ভারতবর্ষে সমাজ বিবর্তনের স্বাভাবিক ঐতিহাসিক নিয়ম অনুমান করা চলে, অতি প্রাচীন কালে লোকসংখ্যা যখন খুব বেশি ছিল না, এবং ভূমি ছিল প্রচুর, তখন ভূমির অধিকারী কে, এ ( প্রশ্ন উঠিবার কোনও অবকাশই ছিল না। লোকের যখন ভূমির প্রয়োজন হইত, তখন সে জঙ্গল কাটিয়া, মাটি ভরাট কইরায় নিজের প্রয়োজনমত ভূমি তৈয়ারি করিয়া লইত। পরের ভূমি লোভ করিবার প্রয়োজন হইত না, ভূমি লইয়া বিবাদেরও কোনও অবকাশ হইত না; হইলেও গ্রামবাসীরাই পরামর্শ করিয়া তাহা মিটাইয়া ফেলিত। তার পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, কৃষিবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভূমির চাহিদা যতই বাড়িতে লাগিল, ভূমি লইয়া বিবাদ-বিসংবাদও ততই বাড়িবার দিকে চলিল। এদিকে রাজা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের একটা বিবর্তন ঘটিতে লাগিল; রাজা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সমাজ যন্ত্রের একটা ঘনিষ্ঠ যোগ প্রতিষ্ঠিত আরম্ভ করিল। সমাজের। রক্ষক ও পালক হইলেনু রাজা; সে রাজা নররূপী দেবতাই হউন্ন বা প্রকৃতিপুঞ্জ দ্বারা নির্বাচিতই তি হউন, তাহাতে কিছু আসিয়া যায় না। শান্তিরক্ষার মূল দায়িত্ব তাঁহার, সমস্ত বিবাদ-বিসংবাদের মূল মীমাংসক তিনি, সকলের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের পাত্র তিনি, সকল ক্ষমতা, দায়িত্ব ও অধিকারের মূল উৎস তিনি। সমাজ বিবর্তনের যে স্তরে এই নীতি স্বীকৃত হইল, সেই স্তরে.এ কথাও সমাজের অন্তরে স্বীকৃত হইয়া গেল, ভূমির উপর অধিকারের উৎসও রাজা এবং তিনিই ভূমি সম্পর্কিত বাদ-বিসংবাদের শেষ মীমাংসক। কিন্তু রাজা বা রাষ্ট্র তাই বলিয়া ভূমির মূল। অধিকারী রূপে নিজেদের দাবি করিলেন না, কারণ, আদি প্রাচীন কালেও যেমন, এ ক্ষেত্রেও তেমনই, এ প্রশ্ন উঠিবার কোনও অবকাশই ছিল না। রাজা বা রাষ্ট্র ভূমির এবং ভূমি সংলগ্ন প্রজার ধারক রক্ষক ও পালক হিসাবে ধারণ, রক্ষণ ও পালনের পরিবর্তে শুধু ভূমিস্বত্বের অধিকারিত্বের দাবি করিলেন। কিন্তু বিবর্তনের প্রথমাবস্থায় স্বভাবতই এই দাবিও সর্বজনগ্রাহ্য ছিল না, কিংবা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচারও এ সম্বন্ধে ছিল না। ভূমি তখনও খুব দুর্লভ নয়; তাহা। ছাড়া গ্রামে গ্রামবাসীদের অনেকটা স্বরাজ্য তো ছিলই। যে পরিমাণ ভূমি ব্যক্তিগত ভাবে * লোকেরা ভোগ করিত, তাহার পরিবর্তে গ্রামের সমাজযন্ত্রকে কিছু উপস্বত্ব দিতেই হইত, সেই সমাজযন্ত্র পরিচালনার জন্য; আর যে সমস্ত ভূমি সমস্ত গ্রামবাসীদেরই প্রয়োজন হইত, যেমন পথ, ঘাট, গোবাট, গোচর ইত্যাদি, তাহা সমগ্র গ্রামেরই যৌথ সম্পত্তি বলিয়া সহজেই লোকেরা মনে করিতে পারিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও মূল