কিন্তু, সমাজে এমন বহু লোক বাস করেন যাঁহারা ধন উৎপাদন করেন না, বণ্টনের অধিকারও যাহাদের নাই। ধন উৎপাদন ও বণ্টন ছাড়াও সমাজের অনেক কর্তব্য আছে যাহা সমাজের পক্ষে একান্ত প্রয়োজনীয় এবং কল্যাণকর। এই সব কর্তব্যের তালিকা সুদীর্ঘ; ইহাদের একপ্রান্তে যেমন মিলিবে জ্ঞান-বিজ্ঞান, ধর্মকর্ম, শিল্পকলা, ভাষা-সাহিত্য, এক কথায় সমাজের মানস-জীবনের নায়কদের, শিক্ষা ও ধর্মজীবীদের, তেমনই অন্যপ্রান্তে পাওয়া যাইবে সমাজের অঙ্গ-নিৰ্গত আবর্জনা-পরিষ্কারক রাজক-চণ্ডাল-বাউড়ী-পোদ-বাগদী ইত্যাদিদের। এইখানেই আসিয়া পড়ে সমাজের বর্ণ-বিন্যাসের কথা, এবং শ্রেণী-বিন্যাসের সঙ্গে তাহা জড়াইয়া যায়। বস্তুত, ভারতীয় সমাজে বর্ণ ও শ্রেণী অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, একটিকে আর একটি হইতে পৃথক করিয়া দেখিবার উপায় নাই; বাঙলাদেশেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। বর্ণ-বিন্যাস অধ্যায়ে দেখা গিয়াছে, বৃত্তি বা জীবিকা বর্ণনির্ভর, এবং বর্ণ জন্মনির্ভর। বিশেষ বর্ণের কেহ নির্ধারিত বৃত্তির সীমা অতিক্রম করিতেন না। এমন নয়, কিন্তু তাহা সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম; অধিকাংশ লোক নিজ নিজ বৃত্তিসীমা রক্ষা করিয়াই চলিতেন। ব্রাহ্মণ হইতে আরম্ভ করিয়া অস্ত্যজ চণ্ডাল পর্যন্ত অগণিত স্তরের অগণিত বৃত্তি এবং বৃত্তি অনুযায়ী যেমন বর্ণের সামাজিক মর্যাদা, তেমনই বর্ণনুযায়ী বৃত্তির নির্দেশ। বৃত্তি বা জীবিকা যেখানে বর্ণ অনুযায়ী সেখানে বর্ণ ও শ্রেণী একে অন্যের সঙ্গে জড়াইয়া থাকিবে, ইহা কিছু বিচিত্র নয়, এবং শ্রেণীর মর্যাদাও সেই সমাজে বর্ণ ও বৃত্তি অনুযায়ী হইবে তাহাও বিচিত্র নয়। উৎপাদিত ধন উৎপাদক ও বণ্টকেরা তো ভোগ করিতেনই, বিশেষভাবে করিতেন উৎপাদন ও বণ্টন যাঁহারা নিয়ন্ত্ৰণ করিতেন তাহারা, যাঁহারা তাঁহাদের সহায়ক ও সমর্থক ছিলেন তাঁহারা, এবং সমাজের অন্যান্য বিচিত্র কর্তব্যে যাঁহারা নিয়োজিত ছিলেন তাঁহারাও। সমানাধিকারবাদের স্বীকৃতি যখন ছিল না, তখন সকলে সমভাবে সামাজিক ধন ভোগ করিতে পাইতেন না, তাহাও স্বাভাবিক। তাহার উপর এই বণ্টন আবার নিয়মিত হইত বর্ণ ও বৃত্তির মর্যাদানুযায়ী; কাজেই, ধনোৎপাদনের প্রধান তিন উপায়ানুযায়ী তিনটি শ্রেণী ছাড়া আরও অনেক অর্থনৈতিক শ্রেণী থাকিবে ইহা অস্বাভাবিক নয়।
সব শ্রেণী-উপশ্রেণী একসঙ্গে গড়িয়া উঠিয়াছিল এমন মনে করিবার কারণ নাই; সমাজের গঠন-বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে, সমাজকর্মের জটিলতা ও কর্মবিভাগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শ্রেণী-উপশ্রেণীর সংখ্যা বাড়িয়াছে, ইহাই যুক্তিসঙ্গত অনুমান। তবে, এই অনুমান অনেকটা নিঃসংশয়ে করা চলে যে, খ্ৰীষ্টপূর্ব শতকগুলিতেই ধনাগমের পূর্বোক্ত তিন প্রধান উপায় অবলম্বন করিয়া তিনটি প্রধান শ্রেণী প্রাচীন বাঙলায় গড়িয়া উঠিয়াছিল। সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নাই, কিন্তু ষষ্ঠ-পঞ্চম-চতুর্থ খ্ৰীষ্টপূর্ব শতকগুলিতে প্রতিবেশী অঙ্গ-মগধের সাক্ষ্য যদি আংশিকতও পুণ্ড্র-রাঢ়-সুহ্ম-বঙ্গ সম্বন্ধে প্রযোজ্য হয়, এবং এই সব জনপদের কৃষি-শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি সম্বন্ধে যদি সমসাময়িক সাক্ষ্য প্রমাণিক হয়, তাহা হইলে এই অনুমান অস্বীকার করা যায় না। তবে খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চম শতক হইতেই এ-বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়; তাহার আগে সবটাই অনুমান। পঞ্চম শতক-পরবর্তী বাঙলার লিপিমালা পূর্বোক্ত অনুমান সমর্থন করে এবং সদ্যকথিত তিনটি ও অন্যান্য শ্রেণীগুলি যে তাহার আগেই তাহাড়ের বিশেষ বিশেষ বৃত্তি লইয়া কোথাও অস্পষ্ট, কোথাও সুস্পষ্ট সীমারেখায় বিভক্ত হইয়া গিয়াছিল, ইহার কিছু কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। কিন্তু সে-কথা বলিবার আগে শ্রেণী-বিন্যাস সংক্রান্ত উপকরণগুলি সম্বন্ধে দু’একটি কথা বলিয়া লওয়া প্রয়োজন।
