ভূমির মূল্য কিরূপ ছিল, তাহা এইবার আলোচনা করা যাইতে পারে। কিন্তু এ সম্বন্ধে যাহা-কিছু সংবাদ, তাহা অষ্টমশতকপূর্ব লিপিগুলিতেই শুধু পাওয়া যায়। পরবর্তী লিপিগুলিতে ভূমির মূল্য কোথাও দেওয়া হয় নাই; কারণ, এই যুগের পট্টোলীগুলি দানের পট্টোলী, ক্ৰয়-বিক্রয়ের নয়। সেন-আমলের লিপিগুলিতে ভূমির উৎপত্তির যথাযথ পরিমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেওয়া হইয়াছে, কিন্তু তাহাতে মূল্য নিরূপণের সাহায্য যাহা পাওয়া যায় তাহা পরোক্ষ। দামোদরপুরের ১, ২, ৪ এবং ৫নং শতাধিক বৎসর জুড়িয়া বিস্তৃত। এই চারিটি পট্টোলী বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায় পট্টোলী শতাধিক বৎসর ধরিয়া পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির কোটিবৰ্ষ-বিষয়ে এক কুল্যবাপ ভূমির মূল্য ছিল তিন দীনার। ফরিদপুরের পট্টোলীগুলি তিনটি রাজার রাজত্বকাল অর্থাৎ মোটামুটি পঞ্চাশ বৎসর ধরিয়া বিস্তৃত। পূর্ববাঙলার এই অঞ্চলে প্রায় পঞ্চাশ বৎসর ধরিয়া ভূমির মূল্য ছিল প্রতি কুল্যবাপে চারি দীনার। বৈগ্রাম-পট্টোলীর দত্তভূমির অবস্থিতি ছিল পঞ্চনগরী-বিষয়ে এবং সেখানে প্রতি কুল্যবাপের মূল্য ছিল দুই দীনার। বৈগ্রাম উত্তরবঙ্গে দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার সীমান্তে; দামোদরপুরও দিনাজপুর জেলায়; কিন্তু প্রথমটি কোটিবৰ্ষ-বিষয়ে, দ্বিতীয়টি পঞ্চনগরী-বিষয়ে, এবং দুই স্থানে প্রতি কুল্যবাপের মূল্যের পার্থক্য এক দীনার। ৩নং দামোদরপুর পট্টোলীর চণ্ড গ্রাম কোন বিষয়ে অবস্থিত ছিল, তাহার উল্লেখ নাই; কিন্তু প্রতি কুল্যবাপের মূল্য দুই দীনারা দেখিয়া অনুমান হয় চণ্ড গ্রাম ছিল পঞ্চনগরী-বিষয়ে। এই অনুমানের অন্যতম কারণ, চণ্ডগ্ৰাম বৈগ্রাম বা বায়ীগ্রামের একেবারে পাশাপাশি গ্রাম। পাহাড়পুর পট্টোলীর দত্তভূমিও কোন বিষয়ে অবস্থিত তাহার উল্লেখ নাই; কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ভূমির মূল্য দুই দীনার; এবং পাহাড়পুর বৈগ্রাম হইতে মাত্র উনিশ-কুড়ি মাইল। অনুমান করা চলে, পাহাড়পুরও পঞ্চনগরী-বিষয়েই অবস্থিত ছিল। যাহা হউক, একথা সহজেই বুঝা যাইতেছে, এক-এক বিষয়ে ভূমির মূল্য ছিল এক-এক প্রকার- যেমন, পঞ্চনগরী-বিষয়ে দুই দীনার, কোটিবৰ্ষ-বিষয়ে তিন দীনার, ফরিদপুর অঞ্চলে চারি দীনার। ইহার অন্য একটি প্রমাণ দেখিতেছি, প্রায় প্রত্যেকটি পট্টোলীতেই “ইহা বিষয়ে – দীনারিক্যবিগ্রয়োনুবৃত্তাঃ” বা এইজাতীয় কোনও পদের উল্লেখের মধ্যে। ভূমির মূল্যবৃদ্ধির হার কিরূপ ছিল তাহা বলিবার কোনও উপায় নাই, তবে ভূমির চাহিদা যে ভাবে বৃদ্ধি পাইতেছিল, তাহাতে মূল্যও যে ক্রমশ বাড়িতেছিল, এরূপ অনুমান করিলে খুব অন্যায় হয় না। কিন্তু এই শতাধিক বর্ষ ধরিয়া জমির দাম একই ছিল; সে প্রমাণও ধর্মাদিত্য এবং গোপচন্দ্রের পট্টোলী তিনটিতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন অঞ্চলে দামের পার্থক্যও আগেই দেখিয়াছি। এই পার্থক্য খানিকটা যে ভূমির উর্বরতা, চাহিদা এবং স্থানীয় জীবিকামান-সমৃদ্ধির উপর নির্ভর করিত এ অনুমান সহজেই করা চলে। পঞ্চনগরী-বিষয়ের তুলনায় কোটিবৰ্ষ-বিষয়ের সমৃদ্ধি নিশ্চয়ই বেশি ছিল, এবং কোটিবর্ষের তুলনায় প্ৰাকসমুদ্রশায়ী দেশগুলি সমৃদ্ধতির ছিল। ধর্মাদিত্য এবং গোপচন্দ্রের পট্টোলী তিনটিতে ভূমির দাম প্রতি কুল্যবাপে চারি দীনার। ১নং পট্টোলীতে স্পষ্ট বলা হইয়াছে, প্রাক সমুদ্রশায়ী দেশগুলির ইহাই ছিল প্রচলিত মূল্য; ২ং এবং ৩নং (Sg