——————–
* উড্রগ্রামমণ্ডলে কি ওড্রদেশবাসিরা অধিকসংখ্যায় বাস করিতেন? তাঁহাদের কলোনি?
০৮. ভূমির উপস্বত্ব, কর, উপরিকর ইত্যাদি
সপ্তশতকপূর্ব লিপিগুলির কোনও কোনওটিতে আমরা ভূমি-দানের অন্যান্য শর্তের মধ্যে একটি শর্ত দেখিয়াছি, “সমুদয়বাহ্যাপ্রতিকর” অথবা “সমুদয়বাহ্যাদি…অকিঞ্চিৎপ্রতিকর”, অর্থাৎ রাজা ভূমি দান করিতেছেন কেবল তখনই, যখন তিনি তাহা সকল প্রকারের কর বিবর্জিত করিয়া দিতেছেন; তাহা না হইলে মূল্য লইয়া যে ভূমি বিক্রয় করিতেছেন, তাহাই দান করিতেছেন। বলিয়া উল্লেখের আর কোনও অর্থ হয় না। যাহা হউক, রাজা যখন ভূমি-কর বিবর্জিত করিতেছেন, তখন রাজা দান ছাড়া অন্য সকল ক্ষেত্রেই ভূমির ভোক্তাদের নিকট হইতে কর গ্ৰহণ করিতেন, ইহা তো প্রায় স্বতঃসিদ্ধ, এবং এই কর যে নানা প্রকারের ছিল, তাহার ইঙ্গিতও “সমুদয়বাহা” এই কথার মধ্যে প্রচ্ছন্ন। কর্ষণযোগ্য ও কৃষ্ট ভূমির কর ছিল, বাস্তুভূমিরও ছিল, কিন্তু খিল অর্থাৎ কর্ষণের অযোগ্য ভূমির বোধ হয় কোনও কর ছিল না, এই ধরনের ইঙ্গিত আমি আগেই করিয়াছি। বৈদ্যদেবের কমৌলি লিপিতে তাহার প্রমাণও আছে। কর কত প্রকারের ছিল, কী কী ছিল, তাহা এই যুগের লিপিগুলি হইতে জানিবার উপায় নাই, তবে উৎপন্ন শস্যের এক-ষষ্ঠ ভাগ যে বাষ্ট্রের প্রধান প্রাপ্য ছিল, এ সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নাই। পাহাড়পুর ও বৈগ্রাম লিপিতে পরিষ্কার বলা হইয়াছে, কোনও ব্যক্তিবিশেষ যদি রাজার নিকট হইতে ভূমি ক্রয় করিয়া ধর্মাচরণোদ্দেশ্যে সেই ভূমি দান করেন, তাহা হইলে রাজা শুধু যে ভূমির মূল্যটুকুই লাভ করেন তাহা নয়, ক্রেতা ভূমিদানের ফলস্বরূপ যে পুণ্য লাভ করেন, দত্ত ভূমি সর্বপ্রকার কর বিবর্জিত করিয়া দেওয়াতে রাজা সেই পুণ্যের এক-ষষ্ঠ ভাগের অধিকারী হন। অর্থাৎ, সেই ভূমির উপস্বত্বের এক-ষষ্ঠ ভাগ যে রাজার তাহা এই উল্লেখের মধ্যে সুস্পষ্ট। ধর্মদিত্যের ১নং পট্টোলীতে এই কথা আরও স্পষ্ট করিয়া বলা হইয়াছে। অন্যান্য করা যাহা ছিল তাহার দু-একটি অনুমান করা যাইতে পারে। যে ভূমি বিক্রয় করা হইতেছে এবং পরে ক্রেতা দান করিতেছেন, তাহা অনেক ক্ষেত্রেই লবণাকর, খেয়া পারাপার ঘাট, হাটবাজার, অরণ্য ইত্যাদি সংবলিত। এগুলির উল্লেখ নিরর্থক নয়। কৌটিল্য ও অন্যান্য অর্থশাস্ত্রকারদের মতে লবণ, অরণ্য ইত্যাদিতে রাষ্ট্রের একচেটিয়া অধিকার ছিল এবং তাহা হইতে রাজার তথা রাষ্ট্রের নিয়মিত আয় ছিল; এইসব যাহারা ভোগ করিতেন, রাজসরকারে তাহাদের কর দিতে হইত। হাটবাজার, খেয়াঘাট হইতেও একপ্রকারের রাজস্ব আদায় হইত, জনসাধারণকেই এই কারভার বহন করিতে হইত। রাজা যেখানে ভূমি দান করিতেছেন, এইসব আয়ের স্বাৰ্থ ত্যাগ করিয়াই দান করিতেছেন; অর্থাৎ, প্রতিপক্ষে ইহাই প্রমাণিত হয় যে, উৎপাদিত শস্যের এক-ষষ্ঠাংশ ছাড়া অন্যপ্রকারের করও ছিল এবং পূর্বোক্ত করাগুলি তাহাদের মধ্যে অন্যতম।
