১ম ভূখণ্ড – ৭ পাটক ৯ দ্রোণবাপ
২য় ভূখণ্ড – ০ পাটক ২৮ দ্রোণবাপ
৩য় ভূখণ্ড – ০ পাটক ২৩ দ্রোণবাপ
৪র্থ ভূখণ্ড – ০ পাটক ৩০ দ্রোণবাপ
৫ম ভূখণ্ড – ১ ৩/৪ পাটক ০ দ্রোণবাপ
———————————————
মোট – ৮ ৩/৪ পাটক ৯০ দ্রোণবাপ
আগেই বলিয়াছি, দত্ত ভূমির মোট পরিমাণ ১১ পাটক। তাহা হইলে ৯০ দ্রোণে হইতেছে ২৪ পাটক, অর্থাৎ ৪০ দ্ৰোণে এক পাটক, এ কথা সহজেই বলা চলে। আগে দেখিয়াছি, ৮ দ্ৰোণে এক কুল্যবাপ, তাহা হইলে ৫ কুল্যবাপ = ১ পাটক।
পাটক এখানে নিঃসন্দেহে ভূমি মাপের মান। কিন্তু আম্রফপুর-লিপি দুটিতেই প্রমাণ পাওয়া যাইবে, পাটক কথাটি গ্রাম বা গ্ৰামাংশ অর্থেও ব্যবহৃত হইত। তালপোটক, মৰ্কটাসী পাটক, বৎসনাগ পাটক, দীর পাটক এবং এইজাতীয় পাটকান্ত যত নাম, সমস্তই গ্রাম বা গ্রামাংশের নাম। বস্তুত বাঙলা পাড়া কথাটি পাটক হইতে উদ্ভূত বলিয়াই মনে হয়, অথবা দেশজ পাড়া হইতে পাটক। তলপাটক = তলপাড়া, ভট্টপাটক = ভাটপাড়া, মধ্যপাটক = মধ্যপাড়া, ইত্যাদি পাটকান্ত নাম তো এখনও বাঙলাদেশের সর্বত্র সুপরিচিত। এ জাতীয় নাম প্রাচীন বাঙলার লিপিগুলি হইতেও জানা যায়। বাঙলার বাহিরেও এই জাতীয় নামের অভাব নাই, যেমনমূলবর্মপাটক গ্রাম, বিশালপোটক গ্রাম ইত্যাদি। গ্রাম বা গ্রামাংশ (= পাড়া) অর্থে পাট, পাটক কথা উত্তর ও পশ্চিম-ভারতে পড় বা পড্রকরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে, যথা- বড়পড্রকাভিধান গ্রাম, শমীপড্রক গ্রাম, শিরীষপড্র গ্রাম ইত্যাদি। পাট=পড্র=গ্রাম; ক্ষুদ্র গ্রামার্থেক প্রত্যয় যোগে নিম্পন্ন হয়। পাটক= পড্রক = পাড়া বা গ্রামাংশ বা ছোট গ্রাম।
পাল-সম্রাটদের আমলে ভূমি পরিমাপের মান কী ছিল তাহা জানিবার উপায় নাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দানের বস্তু হইতেছে একটি বা একাধিক সম্পূর্ণ গ্রাম; বোধ হয় ইহা অন্যতম কারণ। একাদশ শতকে শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল তাম্রপট্টে দেখিতেছি, সর্বোচ্চ ভূমি-মান হইতেছে পাটক। অষ্টম শতকে এই মান ফরিদপুরে প্রচলিত ছিল; একাদশ শতকে বিক্রমপুরেও দেখিলাম। মোটামুটি এই শতকেই শ্ৰীহট্টে দেখি, উচ্চতম মান হইতেছে হল। কেহ কেহ মনে করেন। কুলুবায়েরই অপর নাম হল বা হাল। যাহাই হউক, গোবিন্দকেশবের ভাটেরা তাম্রপট্টে ২৮ টি গ্রামে ২৯৬ টি বাস্তুভিটা এবং ৩৭৫ হল জমি ছিল; নিম্নতম মান ছিল ক্ৰান্তি। শ্ৰীহট্টে ভূমি-পরিমাপের বর্তমান ক্রম এইরূপ :
৩ ক্রান্তি = ১ কড়া
৪ কড়া = ১ গণ্ডা
২০ গণ্ডা = ১ পণি
৪ পণ = ১ রেখা
৪ রেখা = ১ ষষ্ঠী
৭ ষষ্ঠী = ১ পোয়া
৪ পোয়া = ১ কেদার বা কেয়ার
১২ কেয়ার = ১ হল ( = ১০ ১/২ (সাড়ে দশ) বিঘা = ৩ ১/৪ (শোয়া তিন) একর)
শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল শাসনে উচ্চতম ভূমিমান দেখিয়াছি পাটক, কিন্তু এই রাজারই ধুল্লা-শাসনে উচ্চতম মান দেখিতেছি হল, এবং দত্ত ভূমিগুলি তো বিক্রমপুরে বলিয়াই অনুমান হয়। একাদশ শতকে বিক্রমপুরে কি পাটক ও হল, এই দুই মানই প্রচলিত ছিল? যদি তাঁহাই হয়, তাহা হইলে পাটকের সঙ্গে হলের সম্বন্ধ কি? যাহাই হউক, ধুল্লা-শাসন হইতে এই খবরটুকু পাওয়া যাইতেছে যে, হলের নিম্নতর ক্রম হইতেছে দ্ৰোণ; কিন্তু দ্রোণের সঙ্গে হলের সম্বন্ধ নির্ণয় করা যাইতেছে না। দ্বাদশ শতকে ভোজ্যবর্মার বেলব লিপিতে উচ্চতম ভূমিমান পাটক এবং নিম্নতর মান দ্ৰোণ; এ দুয়ের সম্বন্ধ যে কী, তাহা আগেই দেখিয়াছি। সেন-রাজাদের লিপিগুলিতেও উচ্চতম মান পাটক অথবা ভূপাটক। এই লিপিগুলি বিশ্লেষণ করিয়া ভূমিমানের যে ক্রম পাওয়া যায় তাহা এইরূপ : ১. পাটক বা ভূপাটক, ২০ দ্রোণ বা ভূদ্রোণ, ৩. আঢ্যক বা আঢ়াবাপ, ৪- উন্মান বা উদান বা উয়ান, ৫- কাক বা কাকিণী বা কাকিণিকা। পাটকের সঙ্গে দ্রোণের এবং দ্রোণের সঙ্গে আঢ়ক বা আঢ়াবাপের সম্বন্ধ ইতিপূর্বেই আমরা জানিয়াছি, কিন্তু আঢকের সঙ্গে উন্মানের বা উন্মানের সঙ্গে কাকের সম্বন্ধের কোনও ইঙ্গিত লিপিগুলিতে পাওয়া যাইতেছে না ৷ লক্ষ্মণসেনের সুন্দরবন পট্টোলীতে উপরোক্ত ক্রমের একটু ব্যতিক্রম পাওয়া যায়; দ্রোণের নিম্নতর ক্রম দেওয়া হইয়াছে খড়িক (?), এবং তাহার পর যথারীতি উন্মান ও কাকিণী। খড়িকা মান যে ছিল তাহার প্রমাণ এই রাজারই মাধ্যাইনগর পট্টোলীতেও আছে; সেখানে উচ্চতর মান ভুখাড়ী এবং তাহার পরেই খাড়ীকা। কিন্তু খাড়ীকার সঙ্গে দ্রোণের অথবা ভুখাড়ীর সঙ্গে খাড়ীকার সম্বন্ধ নির্ণয়ের কোন ইঙ্গিত লিপিগুলিতে নাই। তবে লক্ষ্মণসেনের সুন্দরবন লিপিতে একটু ইঙ্গিত যাহা আছে তাহা উল্লেখ করা যাইতে পারে।
১২ অঙ্গুলি = ১ হাত
৩২ হাত = ১ উন্মান (উয়ান)।
এই সম্বন্ধ নির্ণয় এবং এ পর্যন্ত যে-সমস্ত ভূমিমানের উল্লেখ করিয়াছি, তাহার যথাযথ মর্ম গ্ৰহণ করিতে হইলে প্রাচীন আর্যাশ্লোক এবং প্রচলিত ভূমি-পরিমাপ রীতির একটু পরিচয় লওয়া প্রয়োজন।
এ ইঙ্গিত আমি আগেই করিয়াছি যে, শস্যভাণ্ডমানের সাহায্যেই প্রাচীন কালে ভূমিমান নির্ধারিত হইয়াছিল। কুল্যবাপ, দ্ৰোণবাপ, আঢ়বাপ ইত্যাদি নামই তাহার প্রমাণ। পাটক বোধহয় গোড়াতেই ছিল ভূমিমান। হলও তাহাই। খাড়ী (শুদ্ধ, খারী) কিন্তু শস্যভাণ্ডমান বলিয়াই মনে হয়, খাড়ী উচ্চতর মান, খাড়ীকা (ক-প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন, ক্ষুদ্রার্থে) বোধহয় নিম্নতর মান। খারী যে শস্যমান, তাহার প্রমাণ আমরকোষে আছে :