পূর্বদেশে ভূমি ক্রয়-বিক্রয়ের (প্রাক-ক্রিয়মাণক এবং ‘প্রাক-প্রবৃত্তি) এই নিয়মের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। “প্রাক” বলিতে এই তিন ক্ষেত্রেই পূর্বাঞ্চলের সাগরশায়ী দেশগুলিকে বুঝাইতেছে, নিঃসংশয়ে এই অনুমান করা চলে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হইতেছে, সর্বত্র খিল, ক্ষেত্র এবং বাস্তুভূমির একই মূল্য। বাস্তুভূমি অপেক্ষা ক্ষেত্রভূমি, ক্ষেত্রভূমি অপেক্ষা খিলভূমির মূল্য অপেক্ষাকৃত কম হওয়াই তো স্বাভাবিক, অথচ একটি লিপিতেও তেমন ইঙ্গিত নাই, বরং * সর্বত্র সকল প্রকার ভূমির দাম একই, এই কথারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে।*
অর্থনীতির মূল তত্ত্ব সম্বন্ধে যাঁহাদের কিছুমাত্র পরিচয় আছে তাহারাই জানেন মুদ্রার মূলগত মূল্য নির্ভর করে ক্রয়াশক্তির তারতম্যের উপর। আজিকার দিনে এক টাকায় বা কোনও বস্তু যে পরিমাণ ক্রয় করা যায়, ১০০ বৎসর আগে তাহার অনেক বেশি পাওয়া যাইত, এবং ঐতিহাসিক মোরল্যাণ্ড দেখাইয়াছেন, আকবরের আমলে ১৯১২ খ্ৰীষ্টশতকের চেয়ে অন্তত ছয়গুণ বেশি পাওয়া যাইত। সেই হেতু অনুমান করা চলে, প্রাচীন বাঙলায় একটি রৌপ্যমুদ্রার ক্রয়াশক্তি আকবরের আমল অপেক্ষাও অন্তত কয়েকগুণ বেশি ছিল। প্রাচীন বাঙলায় ১৬টি রৌপ্যকে ছিল ১ দীনার, অর্থাৎ তখনকার ১ দীনার বর্তমান ভারতবর্ষের অন্তত ৯৬ টাকার কম কিছুতেই ছিল না, এ কথা জোর করিয়াই বলা যায়। বর্তমানের মুদ্রায় পঞ্চনগরী-বিষয়ের এক কুল্যবাপ ভূমির মূল্য সেই হেতু অন্তত ১৯২ টাকা, কোটিবৰ্ষ-বিষয়ে অন্তত ২৮৮ টাকা, এবং ফরিদপুর অঞ্চলে অন্তত ৩৮৪ টাকার কম কিছুতেই ছিল না। তখনকার দিনে এই মুদ্রা-পরিমাণ কম নয়। পরবর্তী যুগে অর্থাৎ পাল ও সেন-আমলে ভূমির মূল্য কিরূপ ছিল, তাহা বলিবার উপায়। বিশেষ নাই; তবে বিশ্বরূপসেনের একটি লিপিতে এবং কেশবসেনের ইদিলপুর-লিপিতে এই মূল্যের খানিকটা ইঙ্গিত আছে বলিয়া যেন মনে হয়। রাজা কেশবসেন ইদিলপুর-শাসনদ্বারা জনৈক ব্ৰাহ্মণকে পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত বঙ্গের বিক্রমপুর ভাগে তালপাড়া-পাটক নামে একটি গ্রাম দান করিয়াছিলেন। এই গ্রামের ভূমির পরিমাণ কত ছিল, তাহার উল্লেখ নাই, তবে চতুঃসীমাবচ্ছিন্ন এই গ্রামটির বার্ষিক আয় (না, মোট মূল্য?) যে দুই শত মুদ্রা ছিল, তাহার উল্লেখ আছে। এই মুদ্রা খুব সম্ভব কপর্দকপুরাণ। বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষৎ লিপিতে ৩৩৬.৫ উন্মান ভূমি দানের উল্লেখ আছে; ছয়টি গ্রামে এগারোটি ভূখণ্ডে এই পরিমাণ ভূমির মোট বার্ষিক আয় (না, মোট মূল্য?) ছিল পাঁচ শত পুরাণ। সমসাময়িক অন্যান্য লিপির সাক্ষ্য দেখিয়া মনে হয়, সর্বত্রই আমরা যাহা পাইতেছি, তাহা দত্ত ভূমির বার্ষিক আয়, ভূমির মোট মূল্য নয়, এবং এই আয়ের পরিমাণ দেওয়া হইতেছে। পুরাণ অথবা কপর্দকপুরাণ মুদ্রায়। লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর তাম্রশাসনে এবং আরও দুই-একটি শাসনে পরিষ্কার বলা হইয়াছে, প্রতি দ্রোণের বার্ষিক আয় মোটামুটি ১৫ পুরাণ হিসাবে ৬০ দ্রোণ ১৭ উন্মান ভূমির বিড্ডারশাসন গ্রামের মোট বার্ষিক আয় ৯০০ পুরাণ (ইত্থং চতুঃসীমাবচ্ছিন্নো তদেশীয়সংব্যবহারষট্ৰপঞ্চাশৎহস্তপরিমিতনলেন সপ্তদশোন্মানধিকষষ্ঠি-ভূ-দ্ৰোণাত্মক প্রতি দ্রোণে পঞ্চদশপুরাণোৎপত্তি-নিয়মে বৎসরেণ নবশতোৎপত্তিকঃ বিড়ারশাসনঃ…)। এই বার্ষিক আয় হইতে ভূমির মোট মূল্য কী হইতে পারে, তাহা অনুমান করা খুব কঠিন হয়তো নয়।
