যাহা হউক, এ-তথ্য সুস্পষ্ট যে, ব্ৰাহ্মণ ও করণ-কায়স্থদের প্রভাবই রাষ্ট্রে সর্বাপেক্ষা বেশি কার্যকরী ছিল। অম্বষ্ঠ-বৈদ্যদের প্রভাবও হয়তো সময়ে সময়ে কিছু কিছু ছিল; কিন্তু সর্বত্র সমভাবে ছিল এবং খুব সক্রিয় ছিল এমন মনে হয় না। বৈশ্যাবৃত্তিধারী বর্ণের লোকেরা রাষ্ট্রে অষ্টম শতক পর্যন্ত প্রভাবশালীই ছিলেন, কিন্তু পরে তাহাদের প্রভাব কমিয়া যায় এবং তাহাদের কোনও কোনও সম্প্রদায় সংশুদ্রি পর্যায় হইতেও পতিত হইয়া পড়েন। কৈবর্তদের একটি সম্প্রদায় কিছুদিন রাষ্ট্রে খুব প্রভাবশালীই ছিলেন, এবং পরেও সে-প্রভাব খুব সম্ভব অক্ষুন্ন রাখিয়াছিলেন। আর কোনও বর্ণের কোনও প্রভাব রাষ্ট্রে ছিল বলিয়া মনে হয় না।
১৩. ভাব-দৃষ্টি : বৰ্ণভেদ বিন্যাস
যে বিচিত্ৰ বৰ্ণভেদ-বিন্যাসের কথা এতক্ষণ বলিলাম, পঞ্চম শতকের পর হইতেই এই ভেদ-বিন্যাস ক্রমশ বিস্তৃত হইতে আরম্ভ করে এবং সেন-বৰ্মণ পর্বে তাহা দৃঢ় ও অনমনীয় হইয়া সমাজকে স্তরে-উপস্তরে বিভক্ত করিয়া সমগ্র সমাজ-বিন্যাস গড়িয়া তোলে। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও দেশে এমন মানুষ, এমন সাধক ছিলেন যাঁহারা মানুষে মানুষে এই ভেদ-সংঘাত অস্বীকার করিয়া তাহার উর্ধ্বে উঠিতে পারিয়াছিলেন। জাতিভেদ, বৰ্ণভেদের দুর্ভেদ্য প্রাচীর তাঁহাদের উদার সমদৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করিতে পারে নাই। সমস্ত জাত বৰ্ণ ভেদ করিয়া, তাহাকে অতিক্রম করিয়া মানুষের মানব-মহিমা ঘোষণাই ছিল তাঁহাদের অধ্যাত্মচিন্তা ও জীবন-সাধনার আদর্শ। এই আদর্শ সব চেয়ে বেশি প্রচার করিয়াছেন ভাগবতধর্মী এবং সহজযানী সাধকেরা। সমাজে তাহাদের আদর্শ কতটা অনুসৃত হইয়াছিল বলা কঠিন, খুব যে হইয়াছিল, এমন প্রমাণ নাই, কিন্তু সে আদর্শ যে অধ্যাত্মচিন্তায় এবং কিছু কিছু লোকের জীবন-সাধনার কাজে লাগিয়াছিল, সে-সম্বন্ধে সন্দেহ করা চলে না। অন্তত বিশেষ বিশেষ ধর্মগোষ্ঠীতে জাতিভেদ বর্ণভেদের কোনও বালাই-ই ছিল না, একথা মানিতেই হয়। ভাগবত তো খুব জোরের সঙ্গেই বলিয়াছেন, ভগবানের কাছে সকলেরই সমান অধিকার, এমন-কি কিরাত, হূণ, অন্ধ্র, পুলিন্দ, পুক্কশ, আভীর, সুহ্ম, যবন, খসদেরও। প্রাচীন বাঙলায় এ-কথাটা খুব ভালো করিয়া জোরের সঙ্গে বলিয়াছেন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা এবং ভবিষ্যপুরাণের ব্ৰহ্মপর্ব যদি বাঙলাদেশে রচিত হইয়া থাকে তাহা হইলে ঐ ভাবের ভাবুকেরাও। বজ্রসূচিকোপনিষৎ নামে একটি গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল বোধ হয় বাঙলাদেশেই, এবং মনে হয় এই উপনিষদটি বজ্রযানী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের রচনা। গ্রন্থটি ৯৭৩-৯৮১ খ্ৰীষ্ট তারিখে চীনা ভাষায় অনুদিত হয়। এই গ্রন্থেও প্রচণ্ড যুক্তিতর্কে জাতিভেদের যুক্তি খণ্ডন করা হইয়াছে।
