১) ২ পাটক … ভোগ করিতেছিলেন রাজমহিষী শ্ৰীপ্ৰভাবতী।
২) ১/২ পাটক … ভোগ করিতেছিলেন শুভংসুকা নামে এক মহিলা।
৩) ১ পাটক … মিত্রাবলি নামক জনৈক ব্যক্তির ভূমি, কিন্তু ভোগ করিতেছিলেন সামন্ত বর্ণটিয়োক নামক এক ব্যক্তি।
8) ১ পাটক … ভোগ করিতেছিলেন শ্ৰীনেত্ৰভট।
৫) ১ পাটক … ভোগ করিতেছিলেন শর্বাস্তর নামক এক ব্যক্তি, কিন্তু চাষ করিতেছিলেন মহত্তর, শিখর প্রভৃতি কৰ্ষকেরা (শ্ৰীশৰ্বন্তরেণ ভুজ্যমানক মহত্তরশিখরাদিভিঃ কৃষ্যমান-[কঃ])!
৬) ১ পাটক … ভোগ করিতেছিলেন বন্দ্য জ্ঞানমতি।
৭) ১ পাটক … ভোগ করিতেছিলেন দ্রোণমথিকা নামক জনৈক ব্যক্তির ভূমি।
8) ১/২ পাটক … ভোগ করিতেছিলেন শত্রুক নামক ব্যক্তি। (ইঁহার এক পাটক ভূমির সবটুকু রাজা গ্রহণ করেন নাই; যে অর্ধপাটকে দুইটি সুপারিবাগান ছিল, সেইটুকু শুধু লইয়া দান করিয়াছিলেন)।
৯) ২০ দ্রোণবাপ অর্থাৎ ১/২ পাটক … আগে ছিল উপাসক নামক জনৈক ব্যক্তির, অধুনা ভোগ করিতেছিলেন স্বস্তিয়োক নামীয় জনৈক গৃহস্থ (অর্ধপাটক উপাসকেন ভুক্তকাধুনা স্বস্তিয়োকেন ভূজ্যমানক)।
১০) ২৭ দ্রোণবাপ … ভোগ করিতেছিলেন সুলব্ধ এবং অন্যান্য ব্যক্তিরা।
১১) ১৩ দ্রোণবাপ … চাষ করিতেছিলেন রাজদাস এবং দুগ্গট নামক দুই ব্যক্তি।
১২) ১ পাটক … [এক সময়ে] বৃহৎপরমেশ্বর নামক জনৈক ব্যক্তি দান – করিয়াছিলেন, কিন্তু কাহাকে এবং কী উদ্দেশ্যে দান করিয়াছিলেন, তাহার উল্লেখ নাই।
১৩) ১ পাটক … [এক সময়ে] শ্ৰীউদীর্ণখড়্গ দান করিয়াছিলেন এবং অধুনা ভোগ করিতেছিলেন শক্ৰক নামক জনৈক ব্যক্তি। এই শত্ৰুক এবং পূর্বোক্ত ৮ নম্বরের শক্ৰক যে একই ব্যক্তি, এই অনুমান সহজেই করা যাইতে পারে।
এই সুদীর্ঘ ও সুবিস্তৃত সাক্ষ্যপ্রমাণ হইতে ভূমি ব্যবস্থা সম্বন্ধে অনেকগুলি প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যাইতেছে। একটি একটি করিয়া তাহা উল্লেখ করা যাইতে পারে। প্রথম, রাজা যে কোনও ব্যক্তিগত সম্পত্তি তাহার ইচ্ছামত এবং প্রয়োজনমত কড়িয়া লইতে পারিতেন। ২নং পট্টোলীটিতে পরিষ্কার বলা হইয়াছে, ৬ পাটক ১০ দ্ৰোণ ভূমি ব্যক্তিগত অধিকার হইতে কাড়িয়া লইয়া (যথাভুঞ্জনাদাপনীয়) সঙ্ঘমিত্রের বিহারে দেওয়া হইতেছে। ইহার পরিবর্তে, অধিকারী ব্যক্তিদের যথােচিত মূল্য বা ক্ষতিপূরণ কিছু দেওয়া হইয়াছিল কি না, তাহার উল্লেখ লিপিতে নাই; হইলে তাহার উল্লেখ থাকাটাই বোধ হয় স্বাভাবিক ছিল। রাজা বা রাষ্ট্র যদি ভূমির মূল অধিকারী না হইতেন তাহা হইলে এই জাতীয় অধিকারের প্রয়োগ তিনি কিছুতেই করিতে পারিতেন না। দ্বিতীয়ত, মহিলারাও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগ করিতে পারিতেন (১ ও ২)। তৃতীয়ত, মধ্যস্বত্বাধিকারীর নীচে নিম্নাধিকারী প্রজার একটি স্তর ছিল (৩ ও ৫)। ইহাদের অধিকারের স্বরূপ কী ছিল বলা কঠিন। ৩ নম্বরের মিত্রাবলি ভূমিস্বত্বাধিকারী ছিলেন বুঝা যাইতেছে, কিন্তু ভূমির