পঞ্চম হইতে সপ্তম শতক পর্যন্ত বাঙলাদেশ-সংক্রান্ত পট্টোলীগুলি সমস্তই ভূমি দান-বিক্রয়ের দলিল। এই পট্টোলীগুলির মধ্যে আমরা শ্রেণী-সংবাদ যে খুব বেশি পাইতেছি, তাহা নয়; তবে দুইটি শ্রেণী বেশ পরিষ্কার হইয়া উঠিতেছে, এ কথা সহজেই বলা চলে, একটি রাজপুরুষ শ্রেণী, আর একটি বণিক-ব্যবসায়ী শ্রেণী। তাহা ছাড়া, মহত্তরাঃ, ব্ৰাহ্মণাঃ, কুটুম্বিনঃ, ব্যবহারিণঃ প্রভৃতি, এবং সাধারণ ভাবে “অক্ষুদ্র প্রকৃতি’ অর্থাৎ গণ্যমান্য জনসাধারণের সঙ্গেও আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে। ব্ৰাহ্মণদের বৃত্তি কী ছিল, তাহা সহজেই অনুমেয়। মহত্তর (মহতর=মাহাতো = মাতব্বর লোক, অর্থাৎ সম্পন্ন গৃহস্থ), কুটুম্ব (অর্থাৎ গ্রামবাসী সাধারণ গৃহস্থ) এবং ‘অক্ষুদ্র প্রকৃতি’ জনসাধারণ কিংবা যে সমস্ত সদব্যবহারী’ কোনও বিশেষ প্রয়োজনে নিজেদের মতামত দিবার জন্য স্থানীয় অধিকরণের (তথা রাষ্ট্রের) সাহায্য-নিমিত্ত আহুত হইতেন, তাহাদের বৃত্তি কী ছিল, তাঁহারা কোন শ্রেণীর পর্যায়ভুক্ত ছিলেন, এ-সম্বন্ধে সুস্পষ্ট কোনও আভাস এই লিপিগুলিতে পাওয়া না গেলেও অনুমান করা খুব কঠিন নয়। ভূমি দান-বিক্রয় উপলক্ষে যাঁহাদের সাহায্যের প্রয়োজন হইতেছে, যাঁহাদের এই দান-বিক্রয় বিজ্ঞাপিত করা প্রয়োজন হইতেছে, তাহাদের মধ্যে শ্রেণী হিসাবে কোনও শ্রেণীর উল্লেখ নাই; তবে যাঁহারা এই ব্যাপারে প্রধান তাহদের মধ্যে রাজপুরুষশ্রেণী এবং বণিক-ব্যবসায়ীশ্রেণীর লোকেদেরই নিঃসংশয় উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। অন্য যাঁহাদের উল্লেখ আছে, তাহারা কোনও সুনির্দিষ্ট শ্রেণী:পর্যায়ভুক্ত বলিয়া উল্লিখিত হন নাই, কিন্তু উল্লেখের রীতি দেখিয়া মনে হয়, শ্রেণীর ইঙ্গিত বর্তমান। সঙ্গে সঙ্গে ইহাও মনে রাখা দরকার যে, রাজপুরুষদের উল্লেখ তাহাদিগের অধিকৃত পদমর্যাদার জন্যই। সুস্পষ্ট সীমারেখায় আবদ্ধ একটি বিশেষ শ্রেণীভুক্ত করিয়া তাহাদিগকে উল্লেখ করা হইতেছে না; তেমন উল্লেখের প্রয়োজনও হয় নাই।