————————
(১) আন্নাদ্যাদেঃ সংবিভাগে ভূতেভ্যশ্চ যথার্যতঃ। ভাগবত, ৭, ১১,১০
সৰ্ব্বভুতে যথাযোগ্যভাবে অন্নাদির সম্যক বিভাগও ধর্ম। এই ভাগবতেই অন্যত্র (৭,১৪,১৮) পাইতেছি :
যাবৰ্দভিয়েত জঠরৎ তাবৎ সত্ত্বং হি দেহিনাম।
অধিকং যোহভিমন্যেত স স্তেনো দণ্ডমৰ্হতি ৷।
ক্ষুধার ও প্রয়োজনের অনুরূপ অন্ন পাওয়া দেহী মাত্রেরই অধিকার; তাহার বেশি যে অধিকার করে সে দণ্ডার্হ।
০২. উপাদান-বিবৃতি ৷। ভূমি দান-বিক্রয়ের পট্টোলী
শ্ৰেণী-বিন্যাস সম্বন্ধে আমাদের প্রধান উপকরণ ভূমিদানি-বিক্রয়ের পট্টোলী, এবং সমর্থক ও আনুষঙ্গিক উপকরণ–পাল ও সেন আমল— সমসাময়িক সাহিত্য, বিশেষভাবে বৌদ্ধ, চর্যাগীতি, বৃহদ্ধৰ্মপুরাণ, ব্ৰহ্মবৈবর্তপুরাণ ও বাঙলার স্মৃতিগ্রন্থাদি। শেষোক্ত গ্রন্থগুলি সম্বন্ধে বর্ণ-বিন্যাস অধ্যায়ে আলোচনা করা হইয়াছে। বর্তমান প্রসঙ্গে পট্টোলীগুলির স্বরূপ বিশেষভাবে জানা প্রয়োজন।
মহাস্থান শিলাখণ্ড লিপি বা চন্দ্ৰবৰ্মার শুশুনিয়া লিপি আমাদের বিশেষ কোনও কাজে লাগিতেছে না। যদি অনুমান করা যায় যে, মৌর্যকালে বাঙলাদেশ অথবা তাহার কতকাংশ মৌর্য সম্রাটদের করতলগত ছিল এবং মৌর্যশাসন-পদ্ধতি এ দেশেও প্রচলিত ছিল, তাহা হইলে ধরিয়া লাইতে হয় যে, মৌর্যরাষ্ট্রে আমরা যে-সব রাজপুরুষদের পরিচয় অশোকের লিপিমালা, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও মেগাস্থিনিসের ইণ্ডিকা-গ্রন্থ হইতে পাই, সেই সব রাজপুরুষেরা এদেশেও বিদ্যমান ছিলেন, এবং মৌর্য প্রাদেশিক-শাসনের যন্ত্র পুদনগলের (পুণ্ড্রনগরের) মহামাত্যের নির্দেশে বাঙলাদেশেও পরিচালিত হইত। কিন্তু তাহা হইলেও এই অনুমান বা প্রমাণ হইতে আমরা একমাত্র রাজপুরুষশ্রেণী বা সরকারি চাকুরীয়া ছাড়া আর কোনও শ্রেণীর খবর পাইলাম না। পরবর্তী যুগেও কতকটা তাঁহাই; উত্তর-ভারতের অন্যান্য প্রদেশের সমসাময়িক লিপিগুলি অধিকাংশই তো রাজরাজড়ার বংশপরিচয় ও যুদ্ধ-জয়বিজয়ের এবং অন্যান্য কীর্তিকলাপের বিবরণ। এই সব লিপিতেও রাজপুরুষশ্রেণী ছাড়া আর কাহারও খবর বড় একটা নাই। সমসাময়িক সংস্কৃত-সাহিত্যে, যেমন শূদ্রকের মৃচ্ছকটিকে, ভাসের দু’একটি নাটকে, কালিদাসের শকুন্তলায় পরোক্ষ ভাবে সমাজের অন্যান্য বৃত্তি ও শ্রেণীর খবরাখবর কিছু কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু তাহাও অত্যন্ত অস্পষ্ট। শুঙ্গ আমলের ভরহুত স্তুপের বেষ্টনীতে কিংবা কিছু পরবর্তী কালের সীচীর শিলালিপিগুলিতে ও মথুরায় প্রাপ্ত কোনও কোনও লিপিতে, কোনও কোনও প্রাচীন মুদ্রায়ও এই ধরনের পরোক্ষ কিছু কিছু খবর আছে; শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ীশ্রেণীর আভাস তাহাতে আছে। বস্তুত, একমাত্র জাতক-গ্ৰন্থ ছাড়া আর কোনও উপাদানের ভিতরই প্রাচীন ভারতের শ্রেণী-বিন্যাসের সুস্পষ্ট চেহারা খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। পঞ্চম শতক পর্যন্ত বাঙলাদেশের ইতিহাস সম্বন্ধেও এ কথা প্রযোজ্য। তবে, অনুমান করিয়া একটা অস্পষ্ট চেহারা আঁকিয়া লওয়া যায়। কিন্তু সে-চেষ্টা করিয়া লাভ নাই।
