দ্ৰোণাঢ়কদিব্যাপাদৌ দ্ৰৌণিকাঢ়কিকাদয়ঃ।
খারাবাপন্তু খারাকঃ।
কাক বা কাকিণী গোড়ায় বোধ হয় ছিল মুদ্রামান। শ্ৰীধরের ত্ৰিশতিকায় একটি আর্যা আছে :
ষোড়শপণঃ পুরাণঃ পণ্যো ভবেৎ কাকিণীচতুষ্কেণ।
পঞ্চাহতৈশ্চতুর্ভ্যির্বরাটকৈঃ কাকিণী হ্যেক ৷।
উন্মান অর্থই বোধ হয় তুলামান। কিন্তু গোড়ায় এইসব মান মুদ্রামান, ভাণ্ডমান, তুলামান বা ভূমিমান যাহাই থাকুক, উত্তর কালে ইহারা ভূমিমান নির্দেশে ব্যবহৃত হইত। উন্মান এবং কাকিণী। ছাড়া আর সমস্ত মানই হয় ভূমিমান, না হয় শস্যভাণ্ডমান। সেন আমলের লিপিগুলিতেই প্রথম দেখিতেছি, এই ভূমিমান ও শস্যমানের সঙ্গে তুল্যমান ও মুদ্রামান সম্পর্কিত করা হইয়াছে। ইহা হইতে একটা অনুমান বোধ হয় সহজেই করা যায়। প্রাচীনতর কালে ভূমি যখন সুলভ ছিল, চাহিদা যখন খুব বেশি ছিল না, তখন ভূমির মাপের এত চুলচেরা বিচারও ছিল না। পাটকের অর্থাৎ গ্রামাংশের মোটামুটি আয়তন একটা সকলেরই জানা ছিল, দুই-চার বিঘা। এদিক-ওদিক হইলে বিশেষ কিছু আসিয়া যাইত না। পরবর্তী কালে ভূমির চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য পাটকের মাপজোখও নিশ্চয়ই সুনির্দিষ্ট হইয়াছিল। কুল্যবাপ, দ্রোণবাপ, আঢ়বাপ, হল ইত্যাদি সম্বন্ধেও একই কথা বলা চলে। সুলভ ভূমির যুগে কতখানি ভূমিতে মোটামুটি কত বীজ ধান লাগে, কত লাঙ্গল লাগে, এই দিয়াই মোটামুটি জমির পরিমাণ নির্ণীত হইত। ক্ৰমে চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাপজোখ নির্দিষ্টতর হইতে থাকে, এবং ক্রমশ আরও নিম্নতর মান নির্দেশের প্রয়োজন হয়। এই নিম্নতর মান যে তুলামান বা মুদ্রামান দ্বারা নির্ণীত হইয়াছিল, তাহাও জমির ক্রমবর্ধমান চাহিদার দিকে ইঙ্গিত করে।
পাটকের সঙ্গে কুল্যবাপের ও দ্রোণের, কুল্যবাপের সঙ্গে দ্রোণের, দ্রোণের সঙ্গে আঢ়ক বা আঢ়বাপের সম্বন্ধ আমরা আগেই জানিয়াছি। এইবার আঢ্যক বা আঢ়বাপের সঙ্গে উন্মানের এবং উন্মানের সঙ্গে কাকিণীর সম্বন্ধ কী, তাহা জানিবার চেষ্টা করা যাইতে পারে। কোনও আর্যশ্লোকের মধ্যে এই সম্বন্ধের পরিচয় পাওয়া যাইতেছে না। শ্ৰীযুক্ত যোগেশচন্দ্র রায় বাকুড়ার প্রচলিত রীতি সম্বন্ধের প্রয়োজনীয় খবর দিতেছেন। মল্লভূমের রাজা চৈতন্যসিংহদেবের তিনখানি দানপত্র তাহার হস্তগত হইয়াছিল; একটি পত্রে তিনি জানকীরাম হাজরাকে দুই দ্রোণ দুই আড়ি তিরিশ উয়ান এক কান ভূমি দেবোত্তর দান করিয়াছিলেন। সমসাময়িক অন্যান্য দানপত্র হইতে জানা যায়,
৪ কাক বা কাকিণী (পূর্ববাঙলায়, চট্টগ্রামে কানি, রাঢ়ে কান)= ১ উয়ান
৫০ উয়ান = ১ – আড়ি ৪