সরহপাদের দোহাকোষের প্রথমেই বলা হইয়াছে, ব্ৰাহ্মণ [সহজধর্মের] রহস্য জানে না। সংস্কৃত টীকাকার বলিতেছেন, দ্বিজবর্ণের সংস্কার পালনেই যদি জাতি হয় তবে সংস্কার পালন তো সকলেরই হইতে পারে, তাহাতে জাতি সিদ্ধ হয় না— তস্মাৎ না সিধ্যতি জাতিঃ। দোহাকোষের টীকার অন্যত্র আছে, শূদ্র বা ব্ৰাহ্মণ বলিয়া বিশেষ কিছু জাতি নাই, সমস্ত লোক একই জাতিতে নিবদ্ধ, ইহাই সহজ ভাব— তয়া ন শূদ্রং ব্রাহ্মণাদি জাতি বিশেষং ভবতি সিদ্ধং। সর্বে লোকা একজাতি নিবদ্ধাশ্চ সহজমেবিতি ভাবঃ ৷ ভবিষ্যপুরাণের ব্ৰহ্মপর্বে জাতিভেদের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ যুক্তি দেওয়া হইয়াছে এবং সর্বশেষে বলা হইয়াছে, চার বর্ণই যখন এক পিতার সন্তান তখন সকলেরই একই জাতি; সব মানুষের পিতা যখন এক তখন এক পিতার সন্তানদের মধ্যে জাতিভেদ থাকিতেই পারে না। বজ্রসূচিকোপনিষদেও খুব জোরের সঙ্গে বর্ণ-ব্রাহ্মণত্বের দাবি অস্বীকার করা হইয়াছে। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের বেশির ভাগ সম্বন্ধই তো শবর-শবরী, ডোম-ডোমিনী, চণ্ডাল-চণ্ডালিনীদের সঙ্গে।
কিন্তু, এই উদার সমাদৃষ্টি ও অধ্যাত্ম-ভাবনা সামাজিকভাবে সমাজে গৃহীত হয় নাই, ব্যক্তিগত অধ্যাত্ম ও ধর্মসাধনার ক্ষেত্রেই যেন সীমাবদ্ধ ছিল। ব্যক্তিজীবনে এই উদার আদর্শের ধ্যান ও স্পর্শ অনেক মানুষকে জীবনসাধনায় অগ্রসর করিয়াছে, প্রাচীন বাঙলায় এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়। পাল-যুগে বৌদ্ধ সহজধর্মের উদার আদর্শ কিছুটা সামাজিক জীবনেও সক্রিয় ছিল, কিন্তু সাধারণভাবে আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক আচার, বিচার ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এবং সমাজ-বিন্যাসে এই উদার মানবাদর্শের স্বীকৃতি বিশেষ ছিল বলিয়া মনে হয় না।
০৭. শ্রেণী-বিন্যাস
০১. যুক্তি – শ্ৰেণী-বিন্যাস