অধিকারিত্বের কোনও প্রশ্ন উঠিবার অবকাশ নাই। বাস্তব ক্ষেত্রে যাহা প্রয়োজিত হইত, তাহাই কালক্রমে প্রয়োগ-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হইয়া জনসাধারণদ্বারা স্বীকৃত হইত। মূল অধিকারিত্বের দাবি যাহা কিছু হইয়াছে, তাহা পরবতী কালে ঠো রাষ্ট্রযন্ত্রের এবং সমাজযন্ত্রের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। আমাদের দেশে মোটামুটিভাবে প্রক মৌর্যসম্রাটদের আমল হইতেই এই বিবর্তন দেখা দিয়াছিল। মৌর্য আমলেই ভারতবর্ষের একটা বশিষ্ট * কেন্দ্রীকৃত কর্মচারিতন্ত্র শাসনব্যবস্থা গড়িয়া উঠে ক্ষমতাসম্পন্ন চক্রবর্তী সম্রাটদের চেষ্টায় ও প্রেরণায়, এবং সমাজযন্ত্রের সঙ্গে এই রাষ্ট্রযন্ত্রের অতি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্বীকৃত হয়। ভারতবর্ষের সর্বত্রই একই সঙ্গে ইহা হইয়াছিল, তাহা অবশ্য বলা চলে না; তবে, এই বিবর্তন মৌর্য আমলের টু পরে উত্তরভারতে সর্বত্রই স্তরে স্তরে ক্রমে ক্রমে দেখা দিতে আরম্ভ করে এবং ক্রমশ সর্বত্র স্বীকৃত হয়। সমাজযন্ত্রের মধ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষবিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে এই চেতনা জনসাধারণকে অধিকার করিতে আরম্ভ করে যে, রাজা এবং রাষ্ট্রই সমাজব্যবস্থার ধারক ও নিয়ামক। এই সমাজ-ব্যবস্থার মধ্যে ভূমি-ব্যবস্থা অন্যতম প্রধান উপকরণ। বিবর্তনের যে স্তরে স্বীকৃত হইল যে, রাজা এবং রাষ্ট্রই ভূমির উপর অধিকারের উৎস এবং তিনিই ভূমি সম্পর্কিত বাদ-বিসংবাদের শেষ মীমাংসক, তাহার পর হইতেই ক্রমশ ধীরে ধীরে এই চেতনা গড়িয়া উঠতে আরম্ভ করিল। যে, রাজা ও রাষ্ট্র শুধু ভূমি ব্যবস্থার নিয়ামক নহেন, দেশের ভূসম্পত্তির মালিকও। ইহার প্তে অন্যতম কারণ বোধ হয়, সেচন ব্যবস্থায় রাজার বা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের দেশ নদীমাতৃক হইলেও কৃষিকর্মবহুল পরিমাণে বারিনির্ভর। এই যে লিপিগুলিতে প্রচুর খাটা, খাড়িকা, খাল ইত্যাদির উল্লেখ পাওয়া যায়, তাহার অধিকাংশ ভূমির উর্বরতা বিধানের জন্য রাষ্ট্রকর্তৃক খনিত, এ অনুমান বোধ হয় করা চলে। তাহা ছাড়া এই প্লাবনের দেশে বাঁধ, আলি ইত্যাদির বিস্তৃত উল্লেখও রাষ্ট্র সহায়তার দিকেই ইঙ্গিত করে বলিয়া মনে হয়। রাজারা যে এই সেচন ব্যবস্থার দায়িত্ব পালন করিতেন, তাহার দু-একটি প্রমাণও আছে; যেমন, বাণগড় লিপিতে রাজ্যপাল সম্বন্ধে বলা হইয়াছে, তিনি অনেক বড় বড় দীঘিকা খনন করাইয়াছিলেন; রামচরিতে রামপাল সম্বন্ধে বলা হইয়াছে, তিনি নানাপ্রকার জনহিতকর পূর্তকার্য করিয়াছিলেন, খুব বড় বড় পুষ্করিণী খনন করাইয়া দুই ধারে তালগাছ লাগাইয়া পাহাড়ের মতন উচু করিয়া বাধাইয়া দিয়াছিলেন, দেখিলে মনে হইত, বুঝিবা সমুদ্র।