অষ্টম শতক হইতে ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত লিপিগুলির স্বরূপ একটু ভিন্ন প্রকারের। এইগুলি সবই ভূমিদানের দলিল। পঞ্চম হইতে সপ্তম শতকের দলিলগুলিতে ভূমি কী ভাবে বিক্ৰীত হইতেছে, এবং পরে কী ভাবে দান করা হইতেছে, তাহার ক্রমের সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। অষ্টম শতক-পরবর্তী দলিলগুলিতে ভূমি ক্ৰয়ের যে ক্রম তাহা আমাদের দৃষ্টির বাহিরে; আমরা শুধু দেখি, রাজা ভূমি দান করিতেছেন, এবং সেই ভূমিদানি বিজ্ঞাপিত করিতেছেন। এই বিজ্ঞাপন যাঁহাদের নিকট করা হইতেছে, তাহাদের উপলক্ষ করিয়া সমসাময়িক প্রায় সমস্ত শ্রেণীর লোকেদের কথাই উল্লিখিত হইয়াছে। র্যাহাদিগকে বিজ্ঞাপিত করার কোনও প্রয়োজনীয়তা দেখা যায় না, তাহাদেরও জানানো হইতেছে; যেমন, যে-গ্রামে ভূমিদান করা হইতেছে, সেই গ্রামের এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের সমস্ত শ্রেণীর লোকেদের নিশ্চয়ই জানানো প্রয়োজন, সেই গ্রাম যে বীথী বা মণ্ডল বা বিষয় বা ভুক্তিতে অবস্থিত তাহার রাজপুরুষদের জানানো প্রয়োজন, কিন্তু রাজনক, রাজপুত্র, রাজমাতা, সেনাপতি ইত্যাদি সকল রাজপুরুষদের জানাইবার কোনও প্রয়োজন বাস্তবক্ষেত্রে আছে বলিয়া তো মনে হয় না। কিংবা মালব, খস, কুণ, কর্ণাট, লাট ইত্যাদি ভিনদেশাগত বেতনভোগী সৈন্যদের বিজ্ঞাপিত করিবার কারণও কিছু বুঝা যায় না। পঞ্চম হইতে সপ্তম শতক পর্যন্ত লিপিগুলিতে এই ধরনের সর্বশ্রেণীর, সকল বৃত্তিধারী লোকের উল্লেখ নাই; সেখানে যে-বিষয়ে অথবা মণ্ডলে ভূমি দান-বিক্রয় করা হইতেছে, সেই বিষয়ের অথবা মণ্ডলের রাজপুরুষ, বণিক ও ব্যবসায়ী, মহত্তর, ব্ৰাহ্মণ, কুটুম্ব ইত্যাদির বাহিরে আর কাহারও উল্লেখ করা হইতেছে না।
০৩. উপাদান বিশ্লেষণ
এইবার একে একে লিপিগুলি বিশ্লেষণ করিয়া দেখা যাক প্রাচীন বাঙলার শ্রেণী বিভাগের চেহারাটা ধরিতে পারা যায় কিনা। বলা বাহুল্য, পঞ্চম শতকের পূর্বে এ বিষয়ে স্থির করিয়া কিছু বলিবার উপায় আমাদের নাই।
প্রথম কুমারগুপ্তের ধনাইদহ (৪৩২-৩৩ খ্রী) লিপিতে দেখিতেছি, ভূমি-বিক্রয়ের ব্যাপারটি বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে গ্রামের কুটুম্ব, অর্থাৎ অন্যান্য গৃহস্থদের, ব্রাহ্মণদের এবং মহত্তর অর্থাৎ প্রধান প্রধান ব্যক্তিদের; বিজ্ঞাপন দিতেছেন। একজন রাজপুরুষ; এই সম্রাটের ১নং দামোদরপুর-লিপিতে (৪৪৩-৪৪ খ্ৰী) রাজপুরুষ হইতেছেন কোটিবর্ষ বিষয়ের বিষয়পতি কুমারামাত্য বেত্ৰিবৰ্মা এবং ভূমি-রিক্রয় ব্যাপারে তাহার সহায়ক ও পরামর্শদাতা