“স বিশালশৈলুমালাতালবন্ধসম্বুধিং সাক্ষাৎ।
অপি পূর্তং পুষ্করিণীভুতং রচাম্বভূব ভূপালঃ ৷।“ (৩।৪২)
পালরাজাদের লিপিমালায় রাজা বা রাষ্ট্র কর্তৃক খনিত বহু দিঘির উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এই ধরনের সুদীর্ঘ বিশালকায় হ্রদোপম পুকুরের চিহ্ন বাঁকুড়া, বীরভূম অঞ্চলে, ত্রিপুরা জেলায়, উত্তরবঙ্গের প্রায় প্রত্যেক জেলায় এখনও প্রচুর দেখিতে পাওয়া যায়। এইসব পুকুরের জল যে চাষ-আবাদের কাজেই ব্যবহৃত হইত, এবং রাজকীয় অথবা রাষ্ট্রের সাহায্যেই যে এগুলির খনিত হইত, সে স্মৃতি উত্তর-রাঢ়ে এবং বরেন্দ্রভূমিতে এখনও বিলুপ্ত হইয়া যায় না। , গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী সংগমে কোথাও একটি সুবৃহৎ বাঁধ নির্মাণ করাইয়াছিলেন; বঁধটি তাঁহারই নামের সঙ্গে জড়িত ছিল, এই ইঙ্গিত দিতেও কবি বিস্মৃত হন নাই। যাহাই হউক, মৌর্যযুগের ও পরবর্তী কালের অর্থশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্ররচয়িতারাও রাজা ও রাষ্ট্রই যে ভূসম্পত্তির মালিক তাহা প্রতিষ্ঠিত করিতে প্রয়াস পাইতে লাগিলেন। কিন্তু এক সময় সমাজই যে ভূমি ব্যবস্থার নিয়ামক ছিল, সে স্মৃতিও একেবারে বিলুপ্ত হইয়া গেল না; থাকিয়া থাকিয়া সে স্মৃতি স্মৃতিশাস্ত্রের পাতায়, টীকাকারের ব্যাখ্যায়, প্রচলিত ব্যবহারের মধ্যে উকিঝুকি মারিত্বে লাগিল। সাধারণভাবে! এই কথা কয়টি মনের পটভূমিতে রাখিয়া, আমাদের প্রাচীন বাঙলার লিপিগুলি বিশ্লেষণ করিয়া, তাহাদের সাক্ষ্যপ্রমাণ কী, দেখা যাইতে পারে।
গুপ্ত আমলের যে কয়টি লিপি বাঙলাদেশে পাওয়া গিয়াছে, তাহার প্রত্যেকটিতেই দেখিতেছি, ভূমি বিক্রেতা হইতেছেন রাজা বা রাষ্ট্র, এবং বিক্ৰীত ভূমি ধর্মাচরণোদ্দেশ্যে দত্ত হইতেছে বলিয়া রাজা দানপুণ্যের এক-ষষ্ঠ ভাগের অধিকারীও হইতেছেন। বস্তুত প্রত্যেকটি লিপিতেই ভূমি বিক্রয়ের আবেদন জানানো হইতেছে রাজা বা রাষ্ট্রযন্ত্রকে; দু-এক ক্ষেত্রে রাজা কর্তৃক বিক্ৰীত ভূমি দানও করিতেছেন রাজা স্বয়ং, ক্রেতার পক্ষ হইতে। তাহা ছাড়া রাজা অনুরুদ্ধ হইয়া অথবা আত্মপ্রেরণায় নিজেও ভূমি দান করিতেন। এই লিপিগুলি ভালো করিয়া বিশ্লেষণ করিলে স্বতই মনে হয়, রাজা বা রাষ্ট্র শুধু ভূমি স্বত্বেরই অধিকারী নহেন, ভূমির মূল অধিকারীও। এই স্বত্বাধিকারতত্ত্ব বাঙলাদেশে বোধহয় গুপ্ত আমলের পূর্বেই নির্ধারিত ও স্বীকৃত হইয়া গিয়াছিল, এবং আমরা যে যুগের লিপিগুলির কথা বলিতেছি, সে যুগে এ সম্বন্ধে কোনও স্ট্রি প্রশ্ন আর ছিল না। তবে, তিনি অধিকারী ছিলেন বলিয়াই ভূমি দান-বিক্রয়ে যথেচ্ছাচরণ করিতে পারিতেন না, দেখিতে হইত, প্রস্তাবিত ভূমি দত্ত বা বিক্ৰীত হইলে গ্রামবাসীদের কৃষি ও অন্যান্য কর্মের কোনও অসুবিধা হইবে কি না, অন্য কাহারও ভূমিস্বত্ব আহত হইবে কি না। শুধু রাজা অথবা রাষ্ট্রই যে দেখিতেন, তাহা নয়, গ্রামের প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা, কখনও কখনও সাধারণ ব্যক্তিরাও তাহা দেখিতেন। লিপিগুলিতে যে বার বার ভূমিদানি-বিক্রয় স্থানীয় মহত্তর, কুটুম্ব, প্রতিবাসী এবং প্রাকৃতজনকে বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে, তাহা প্রধানত এই উদ্দেশ্যেই বহু ক্ষেত্রে ইহারাই ভূমি অন্য ভূমি হইতে পৃথক করিয়া সীমা নির্দেশ করিয়া দিতেন। প্রশ্ন উঠিতে পারে, যে সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ লিপিগুলিতে পাইতেছি, সে সমস্ত ভূমিই রাজার অথবা রাষ্ট্রের নিজস্ব ভূ-সম্পত্তি অর্থাৎ খাসমহল, এবং সে খাসমহল দান-বিক্রয়ের অধিকার রাজা বা রাষ্ট্রেরই হইবে, তাহাতে আর আশ্চর্য কি? এ প্রশ্নের সুযোগ হয়তো আছে, কিন্তু যখন দেখা যায়, সর্বত্রই সকল লিপিতেই রাজা হইতেছেন বিক্রেতা বা দাতা, তখন এই অনুমোনই মনকে অধিকার করে। যে, রাজ্যের সকল ভূমিরই স্বত্বাধিকারী এবং মূল মালিক, দুই-ই ছিলেন রাজা বা রাষ্ট্র। তাহা ছাড়া, লিপিগুলিতে এমন একটি দৃষ্টান্তও পাইতেছি না; যেখানে রাজা বা রাষ্ট্র মূল অধিকারিত্ব ছাড়িয়া দিতেছেন; যাহা পাইতেছি, তাহা তাহার স্বত্বাধিকার। ভূমি যখন শুধু বিক্রয় করিতেছেন, তখন স্বত্বাধিকারের দাবি বজায় রাখিতেছেন কর গ্রহণের ভিতর দিয়া; আর যখন শুধু বিক্রয় নয়, সঙ্গে সঙ্গে ভূমি নিষ্কর করিয়া দান করিয়া দিতেছেন, তখন সেখানে স্বত্বাধিকারিত্বের দাবিও ছাড়িয়া দিতেছেন, কিন্তু সেখানেও তাহার মূল আধিকারিত্ব চলিয়া যাইতেছে না। আমার এই মন্তব্যগুলির সুস্পষ্ট সবিশেষ প্রমাণ অষ্টমশতকপূর্ব বাঙলার অন্তত দুই-তিনটি লিপিতে পাওয়া যাইবে। ফরিদপুর জেলায় প্রাপ্ত গোপচন্দ্রের পট্টোলীতে খবর পাওয়া যায় যে, বৎসপাল স্বামী নামে এক ব্ৰাহ্মণ এক কুল্যবাপ ভূমি ক্রয় করিয়াছিলেন। লিপিটির অনেক স্থান অবলুপ্ত হইয়া যাওয়ায় পাঠ নিঃসন্দেহ নয়; কিন্তু যাহা আছে, তাহাতে নিঃসংশয়ে বুঝা যায়, যে এক কুল্যবাপ ভূমি বৎসপাল স্বামী কিনিয়াছিলেন তাহা মহাকোট্টিক.নামীয় কোনও ব্যক্তির বা একাধিক ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল, কিন্তু এই ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্ৰয়ের এবং দানের আবেদনও জানাইতে হইয়াছিল স্থানীয় রাষ্ট্র-প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নায়কদের। রাজা বা রাষ্ট্র যে ভূমির মূল অধিকারী বলিয়া স্বীকৃত হইতেন, এ সম্বন্ধে তাহা হইলে আর কোনও সন্দেহ রহিল না। সঙ্গে সঙ্গে আমরা ইহাও জানিলাম যে ভূসম্পত্তির? ব্যক্তিগত অধিকারও ছিল; কিন্তু সে অধিকার রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট নিয়ম দ্বারা শাসিত ছিল। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল বলিয়াই কোনও ব্যক্তি যে কোনও শর্তে যে-কোেনও ক্রেতার কাছে ভূমি বিক্রয় করিতে পারিতেন না, কিংবা দানও করিতে পারিতেন না। এই বিক্রয় অথবা দানকর্মের প্রয়োজন হইলে প্রস্তাবিত ক্রেতা বা দানগ্রহীতা রাষ্ট্রের কাছে অর্থাৎ রাষ্ট্রের স্থানীয় অধিকরণ ও প্রধান প্রধান লোকদের কাছে আবেদন করিতেন, এবং তাহারাই বিক্রয় ও দানের ব্যবস্থা করিতেন। বস্তুত, কোনও গ্রামে কোনও ক্রেতা বা দানগ্রহীতা ব্যক্তির নবাগমন গ্রামবাসীদের অগোচরে হইতে পারে না; এ ব্যাপারে রাষ্ট্র অপেক্ষা গ্রামের সমষ্টিগত স্বার্থই অধিকতর বিবেচ্য। এই কারণেই সর্বত্র এই দান-বিক্রয়ের ব্যাপার গ্রামবাসীদের গোচরে ও সাক্ষাতে হওয়াই প্রয়োজন বলিয়া বিবেচিত হইয়াছে। দেবখড়েগব আম্রফপুর পট্টোলীতেও আমার পূর্বোক্ত মন্তব্যগুলির প্রমাণ পাওয়া যাইবে। রাজা দেবখড়গ বৌদ্ধ আচার্য সঙ্ঘমিত্রের বিহারে প্রথম দফায় ৯ পাটক ১০ দ্ৰোণ ভূমি দান করিয়াছিলেন এবং দ্বিতীয় দফায় দান করিয়াছিলেন ৬ পাটক ১০ দ্রোণ। এই ভূমির অধিকাংশই ছিল ব্যক্তিগত অধিকারে, এবং দানের পূর্বাহু পর্যন্ত বিভিন্ন লোকেরা নিজেদের সম্পত্তি ভোগ করিতেছিলেন।