রাজা যখন ভূমি দান করিলেন, তখন তিনি সর্বপ্রকার করা বিবর্জিত করিয়াই দান করিলেন; তাহার অর্থ এই যে, যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান এই দান গ্রহণ করিলেন, তিনি বা সেই প্রতিষ্ঠান সেই ভূমির সকল প্রকারের উপস্বত্ব ভোগ করবেন। নিম্নপ্রজা যদি কেহ সেই ভূমি ভোগ করেন, তাহা হইলে তিনি দানগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সর্বপ্রকার কর, উৎপাদিত শস্যের ভাগ ইত্যাদি নিয়মিতভাবে প্রদান করিবেন, রাজা বা রাষ্ট্রকে নয়। ইহা ছাড়া রাজার ভূমিদানের কোনও অন্য অর্থ হইতে পারে না। এই কথাটা পরবর্তী কালের লিপিগুলিতে খুব স্পষ্ট করিয়া বলা হইয়াছে।
ভূমির উপস্বত্ব সম্বন্ধে উপরে যাহা বলিয়াছি, তাহার প্রত্যেকটি কথারই সবিস্তার সমর্থন * পাওয়া যাইতেছে। পরবর্তী কালের লিপিগুলিতে। প্রথমেই দেখিতেছি, রাজা যখন ভূমি দান করিতেছেন, তখন সমস্ত রাজভাগভোগকরহিরণ্যপ্রত্যায়” স্বাৰ্থ ত্যাগ করিয়া দান করিতেছেন, অর্থাৎ দানগ্রহীতাকে এ-সব কিছুই রাষ্ট্রকে বা রাজাকে দিতে হইবে না, সুস্পষ্ট বলিয়া দিতেছেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই কথাও বলিয়া দিতেছেন যে, সেই ভূমির ক্ষেত্রকর ইত্যাদি অন্যান্য প্রকারের ভোক্ত যাহারা আছে বা হইবে, তাহারা যেন রাজাজ্ঞা শ্রবণ করিয়া বিধিমত যথােচিত করপিণ্ডকাদি এবং অন্যান্য সকল প্রকার প্রত্যয় দানগ্রহীতাকে অৰ্পণ করেন (“প্রতিবাসিভিঃ ক্ষেত্ৰকরৈশ্চাজ্ঞাশ্রবণবিধেয়ৈৰ্ভুত্বা সমুচিতকরপিণ্ডকাদিসর্বপ্রত্যায়োপনায়ঃ ১. কার্য – ইতি” — খালিমপুর লিপি)। রাজভোগ্য রাষ্ট্রকে দেয়। কয়েকটি উপস্বত্বের উল্লেখ এই লিপিগুলিতে পাওয়া যায়; ভাগ, ভোগ, কর, হিরণ্য। এই কথা কয়টির অর্থ জানা প্রয়োজন।
ভাগ ।৷ ভাগ বলিতে রাজার বা রাষ্ট্রের প্রাপ্য উৎপাদিত শস্যের ভাগ বুঝায়। ধর্মপালের খালিমপুর লিপিতে “ষষ্ঠাধিকৃত’ নামে একজন রাজপুরুষের উল্লেখ আছে; খুব সম্ভব, ইনিই রাজার প্রাপ্য এক-ষষ্ঠ ভাগ সংগ্ৰহ করিতেন। শুধু কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র বা অন্যান্য স্মৃতিগ্রন্থেই যে রাজার এই ষষ্ঠ ভাগ প্রাপ্তির উল্লেখ আছে, তাহাই নয়; আগেরকার লিপি-প্রমাণের মধ্যেও দেখিয়াছি, উৎপাদিত শস্যের এক-ষষ্ঠ ভাগই ছিল রাজার প্রাপ্য।
ভোগ ।৷ খুব সম্ভব, ফল ফুল কাঠ ইত্যাদি যে সব দ্রব্য মাঝে মাঝে রাজাকে তাহার ব্যক্তিগত ভোগের জন্য দেওয়া হইত, তাহারই নাম ছিল ভোগ। বাঙলাদেশের লিপিগুলিতে সর্বত্রই উল্লেখ আছে, ভূমিদানকালে তৎসংলগ্ন মহুয়া, আম, কঁঠাল, সুপারি, নারিকেল প্রভৃতি গাছ ও অন্যান্য ঝাটবিটপ ইত্যাদি সমস্তই সঙ্গে সঙ্গে দান করা হইত। তাহা হইতে এ অনুমান অসংগত নয় যে, এইসব ফল ফুল কাঠ বাঁশ হইতে একটা নিয়মিত আয়ের অংশ রাজার ভোগ্য ছিল।
