কর ।। মুদ্রায় দেয় রাজস্ব অর্থে কর। অর্থশাস্ত্রে তিন প্রকার করের উল্লেখ” আছে। ১. রাজার প্রাপ্য শস্যভাগ ছাড়া নির্ধারিত কালে নিয়মিত ভাবে দেয় মুদ্রাকর; ২. আপৎকালে অথবা অত্যায়িক কালে দেয় মুদ্রাকর; ৩. বণিক ও ব্যবসায়ীদের লাভের উপর দেয় কর। প্রাচীন বাঙলায়ও বোধ হয়, এই তিন প্রকার করই প্রচলিত ছিল।
হিরণ্য ৷। হিরণ্য অর্থে স্বর্ণ। এই হিরণ্য সর্বদাই উল্লিখিত হইয়াছে ভাগ-ভোগ-করের সঙ্গে। কিন্তু ইহার সবিশেষ অৰ্থ বুঝিতে পারা কঠিন। কোনও কোনও পণ্ডিত অর্থ করিয়াছেন, রাজা সব শস্যের ভাগ গ্রহণ করিতেন না, তাহার বদলে গ্রহণ করিতেন মুদ্রা, সেই মুদ্রাই হিরণ্য। পূর্ববর্তী কালে কী হইত বলা কঠিন, কিন্তু সেনরাজাদের আমলে ভূমি রাজস্ব যে মুদ্রায় দিতে হইত, এ অনুমান বোধ হয় করা যায়, যদিও সে মুদ্রা যে কী বস্তু তাহা আমরা আজও জানি না।
উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু এই রাজস্বের ক্রম ও পরিমাণ জানিবার কোনও উপায় নাই লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর পট্টোলীতে দেখা যাইতেছে, দত্ত ভূমির প্রতি দ্রোণের আয় ছিল ১৫ পুরাণ। কিন্তু বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষৎ-লিপিতে দেখা যায়, একই জায়গায় সমপরিমাণ ভূমির আয় সমান ছিল না। কর্ষণযোগ্য ভূমির উৎপাদিত শস্যসম্পদের কমবেশির উপর আয়ের পরিমাণ নির্ভর করিত, এবং ইহা সহজেই অনুমেয় যে, ভূমির রাজস্বও সেই অনুযায়ীই নির্ধারিত হইত।
যাহাই হউক, ভাগ, ভোগ, কর ও হিরণ্য ছাড়া জনসাধারণকে অন্যান্য করাও দিতে হইত। এই জাতীয় সব করের উল্লেখ লিপিগুলিতে নাই। কিন্তু কয়েকটি সম্বন্ধে পরোক্ষ অনুমান সহজেই করা যায়। পাল ও সেন আমলের প্রায় প্রত্যেকটি লিপিতেই ‘সচৌরোদ্ধারণ কথাটির উল্লেখ আছে, অর্থাৎ দানগ্রহীতাকে যে সব সুবিধা ও ক্ষমতা দান করা হইত, তাহার মধ্যে চৌরোদ্ধারণ একটি! কথাটির অর্থ করা হইয়াছে এই মর্মে যে, অন্যান্য ক্ষমতার সহিত শান্তিরক্ষার ক্ষমতাও দানগ্রহীতাকে অৰ্পণ করা হইত। কেহ কেহ অর্থ করিয়াছেন, দানগ্রহীতাকে শান্তিরক্ষার জন্য অর্থাৎ চোর-ডাকাতের হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য কোনও প্রকার করা রাজাকে দিতে হইত না। শেষোক্ত অর্থটিই যেন সমীচীন মনে হয়।
আগেই দেখিয়াছি, ‘সঘট্ট সতর অর্থাৎ ঘাট, খেয়াপারাপার ঘাট ইত্যাদিসহ ভূমি দান করা: হইত। এই খেয়াপরাপর ঘাটের একটা রাজস্ব ছিল, এবং পরোক্ষভাবে জনসাধারণকে তাহা বহনও করিতে হইত। যে সব রাজকর্মচারী এই কর সংগ্ৰহ করিতেন এবং এইসব ঘাটের তত্ত্বাবধান করিতেন, তাহাদের নাম ছিল তারক অথবা তারপতি। হাট হইতেও এক প্রকারের রাজস্ব আদায় হইত; তাহা সংগ্রহ এবং হাটবাজারের তত্ত্বাবধান যিনি করিতেন, তাহার নাম ছিল হট্টপতি (ঈশ্বরঘোষের রামগঞ্জলিপি)। খালিমপুর এবং অন্যান্য আরও দুই একটি লিপিতে হাটের রাজস্বও যে দানগ্রহীতার প্রাপ্য, তাহার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। ধর্মপালের খালিমপুর-লিপিতে অন্যান্য করের সঙ্গে পিণ্ডক কথার উল্লেখ আছে। সম্ভবত এই পিণ্ডক এবং কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের পিণ্ডকর একই বস্তু। টীকাকার ভট্টস্বামী বলিতেছেন, সমগ্র গ্রামের উপর যে কর চাপানো হইত, তাহাই পিণ্ডকর ৷ বাট, গোবাট, গোচর ইত্যাদির উপরেও বোধ হয় নির্ধারিত হারে কর ছিল; ভূমিদানি যখন করা হইতেছে, তখন দানগ্রহীতা এ সমস্তই ভোগের অধিকার পাইতেছেন, অর্থাৎ নিম্ন প্রজাদের দেয় কর রাজার বদলে তিনিই ভোগ করিবার অধিকার পাইতেছেন। দশ প্রকার অপরাধের জন্যও প্রজাকে জরিমানা দিতে হইত, তাহাও একপ্রকারের রাজস্ব; আগেই সে কথা উল্লেখ করিয়াছি। উপরিকর নামে আর একটি করের উল্লেখ লিপিগুলিতে পাওয়া যায়। এই কারটি যিনি সংগ্ৰহ করিতেন, তাহার বৃত্তি-নাম ছিল ঔপরিকারক; প্রতিবাসী কামরূপ রাজ্যের নওগাঁ-লিপি হইতে এ কথা জানা যায়, এবং তিনি যে রাষ্ট্রের অন্যতম কর্মচারী ছিলেন, তাহাও ঐ লিপিটিতে সুস্পষ্ট। উপরিকর বোধ হয়–additional tax, অর্থাৎ নিয়মিত করা ছাড়া সময়ে অসময়ে রাষ্ট্র যে-সব কর নির্ধারণ করিতেন, অথবা ভূমিরাজস্ব ছাড়া অন্যান্য যে সব অতিরিক্ত কর রাষ্ট্রকে দিতে হইত, তাহাই বোধ হয় উপরিকর। অথবা, নিম্নপ্রজাদের নিকট হইতে রাষ্ট্র যে সব কর সংগ্ৰহ করিতেন, তাহাও হইতে পারে। কেহ কেহ মনে করেন, অস্থায়ী প্রজাকে যে রাজস্ব দিতে হইত। তাহাই উপরিকর। যে ভাবেই হউক, এই উপরিকর রাষ্ট্রের প্রাপ্য ছিল, মধ্যস্বত্বাধিকারীর নয়, তাহা নওগাঁ লিপিটির সাক্ষ্য হইতেই সপ্রমাণ।
০৯. ভূমি স্বত্বাধিকারী কে?
ভূমি সম্পৃক্ত ব্যাপারে প্রজার দায় যাহা কিছু, তাহার কতকটা পরিচয় পাওয়া গেল। এই ব্যাপারে প্রজার অধিকার কী ছিল, তাহার আলোচনা করা যাইতে পারে। কিন্তু সে আলোচনা করিতে হইলে ভূমি স্বত্বাধিকারী কে, তাহার আলোচনা অনিবার্য। রাজা বা রাষ্ট্রের মধ্যে মধ্য-স্বত্বাধিকারী ও প্রজার সম্বন্ধ কী, সে বিচারও প্রসঙ্গত আসিয়া পড়িবে।
ভূমির যথার্থ মূল অধিকারী রাজা, না জনসাধারণ, ইহা লইয়া বহু তর্কবিতর্ক হইয়া গিয়াছে; অতীত কালেও হইয়াছে, এই একান্ত আধুনিক কালেও হইতেছে। ভারতবর্ষেও হইয়াছে, ভারতের বাহিরে অন্যান্য দেশেও হইয়াছে। আমাদের প্রাচীন অর্থশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্ৰে এই তর্কের দুই পক্ষেরই বিস্তৃত মতামত পাওয়া খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। কিন্তু এ তুর্ক আমাদের আলোচনায় নিরর্থক। ইহার সন্দেহহীন সুমীমাংসাও কিছু নাই। কাজেই এই বিতর্কের মধ্যে -ঢুকিয়া পড়ার আমার কোনও প্রয়োজন নাই। আমাদের প্রশ্ন, ভূমির মূল অধিকারী কে, এ সম্বন্ধে নয়; ভূমি স্বত্বাধিকারী কে, সেই প্রশ্নই আমাদের বিচার্য। কারণ, ভূমির মূল অধিকারী কে, এ প্রশ্ন লইয়া যত তৰ্কই থাকুক, তাহা জিজ্ঞাসু মনের অনুসন্ধান মাত্র, ঐতিহাসিক যুগে। ইতিহাসের বাস্তব ক্ষেত্রে তাহার প্রয়োগ না-ও থাকিতে পারে। ভূমি-স্বত্বের অধিকারী হইতেছেন কে, এ প্রশ্নের উত্তর পাইলেই ঐতিহাসিকের প্রয়োজন মিটিয়া যায়। যুক্তির দিক হইতে ভূমির ( মূল অধিকারী কে ছিলেন, তাহা জানিবার কৌতুহল স্বাভাবিক, কিন্তু মূল অধিকারী যিনি বা যাঁহারাই হউন, ইতিহাসের বাস্তব ক্ষেত্রে তিনি বা তাহারাই যে ভূমি স্বত্বাধিকারী হইবেন, এমন না-ও হতে পারে।