আড়ি = ১ দ্রোণ
৪ আড়ি = ১ দ্রোণ
বাঙলা ১২৩০ সালে লিখিত “সেবক শ্ৰীসনাতন মণ্ডল দাসস্য” একটি শুভঙ্করী বইয়ে যে আর্য পাওয়া যায়, তাহাও উপরোক্ত সংবাদ সমর্থন করে।
“খেতে মাঠে রশি না পাই।
সাল ছেষে কাহিন বলাই ৷।
চারি কানে লয়ান হয়
পঞ্চাশ উয়ানে আডি।।
চারি আড়িতে ডোন হয়
আঠাস হাত দডি।।”
আড়ি, আডি নিঃসন্দেহে আঢ়বাপ, আঢ্যক বা আঢ়কবাপ; ডোন দ্রোণ বা দ্রোণবাপ। তা হইলে এইবার আমরা আঢ়বাপের সঙ্গে উন্মানের সঙ্গে কাকিণী সম্বন্ধ জানিলাম।
আর-একটি ভূমি-মাপের উল্লেখ শুভঙ্কর করিয়াছেন, এবং মাপটি কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত বাঙলাদেশেও প্রচলিত ছিল, এই মাপটির নাম কুড়িব। কেহ কেহ মনে করেন, এই কুড়িব ও কুল্যবাপ সমানার্থক। আমার মনে হয়, এই অনুমান সন্দেহজনক, কারণ, লীলাবতীর আর্যায় আছে–
8 কুড়ব = ১ প্রস্থ
৪ প্রস্থ = ১ আঢ়া (আঢ়ক, আঢ়বাপ)
8 আঢ়া = ১ দ্রোণ
অর্থাৎ ৬৪ কুড়বে ১ দ্ৰোণ, এবং যেহেতু ৮ দ্রোণে এক কুল্যবাপ, সেইহেতু এক কুল্যবাপ ৫১২ কুড়িব বা কুড়বার সমান। অন্তত লীলাবতীর মতে তাহাই হওয়া উচিত। কুড়িব এবং বর্তমান কালে প্রচলিত বিঘা সমপরিমাণ ভূমি নির্দেশ করে কি না বলা কঠিন। যাহাই হউক, এই কুড়বার উল্লেখ বাঙলার প্রাচীন লিপিগুলিতে দেখা যায় না।
এই কুল্যবাপ ভূমির পরিমাণ কতটুকু ছিল তাহা জানিবার কৌতুহল স্বাভাবিক। সে-দিকে চেষ্টাও কিছু কিছু হইয়াছে, কতকটা অনুমানের এবং অনুমানোপম সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করিয়া। কুল্যবাপের পরিমাণ যে বর্তমান কালের বিঘা হইতে অনেক বেশি ছিল, এ কথা নলিনীকান্ত ভট্টশালী মহাশয় বহুদিন আগেই বলিয়াছিলেন। কাছাড়ের ইতিবৃত্ত-লেখক উপেন্দ্ৰচন্দ্র গুহ মহাশয় বলেন যে, ঐ জেলায় এক কুল্যবাপ ১৪ বিঘার সমান। দীনেশচন্দ্র সরকার মহাশয় অনেক অনুমানসিদ্ধ প্রমাণের সাহায্যে দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, এক কুল্যবাপ ভূমি পরিমাণ “অন্তত পক্ষে ৪০-৪২ একর অর্থাৎ প্রায় ১২৫ বিঘার কম ছিল না।” এ সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছুই বলিবার উপায় নাই; তবে লীলাবতীর আর্যার সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয় এবং কুড়বা যদি বিঘার সমার্থক হয় তাহা হইলে এক কুল্যবাপে ৫১২ বিঘা হওয়া উচিত। কিন্তু কুড়বা ও বিঘা সমার্থক কি না, এ বিষুয়ে সন্দেহ আছে।