প্রাচীন বাঙলার সমাজ যেমন বিভিন্ন বর্ণে তেমনই বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। সামাজিক ধনের উৎপাদন ও বণ্টনানুযায়ী সমাজে অর্থনৈতিক শ্রেণীর উদ্ভব ও স্তরভেদ দেখা দেয়। যে-সমাজের উৎপাদিত ধনের উপর সকলের সমান অধিকার, ব্যক্তিগত ধনাধিকার যে-সমাজে স্বীকৃত নয়, সেই সমাজে শ্রেণী-বিন্যাসের প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু, প্রাচীন বাঙলার সমাজে ব্যক্তিগত ধনাধিকার যেমন আজিকার মতোই স্বীকৃত হইত— সমগ্ৰ ভারতবর্ষেই হইত, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও হইত— তেমনই অস্বীকৃত হইত উৎপাদিত ধনের উপর সকলের সমান অধিকার। বস্তুত, বহু প্রাচীন কাল হইতেই ভারতবর্ষের অধ্যাত্মচিন্তায় অন্নের উপর সকলের সমানাধিকার, অর্থাৎ সকলেরই খাইয়া বাঁচিবার অধিকার স্বীকৃত হইলেও(১), বাস্তব দৈনন্দিন জীবনের ক্ষেত্রে সামাজিক ধনের উপর সকলের সমানাধিকার কখনও স্বীকৃত হয় নাই। বিংশ শতকের আগে মঠ-মন্দির- বিহার-সংঘারাম ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও এই স্বীকৃতি ছিল না। কৌম সমাজের ধনসাম্য-ব্যবস্থার কথা বাদ দিলে, ঐতিহাসিক পর্বে ব্যক্তিগত ধনাধিকারবাদ স্বীকৃতির উপরই ছিল প্রাচীন সমাজের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ধন উৎপাদন যাঁহারা করিতেন তাহারাই যে উৎপাদিত ধন ভোগ করিতে পারিতেন তাহা নয়। সামাজিক ধন কাহারা বেশি ভোগ করিতেন, কাহারা কম করিতেন, কাহারা কায়ক্লেশে জীবনধারণ করিতেন, কিংবা উৎপাদিত ধন একেবারেই ভোগ করিবার সুযোগ পাইতেন না, তাহা নির্ভর করিত উৎপাদিত ধনের বণ্টন ব্যবস্থার উপর। এই বণ্টন কাহারা করিতেন? প্রাচীন বাঙলায় ধনোৎপাদনের ছিল তিন উপায়— কৃষি, শিল্প ও ব্যাবসা-বাণিজ্য। কৃষি ও ব্যাবসা-বাণিজ্যই এই তিন উপায়ের মধ্যে ধনাগমের প্রধান দুই উপায় ছিল বলিয়া মনে হয়। কৃষি ভূমিনির্ভর; ভূমির ব্যক্তিগত অধিকার এবং ব্যক্তিগত অধিকারের উপর রাষ্ট্রের অধিকার প্রাচীন বাঙলায় স্বীকৃত ছিল, এ-তথ্য পূর্ববতী এক অধ্যায়ে জানা গিয়াছে। কাজেই, কৃষিদ্রব্য ক্ষেত্রকর বা কার্যকরা উৎপাদনা করিলেও বণ্টন ব্যবস্থাটা ছিল ভূম্যধিকারী এবং রাষ্ট্রের হাতে। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল বণিকদের হাতে, শিল্প ছিল শিল্পীদের হাতে; এই দুই উপায়ে উৎপাদিত অর্থের বণ্টন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ইহাদের হাতে না থাকিলেও— খানিকটা তো রাষ্ট্রের হাতে ছিলাই- অধিকাংশ ইহাদেরই করায়ত্ত ছিল। ধনোৎপাদনের তিন উপায় অবলম্বন করিয়া স্বভাবতই বাঙলায় তিনটি শ্রেণী গড়িয়া উঠিবে, ইহা কিছু আশ্চর্য নয়; এবং উৎপাদিত ও বণ্টিত ধনের তারতম্যানুযায়ী প্রত্যেক শ্রেণীতে নানা স্তর থাকিবে তাহাও আশ্চর্য নয়।