উপস্বত্ব বোধ হয় ভোগ করিতেছিলেন বর্ণটিয়োক। নিম্নপ্রজারূপে এ সম্পর্কে তাহার কী কী দায় ও মিত্রাবলিঙ্কে কী কী দেয় ছিল, তাহা অনুমান হয়তো করা যাইতে পারে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলিবার কোনও উপায় নাই। ৫ নম্বরের শর্বােস্তর ভূমিস্বত্বাধিকারী ছিলেন, ইহা তো পরিষ্কার, কিন্তু মহত্তর, শিখর প্রভৃতি কৃষক, যাহারা শর্বাস্তরের এক পাটক ভূমি চাষ করিতেন, তাহাদের দায় ও অধিকার কী ছিল? ইহারা কি বর্তমান কালের ভাগচাষীদের মতন ছিলেন, না কোনও প্রকার করের বিনিময়ে চাষবাস করিতেন? তবে, এইটুকু বুঝা যাইতেছে, মহত্তর, শিখর প্রভৃতি কৃষকদের সেই এক পাটক ভূমির উপর কোনও অধিকার ছিল না। চতুর্থত, ব্যক্তিগত অধিকারের ভূমি হস্তান্তরিত হইত, দানেই হউক আর বিক্ৰয়েই হউক (৯, ১২ ও ১৩)। এই হস্তান্তরের জন্য রাষ্ট্রের অনুমোদন প্রয়োজন হইত কি না, বলিবার উপায় এ ক্ষেত্রে নাই; তবে পূর্বোক্ত গোপচন্দ্রের পট্টোলীর সাক্ষ্য যদি এ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়, তাহা হইলে রাষ্ট্রানুমোদন ছাড়া এই ধরনের হস্তান্তর সম্ভব ছিল না। পঞ্চমত, একাধিক (দুই বা ততোধিক) ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে একই ভূখণ্ডের অধিকারী হইতে পারিতেন (১০ ও ১১)
অষ্টম শতক পরবর্তী পাল ও সেন আমলের লিপিগুলি এইবার বিশ্লেষণ করা যাইতে পারে। আগেই বলিয়াছি, পাল আমলের প্রায় সব লিপিই সমগ্র গ্রামদানের পট্টোলী সেন-আমলেরও কয়েকটি পট্টোলী তাঁহাই। এই গ্রামগুলির সমস্তই রাষ্ট্রের ‘খাসমহল ছিল এ অনুমান খুব স্বাভাবিক নয়; বরং ভূমির মূল অধিকারী হিসাবে রাষ্ট্র, রাজ্যের যে কোনও ভূমি, তাহা গ্রাম বা যে-কোনও ভূমিখণ্ড বা জনপদখণ্ডই হোক, দান-বিক্রয় করিতে পারিতেন, এই মন্তব্যই যুক্তিসঙ্গত, এবং দান যখন করিতেছেন, তখন সেই গ্রামবাসী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ভূসম্পত্তি যাহা আছে তাহা সমেতই দান করিতেছেন; ইহার পর রাজা বা রাষ্ট্রকে যাহা কিছু দেয়, ব্যক্তিগত ভূসম্পত্তির অধিকারীরা তাহা দানগ্রহীতাকে দিবেন, রাষ্ট্রকে আর নয়। কিন্তু এই যে রাজা ইচ্ছা! ও প্রয়োজনমত ব্যক্তিগত ভূসম্পত্তিও দান করিয়া দিতেছেন, ইহাও রাষ্ট্রের মূল অধিকারিত্বের দিকেই ইঙ্গিত করে। ভূমির অধিকার ইত্যাদি সম্বন্ধে এ পর্যন্ত যাহা বলা হইয়াছে, সেন আমলের লিপিগুলিও তাঁহাই সমর্থন করে। বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষৎ-লিপিতে একসঙ্গে এইজাতীয় অনেক তথ্য পাওয়া যায়। সেই হেতু এই লিপিটিই একটু বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করা যাইতে পারে। রাজা বিশ্বরূপসেন জনৈক আবল্লিক পণ্ডিত হলায়ুধ শৰ্মাকে ১১টি ভূখণ্ডে সর্বসুদ্ধ ৩৩৬৪ উন্মান ভূমি দান করিয়াছিলেন; এই ভূখণ্ড কয়টি হলায়ুধ শৰ্মা কর্তৃক নানা উপায়ে সংগৃহীত হইয়াছিল।