অষ্টমশতকপূর্ব লিপিগুলিতে দেখিয়াছি, ভূমি পরিমাপের মানদণ্ড ছিল নল; পরবর্তী যুগের মানদণ্ডও ইহাই। লক্ষ্মণসেনের আনুলিয়া-শাসনে প্রদত্ত ভূমি যে নল-মানদণ্ডে মাপা হইয়াছিল, তাহার নাম বৃষভশংকর নল। বৃষভশংকর ছিল রাজা বিজয়সেনের বিরুদ বা অন্যতম উপাধি। মনে হয়, বিজয়সেনের হাতের মাপে যে নলের দৈর্ঘ্য নিরূপিত তাহারই নাম হইয়াছিল। বৃষভশংকর নল। আনুলিয়া-শাসন হইতে প্রমাণ হয়, অন্তত লক্ষ্মণসেনের কাল পর্যন্ত এই বৃষভশংকর নলের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। অথচ, বিজয়সেন নিজে কিন্তু ভূমি দান করিয়াছিলেন “সমতটনলেন।” অর্থাৎ সমতটমণ্ডলে প্রচলিত মানদণ্ডের পরিমাপে। সমতটীয় নল পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির খাড়ি-বিষয়েও প্রচলিত ছিল (বারাকপুর শাসন)। এই সমতট নলই পরে বৃষভশংকর নল নামে পরিচিত হইয়াছিল কি না, বলা কঠিন। বর্ধমান-ভুক্তির উত্তর-রাঢ় অঞ্চলে এবং পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির ব্যাঘ্রতটী অঞ্চলে এই বৃষভশংকর নল প্রচলিত ছিল। লক্ষ্মণসেনের তপণদীঘি-শাসনের সাক্ষ্য হইতে মনে হয়, বাঙলাদেশের বিভিন্ন স্থানের নল-মানদণ্ড বিভিন্ন প্রকারের ছিল। বরেন্দ্রীমণ্ডলে প্রদত্ত ভূমি মাপা হইয়াছিল “তত্ৰত্যদেশব্যবহারনলেন।” অর্থাৎ সেই সেই দেশে প্রচলিত নলের সাহায্যে! সেনা-আমলের লিপিগুলি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, ব্যাখ্রতটীমণ্ডলে অর্থাৎ পশ্চিম-নিম্নবঙ্গে বৃষভশংকর নল প্রচলিত ছিল, কিন্তু বরেন্দ্রীমণ্ডলে অর্থাৎ উত্তরবঙ্গে প্রচলিত ছিল অন্য প্রকারের নলমানদণ্ড। গোবিন্দরপুর-তাম্রশাসনের সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয়, তাহা হইলে বর্ধমান-ভুক্তির পশ্চিম-খাটিকা অঞ্চল বেতড চতুরকে (বেতড়, হাওড়া) প্রচলিত নলের মাপ ছিল ৫৬ হাত। লক্ষ্মণসেনের ভাওয়াল লিপিতে দেখি ২২ হাতের আর-এক নলের উল্লেখ। ঢাকা জেলার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে এই নলের প্রচলন ছিল বলিয়া মনে হয়। বাঙলার বাহিরেও নলমানদণ্ডের প্রচলন যে ছিল তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় তৈলের নীলগুণ্ড লিপিতে ভূমি-পরিমাপের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে “রাজমানেন দণ্ডেন” উড়িষ্যার নৃসিংহদেবের একটি পট্টোলীতে দেখিতেছি, রাজকর্মচারীদের হাতের মাপেও নলমান নির্ধারিত হইত। এই লিপিতে ভূমি-পরিমাপের নির্দেশ দেওয়া হইতেছে “চন্দ্ৰদাসকরণস্য নলপ্রমাণেন” এবং “শ্ৰীকরণশিবদাসনামকনলপ্রমাণেন”। কিন্তু এই নলমানদণ্ড কিসের মানপাটকের না কুল্যবাপের, দ্রোণের না। আঢকের, উন্মান না কাকিণীর? এই প্রশ্নের উত্তরের কোনও ইঙ্গিত লিপিগুলিতে নাই।
