনিয়ুক্তকাদি রাজপাদোপজীবিনোহন্যাংশ্চাকীর্ত্তিতান্ চাটভাটজাতীয়ান্ যথাকলোধ্যাসিনো জ্যেষ্ঠকায়স্থ-মহামহত্তর – দাশগ্রামিকান্দি-বিষয়ব্যবহারিণঃ সকরুণান প্রতিবাসিনঃ ক্ষেত্ৰকারাংশ্চ ব্রাহ্মণ্যমাননাপূর্বকং যথাৰ্থং মািনয়তি বোধয়তি সমাজ্ঞাপয়তি চ।”
এই সূত্রটি খালিমপুর-লিপিতে প্রথম পাইলাম। ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ভূমিদানের যত পট্টোলী আছে, তাহার প্রায় সবটিতেই এই ধরনের একটি সূত্র উল্লিখিত আছে; প্রভেদের মধ্যে দেখা যায়, কোথাও রাজপুরুষদের তালিকাটি সংক্ষিপ্ত, কোথাও বিস্তৃততর। এই বিস্তৃততর তালিকার আর উল্লেখ করিয়া লাভ নাই; তবে একটু আধটু নূতন সংযোজনা কোথাও কোথাও আছে, সেগুলি আমাদের কাজে লাগিবার সম্ভাবনা আছে। কাজেই, যেখানে এই ধরনের নূতন সংযোজনা পাওয়া যাইবে, তাহাদের উল্লেখ করা প্রয়োজন।
দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যাইতে পারে, দেবপালের মুঙ্গেরী-লিপিতে রাজ্যপাদোপজীবীদের (এ ক্ষেত্রে বলা হইয়াছে, স্বাপদপদ্মোপজীবীনঃ) তালিকায় চাটভাটজাতীয় সেবকদের সঙ্গে উল্লেখ করা হইতেছে-“গৌড়-মালব – খস-হূণ – কুলিক-কর্ণাট – লাট-চাটভাট – সেবকদৌন – অন্যাংশ্চকীর্তিতান”; এবং প্রতিবাসী ও ব্রাহ্মণোত্তরদের সঙ্গে উল্লেখ করা হইতেছে — “মহত্তর-কুটুম্বি -পুরোগমেদানপ্রকচণ্ডালপর্যন্তান”। নারায়ণপালের ভাগলপুর-লিপিতেও ঠিক এই ধরনের উল্লেখ আছে। বস্তুত, পালরাজাদের সমস্ত লিপিই এইরূপ। শুধু গৌড়-মালব-খস-তুণ প্রভৃতিদের সঙ্গে কোথাও কোথাও চোড়দেরও (মদনপালের মনহলি-লিপি দ্রষ্টব্য) উল্লেখ আছে। চাটভাটদের জায়গায় চট্টভট্ট অথবা চাটভটদের উল্লেখ পাওয়া যায়; বৈদ্যদেবের কমৌলি-লিপিতে “ক্ষেত্রকরণ”-এর পরিবর্তে পাওয়া যায় “কর্ষকান্”। কিন্তু দশম শতকের কম্বোজরাজ নয়পালদেবের ইর্দা-পট্টোলীতে বিজ্ঞাপিত ব্যক্তিদের নামের তালিকা একটু অন্যরূপ। এখানে উল্লেখ পাইতেছি, স্থানীয় “সকরণান ব্যবহারিণঃ”দের (কেরানিকুল সহ অন্যান্য রাষ্ট্রসহায়কদের), কৃষক ও কুটুম্বদিগকে এবং ব্ৰাহ্মণদের। অন্যত্র যেমন, এখানেও তাঁহাই; ব্রাহ্মণদের যে বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে ঠিক তাহা নয়, তাহাদের সম্মান জ্ঞাপনের পর (মাননাপূর্বকং) অন্যদের বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে। আর, রাজমহিষী, যুবরাজ, মন্ত্রী, পুরোহিত, ঋত্বিক, প্রদেষ্টবৰ্গ, সকল শাসনাধ্যক্ষ, করণ (বা কেরানি), সেনাপতি, সৈনিক সংঘমুখ্য, দূতবর্গ, গৃঢ়পুরুষবর্গ, মন্ত্রপালবৰ্গ এবং অন্যান্য রাজকর্মচারীদের বলা হইতেছে এই দান মান্য করিবার জন্য।
