বন, অরণ্য ইত্যাদি। বন, অরণ্য সকল ক্ষেত্রেই গ্রামের বাহিরে। একাধিক লিপিতে বনভূমি, অরণ্যভূমি দানের উল্লেখ আছে। অরণ্যভূমি পরিষ্কার করিয়া কী করিয়া গ্রামের পত্তন করা হইত, তাহার পরিচয় অন্তত একটি লিপিতে আছে। লোকনাথের ত্রিপুরা-পট্টোলীতে দেখিতেছি সুকবুঙ্গ বিষয়ে রাজা লোকনাথ সৰ্প-মহিষ ব্যাঘ্র-বরাহাধুষিত আটাবী ভূখণ্ডে চতুর্বেদবিদ্যবিশারদ দুই শত এগার জন ব্রাহ্মণ বসাইবার জন্য প্রচুর ভূমি দান করিয়াছিলেন; দানের প্রার্থনা জানাইয়াছিলেন ব্ৰাহ্মণ প্রদোষশৰ্মা। কৌটিল্যের বিধানে বন, অরণ্য ইত্যাদি ছিল রাষ্ট্রসম্পত্তি; ধর্মাচরণোদ্দেশ্যে অরণ্যভূমি ব্ৰাহ্মণকে দান করা যাইতে পারে, কৌটিল্য এই বিধানও দিয়াছেন। অরণ্যভূমি পরিষ্কার করিয়া কী করিয়া নূতন জনপদের পত্তন করিতে হয়, কৌটিল্য তাহারও ইঙ্গিত রাখিয়া গিয়াছেন। লোকনাথের লিপিটি কৌটিল্যের বিধানের অন্যতম ঐতিহাসিক প্রমাণ।
মাৰ্গ, বাট দুইই জনপদের লোক ও যানবাহন চলাচলের পথ। ইরদা তাম্রপট্টের আবষ্করস্থান তো আঁস্তাকুঁড় এবং সেই হেতু ঊষর ভূমির সঙ্গেই তাহার উল্লেখ।
০৫. ভূমির মাপ ও মূল্য
পঞ্চম হইতে সপ্তম শতক পর্যন্ত প্রাচীন বাঙলায় লিপিগুলিতে ভূমির মাপের ক্রম খুব সহজেই ধরিতে পারা যায়। সর্বোচ্চ ভূমিমান হইতেছে কুল্য অথবা কুল্যবাপ, তারপর দ্রোণ বা দ্রোণবাপ এবং সর্বনিম্ন মাপ আঢ়বাপ। কুল্য, দ্রোণ এবং আঢ় (পরবর্তী লিপিগুলির আঢ়ক, বর্তমান পূর্ববাঙলার আঢ়া) সমস্তই শস্যমান; এই শস্যমান দ্বারাই ভূমিমান নিরূপিত হইয়াছিল, ইহা কিছু অস্বাভাবিক নয়।
কুল্য বা কুল্যবাপ।। যে ভূমিতে বপন করা হয়, তাহা বাপক্ষেত্র; “উপ্যতেহস্মিন ইতি বাপঃক্ষেত্রম”। যে পরিমাণ বাপক্ষেত্রে এক কুল্য বীজ শস্য বপন করা যায়, সেই পরিমাণ ভূমি এক কুল্যবাপ ভূমি। দ্রোণবাপ এবং আঢ়বোপও যথাক্রমে এক দ্রোণ ও এক আঢ় বা আঢক শস্যবাপনযোগ্য ভূমি। কাহারও কাহারও মতে কুল্য পূর্ববাঙলার কুলা; এক কুল্য শস্য অর্থাৎ একটি কুলায় যত ধান বা শস্য ধরে তাহার বীজ যতটা পরিমাণ ভূমিতে বপন করা হয় তাহাই কুল্যবাপ। মৈমনসিংহ-শ্ৰীহট্ট-কাছাড় অঞ্চলে এখনও কুলুবায় কথা প্রচলিত, তাহাও কুল্যবাপ কথারই ভগ্ন রূপ।
দ্রোণবাপ ও আড়বাপ ৷। দ্রোণ (== কলস) বর্তমানে বাঙলার বহু জেলার পল্লীগ্রামে দোনে বা ডোনে রূপান্তরিত হইয়াছে। আঢ় এখনও আঢ়া নামে প্রচলিত। প্রাচীন আর্য ও কোষকারদের মতে এক কুল্যবাপ ভূমি আট দ্রোণবাপের সমান, এক দ্রোণবাপ চার আঢ়বাপের সমান, এক আঢ়বাপ চার প্রস্থের সমান। এক কুল্যবাপ যে আট দ্রোণের সমান, তাহা লিপিপ্রমাণ দ্বারাও সমর্থিত হয়। পাহাড়পুর-লিপিতে ১২ দ্ৰোণবাপ যে ১ ১/২ (দেড়) কুল্যবাপের সমান, তাহা পরিষ্কার ধরা যায়। বৈগ্রাম-লিপির ইঙ্গিতও তাহাই।
