১. দুইটি ভূখণ্ডে ৬৭ ৩/৭ উন্মান ভূমি উত্তরায়ণ সংক্রান্তি উপলক্ষে রাজা?] হলায়ুধকে দান করিয়াছিলেন।
২. ১৬৫ উন্মান ভূমি পূর্বে কোনও সময়ে হলায়ুধ কিনিয়াছিলেন। কাহার নিকট হইতে কিনিয়াছিলেন বলা হয় নাই, তবে ব্যক্তিগত ভূম্যধিকারীর নিকট হইতেই কিনিয়াছিলেন বলিয়া অনুমান করা যায়। পরে এই ১৬৫ উন্মান, এবং অন্য দুইটি ভূখণ্ডে ৫০ উন্মান। হল্যায়ুধ শৰ্মা চন্দ্ৰগ্ৰহণ উপলক্ষে রাজমাতার নিকট হইতে দান গ্ৰহণ করিয়াছিলেন।
৩. দুইটি ভূখণ্ডে ৩৫ উন্মান পূর্বে কোনও সময়ে হলায়ুধ কিনিয়াছিলেন; পরে কুমার সূর্যসেন এই ভূমিখণ্ড দুইটি জন্মদিন উপলক্ষে হলায়ুধকে দান করিয়াছিলেন।
৪. দুইটি ভূখণ্ডে ৭ উন্মান পূর্বে কোনও সময়ে হলায়ুধ কিনিয়াছিলেন; পরে সান্ধিবিগ্রহিক নাঞীসিংহ সেই ভূখণ্ড দুইটি হলায়ুধকে দান করিয়াছিলেন।
৫. ১২ ৩/৪ উন্মান হলায়ুধ শৰ্মা রাজপণ্ডিত মহেশ্বরের নিকট হইতে কিনিয়াছিলেন।
৬. ২৪ উন্মান কুমার পুরুষোত্তম সেন উত্থানদ্বাদশী তিথি উপলক্ষে হলায়ুধকে দান করিয়াছিলেন।
পূর্বোক্ত বিশ্লেষণ হইতে কয়েকটি প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাইতেছে। প্রথমত, ক্ৰীত ভূমি ও পরে কাহারও নিকট হইতে দানস্বরূপ গ্রহণ করা যাইত (২, ৩, ৪)। কী উপায়ে তাহা করা হইত লিপিতে বলা হয় নাই, তবে অনুমান হয়, হলায়ুধ কোনও সময়ে মূল্য দিয়া ভূমি কিনিয়াছিলেন, পরে দাতা ক্ৰীত ভূমির মূল্য হলায়ুধকে অর্পণ করিয়াছিলেন, এবং হলায়ুধ ক্ৰীত ভূমি দানস্বরূপ স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। দ্বিতীয়ত, এইসব ভূমি ব্যক্তিগত অধিকারেই ছিল, এবং ব্যক্তিগত অধিকারের বলেই বিক্ৰীতও হইয়াছিল (২, ৩, ৪, ৫)!! তৃতীয়ত, ভূমির ব্যক্তিগত অধিকারীরা ভূমি দানও করিতে পারিতেন এবং করিতেনও (২, ৩, ৪, ৫, ৬)। কিন্তু এই দান রাজা যে অর্থে ভূমি দান করেন, সেই অর্থে নয়; নিষ্কর করিয়া দিবার ক্ষমতা এই ব্যক্তিগত অধিকারীদের নাই, ইহারা শুধু ভূমির মধ্যস্বত্বাধিকার অর্থাৎ তাহাদের ব্যক্তিগত অধিকার দান করেন, রাজার স্বত্বাধিকার অর্থাৎ করগ্রহণের অধিকার দান করিবার ক্ষমতা ইহাদের ছিল না। সেই জন্যই হল্যায়ুধ যখন সমগ্র ৩৩৬ই উন্মান ভূমিই নিষ্কর ভাবে, কোনও দায় ঘাড়ে না লইয়া ভোগ করিতে চাহিলেন, তখন রাজার শরণাপন্ন হইলেন এবং রাজাও তাঁহাকে নিষ্কর করিয়া দিয়া সমস্ত ভূমি দান করিলেন, অর্থাৎ, হলায়ুধ শুধু তখনই রাজার ভূমিস্বত্বাধিকার লাভ করিলেন। এখানেও রাজা যে তাহার মূল অধিকার ছাড়িয়া দিলেন, এ কথা বলা যায় না। লক্ষ্মণসেনের শক্তিপুর শাসনে দেখিতেছি, সূর্যগ্ৰহণ উপলক্ষে স্নান করিয়া রাজা ব্রাহ্মণ কুবেরকে ৮৯, দ্ৰোণ ভূমি দান করিয়াছিলেন; এই সমুদয় জমির আয় ছিল ৫০০ কপর্দক পুরাণ। এই দান করা হইয়াছিল ক্ষেত্রপাটকের বিনিময়ে; কারণ শেষোক্ত গ্রামটি পিতা বল্লালসেনকর্তৃক জনৈক ব্ৰাহ্মণ হরিদাসকে দান করা হইয়াছিল। কিন্তু ভুল ধরা পড়িলে রাজা তাহা কোষস্থ অর্থাৎ বাজেয়াপ্ত করিয়াছিলেন, এবং তৎপরিবর্তে কুবেরকে উক্ত গ্রাম দান করিয়াছিলেন। লক্ষণীয় এই যে, ভুল ধরা পড়িলে রাজা দত্তভূমি রাজকোষে বাজেয়াপ্ত করিতেন। এক্ষেত্রেও ভূমির মূল অধিকার যে রাজার তাহাই যেন ইঙ্গিত।
পাল আমলের শাসনগুলিতে দেখা যাইতেছে, প্রস্তাবিত ভূমিদানের সময় রাজা স্থানীয় প্রধান প্রধান লোকদের কুটুম্ব, প্রতিবাসী, এক কথায় প্রকৃতিপুঞ্জকে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছেন, “মতমস্তু ভবাতম্”। [আমি এই ভূমি দান করিতেছি], আপনাদের সকলের অনুমোদন হউক। কেহ কেই মনে করেন, গ্রামগোষ্ঠী ভূমির মালিক ছিলেন বলিয়া রাজাকে এই ধরনের অনুমতি লইতে হইত। এ অনুমান কিছুতেই সত্য হইতে পারে না। গ্রামগোষ্ঠী ভূমির মালিক হইলে রাজা সেই ভূমি ক্রয় না করিয়া দান কী ভাবে করিতে পারেন? তবে, এ যুক্তি হয়তো কতকটা সার্থক যে, এই ‘মতামস্তু ভবতাম্” প্রাচীন গোষ্ঠী অধিকারের সুদূর স্মৃতি বহন করিতেছে; কিন্তু তাহাও সম্পূর্ণ সার্থক বলিয়া মনে হয় না, যখন দেখা যায়, পরবর্তী কালের শাসনগুলিতে একই প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে, “বিদিতমস্তু ভবতাম্”, ‘আপনারা বিজ্ঞাপিত হউন’, অর্থাৎ ভূমি-দানের ব্যাপারটি গ্রামবাসীদের বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে মাত্র। এই বিজ্ঞাপন করা কেন প্রয়োজন হইত, তাহা তো আগেই সবিস্তারে উল্লেখ করা হইয়াছে। আসল কথা, “মতমস্তু ভবতাম” এবং “বিদিতমস্তু ভবতাম” এই দুইয়ের মধ্যে বিশেষ কিছু পার্থক্য ছিল বলিয়া মনে করিবার কোনো কারণ নাই। : সেন আমলে বিজ্ঞাপিত করিবার প্রয়োজনে যে প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে “বিদিতমস্তু”, পাল আমলে সেই প্রসঙ্গেই সৌজন্য প্রকাশ করিয়া বলা হইত “মতমস্তু”।
১০. ভূমি-সংক্রান্ত কয়েকটি সাধারণ মন্তব্য