হইতেছেন। নগরশ্ৰেষ্ঠী, প্রথম সার্থিবাহ, প্রথম কুলিক এবং প্রথম বা জ্যেষ্ঠ কায়স্থ। ইহারা সকলেই অবশ্য রাজপুরুষ নহেন; প্রথম কায়স্থ খুব সম্ভব। একজন রাজপুরুষ; বাকী তিনজনের দুই জন বণিক ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের এবং একজন শিল্পীশ্রেণীর প্রতিনিধি। কয়েকজন পুস্তপালের উল্লেখ আছে, ইহারাও রাজপুরুষ। বৈগ্রাম পট্টোলী (৪৪৭-৪৮ খ্রী) মতে কুমারামাত্য কুলবৃদ্ধি ছিলেন পঞ্চনগরী বিষয়ের বিষয়পতি; কিন্তু এক্ষেত্রে তাহার সহায়ক নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম সার্থিবাহ, প্রথম কুলিক অথবা প্রথম কায়স্থের সাক্ষাৎ পাইতেছি না; পরিবর্তে ভূমি-বিক্রয়ের ব্যাপারটি যেখানে জানানো হইতেছে, সেখানে বিষয়াধিকরণকেও জানাইবার ইঙ্গিত আছে। অন্যান্য সমসাময়িক লিপি হইতে আমরা জানি যে, পূর্বোল্লিখিত নগরশ্ৰেষ্ঠী, প্রথম সাৰ্থবাহ, প্রথম কুলিক এবং প্রথম বা জ্যেষ্ঠ কায়স্থ, ইহারাই বিষয়াধিকরণ গঠন করিতেন। ইহাদের ছাড়া বিক্ৰীত ভূমিসম্পূক্ত দুই গ্রামের কুটুম্ব, ব্ৰাহ্মণ ও সংব্যবহারীদিগকেও বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হইতেছে। এই সংব্যবহারীরা বিষয়, মণ্ডল বা গ্রামের রাজপ্রতিনিধির সহায়ক, কিন্তু রাজপুরুষ ঠিক নহেন। কোনও বিশেষ কারণে বা উপলক্ষে প্রয়োজন হইলে ইহারা আহত হন এবং স্থানীয় রাজপ্রতিনিধিকে সাহায্য করেন। ২নং দামোদরপুর-লিপির সাক্ষ্য (৪৪৭-৪৮ খ্ৰী) প্রথম কুমারগুপ্তের ১নং দামোদরপুর-লিপিরই অনুরূপ। পাহাড়পুর পট্টোলীতেও (৪৭৮-৭৯ খ্রী) আয়ুক্তক ও পুস্তপালের উল্লেখ পাইতেছি, অধিষ্ঠানাধিকরণের উল্লেখও আছে এবং ভূমি মাপিয়া সীমা ঠিক করিয়া দিতে বলা হইয়াছে গ্রামের ব্রাহ্মণ, মহত্তর ও কুটুম্বদিগকে। ৩নং ও ৪নং দামোদরপুর-লিপির (৪৮২-৮৩ খ্ৰী দ্বিতীয়টির তারিখ অজ্ঞাত) সাক্ষ্যও এইরূপই। বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর-লিপিতে (৫০৭-৮ খ্ৰী) পঞ্চাধিকরণোপরিক, পুরপালো পরিক, সন্ধিবিগ্ৰহাধিকরণ, কায়স্থ ইত্যাদি রাজপুরুষদের উল্লেখ দেখিতেছি; অন্য কোনও শ্রেণীর লোকেদের উল্লেখ নাই। দত্ত ভূমি কোনও ব্যক্তিবিশেষ ক্রয় করিয়া পরে দান করিতেছেন কি না, সে-খবর উল্লিখিত অন্যান্য লিপিগুলিতে যেমন আছে, এই লিপিটিতে তেমন নাই; শুধু আছে, জনৈক মহারাজ রুদ্রদত্তের অনুরোধে মহারাজ বৈন্যগুপ্ত শাসন-নির্দিষ্ট ভূমি দান করিতেছেন। পরবর্তী শতকে ত্রিপুরায় প্রাপ্ত লোকনাথের পট্টোলীও ঠিক গুণাইঘর-লিপিরই অনুরূপ। ঠিক এই ক্রমটি দেখা যায় পাল ও সেন-যুগের লিপিগুলিতে। গুপ্তযুগের লিপিগুলি একটু অন্যরূপ; সেখানে কোনও ব্যক্তিবিশেষ রাজসরকারের নিকট হইতে ভূমি কিনিয়া দান করিতেছেন এবং সেক্ষেত্রে রাজসরকারের অর্থলাভ এবং পুণ্যলাভ দুইই হইতেছে (বৈগ্রাম-লিপি ও পাহাড়পুর-লিপি দ্রষ্টব্য; “…অর্থেপচয়ো ধৰ্ম্মষড়ভাগাপ্যায়নঞ্চ ভবতি”– পাহাড়পুর-লিপি)। পাল ও সেন যুগে দানটা কিন্তু করিতেছেন রাজা স্বয়ং, কোনও ব্যক্তিবিশেষের অনুরোধে (ধর্মপালের খালিমপুর-লিপি এবং দামোদর দেবের চট্টগ্রাম-পট্টোলী = দ্রষ্টব্য)। যাহাই হউক, গুণাইঘর-লিপি এবং সপ্তম শতকের লোকনাথের লিপি, ইহাদের উভয়েরই ধারাটা যেন। পরবর্তী পাল ও সেন আমলের; গুপ্ত আমলের অন্যান্য লিপি-নির্দিষ্টরা যেন নয়! গোপচন্দ্রের মল্লসরুল-লিপি সম্বন্ধেও মোটামুটি একই কথা বলা যাইতে পারে।।হাই হউক, গুপ্ত আমলের লিপিগুলিতে আবার ফিরিয়া যাওয়া যাক। দামোদরপুরের ৫নং লিপি বক্ষ্যমাণ বিষয়ের সাক্ষ্য ব্যাপারে এই-স্থানে প্রাপ্ত অন্যান্য লিপির অনুরূপ। ফরিদপুরের ধর্মাদিত্য গোপচন্দ্র ও সমাচারদেব প্রভৃতির তাম্রপট্টোলীর সাক্ষ্য একটু অন্য প্রকার। ধর্মাদিত্যের ১নং শাসনে ভূমি-ক্রয়েচ্ছা জ্ঞাপন করা হইতেছে বিষয়-মহত্তরদিগকে, অর্থাৎ বিষয়ের প্রধান প্রধান লোকেদের এবং অন্যান্য সাধারণ লোকেদের গ্রামীয় ভূমির দান-বিক্রয়ের খবর দেওয়া হইল। ধর্মাদিত্যের ২নং লিপিতে নূতন খবর কিছু নাই। গোপচন্দ্রের লিপিতে বিজ্ঞাপিত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রধানব্যাপারিণঃ অর্থাৎ স্থানীয় প্রধান ব্যাপারীদের উল্লেখ আছে। সমাচারদেবের ঘুঘরাহাটি পট্টোলীতে নূতন খবর কিছু নাই। জয়নাগের বপ্যঘোষবাট পট্টোলীতেও তাঁহাই। লোকনাথের ত্রিপুরা-লিপিতে রাজপুরুষদের ছাড়া বিজ্ঞাপিত ব্যক্তিদের মধ্যে ‘সপ্রধান-ব্যবহারিজনপদান’ অর্থাৎ স্থানীয় প্রধান ব্যবহারী ও জনপদদের নাম করা হইতেছে। অষ্টম শতকের খড়গবংশীয় দেবখড়েগর আস্রফপুর-পট্টোলীতে বিষয়পতিদের সঙ্গে সঙ্গে কুটুম্ব-গৃহস্থাদিগকেও বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে।