এই ইঙ্গিত প্রাচীন সাহিত্য-ঐতিহ্য দ্বারাও সমর্থিত হয়। কুল্যই হোক আর দ্রোণই হোক, এ-সমস্তই ধান্যের আধার, যেহেতু ধান্যই বাঙলার প্রধানতম শস্য। মনুসংহিতায় দ্রোণ বলিতেই ধান্যদ্রোণের উল্লেখ, এবং এই ধান্যদ্রোণেরই ব্যাখ্যা করিয়াছেন বাঙালী কুলুকভট্ট। এই কুলুকভট্ট, রঘুনন্দন এবং শব্দকল্পদ্রুম কোষ-সংকলয়িতার মতে :
৮ মুষ্টি = ১ কুঞ্চি
৮ কুঞ্চি = ১ পুস্কল
৪ পুস্কলে = ১ আঢ়ক (আঢ়)
৪ আঢ়কে = ১ দ্রোণ
এবং মেদিনীকোষের মতে ৭ দ্রোণ = ১ কুল্য। শব্দকল্পদ্রুমে বলা হইয়াছে, এক আঢ়কে সাধারণত ১৬ হইতে ২০ সের ধান ধরে, অর্থাৎ এক দ্রোণে ৬৪ হইতে ৮০ সের, এক কুল্যে ৫১২ হইতে ৬৪০ সে অর্থাৎ ১২ মন ৩২ সের হইতে ১৮ মন। এই পরিমাণ ধানের বীজ যে পরিমাণ ভূমিতে বপন করা হইত। সেই পরিমাণ ভূমি হয়তো এক কুল্যবাপ। কিন্তু এ সম্বন্ধে স্থির নিশ্চয় করিয়া কিছু বলিবার উপায় নাই।
কুল্যবাপাই হোক, আর দ্রোণবাপ বা আঢ়বাপ যাহাই হোক, মাপা হইত। নলের সাহায্যে; এই নলই হইতেছে প্রাচীন উত্তর ও পূর্ববাঙলার প্রচলিত মানদণ্ড। বৈগ্রাম, পাহাড়পুর এবং ফরিদপুরের তিনটি পট্টোলীতেই বলা হইতেছে ৮, ৯ নলে (অষ্টক নব-নল্যাভ্যাম) এক মান। কিন্তু এই মান কি প্রস্থ × দৈর্ঘ্যের মান, ৮ এবং ৯ দুই প্রকার নলের মান, কুল্যবাপের মান, দ্রোণবাপ না আঢ়বাপের মান, তাহা সঠিক বলিবার উপায় নাই। এই নলেরও দৈর্ঘ্য নির্ভর করিত ব্যক্তিবিশেষের হস্তের দৈর্ঘ্যের উপর। বৈগ্রাম-লিপি অনুসারে দরকবীকৰ্ম নামক জনৈক ব্যক্তির হাতের মাপে, ফরিদপুর-লিপিত্ৰয় অনুসারে শিবচন্দ্ৰ নামক কোনও ব্যক্তির হাতের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী। অবশ্য ইহাদের হাতের মাপ গড়পড়তা সাধারণ হাতের দৈর্ঘ্যের মাপ কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি বলিয়া মনে করিলে কিছু অন্যায় করা হইবে না। এই ধরনের ব্যক্তিবিশেষের হাতের মাপের মান অষ্টাদশ শতকের মধ্যপাদেও বাঙলাদেশে প্রচলিত ছিল। রাজশাহীর নাটোর অঞ্চলে রামজীবনী হাতের মান তো সেদিনকার স্মৃতি।
ষষ্ঠ শতক ও অষ্টম শতকের দুইটি লিপিতে ভূমি-মাপের একটি নূতন মানের সংবাদ জানা যাইতেছে। বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘরপট্টোলী এবং দেবখড়গের ১নং আস্রফপুৱা-পট্টোলীতে পাটক নামে একটি মানের উল্লেখ আছে, এবং তাহার পরের ক্রমেই যে মানের নাম উল্লেখ আছে তাহা দ্রোণবাপ। দ্রোণের সঙ্গে পাটকের সম্বন্ধের ইঙ্গিত এই দুইটি পট্টোলীর দত্ত ভূমির পরিমাণ বিশ্লেষণ করিলে হয়তো পাওয়া যাইতে পারে। আস্রফপুর-পট্টোলীটি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, ৫০ দ্রোণে এক পাটক হয়। কিন্তু আস্রফপুর-পট্টোলীর পাঠের নির্ধারণ সন্দেহাতীত নয়। তাহা ছাড়া, সন্দেহ করিবার আরও কারণ গুণাইঘর লিপির সাক্ষ্য। এই পট্টোলী দ্বারা মহারাজ রুদ্রদত্ত পাচটি পৃথক ভূখণ্ডে সর্বশুদ্ধ ১১ পাটক ভূমি দান করিয়াছিলেন; এই পাঁচটি ভূখণ্ডের পরিমাপ তালিকাগত করিলে এইরূপ দাঁড়ায় :
