জোলা, জোলক, জোটিকা, খাট, খােটা, খাটিকা, খাড়ি, খাড়িকা, যানিকা, স্রোতিকা, গঙ্গিনিকা, হজিক, খাল, বিল ইত্যাদি। এই প্রত্যেকটি শব্দই প্রাচীন বাঙলা লিপিগুলিতে পাওয়া যায়। দত্ত অথবা বিক্ৰীত ভূমির সীমানির্দেশ উপলক্ষেই এইসব কথা ব্যবহারের প্রয়োজন হইয়াছে। জেলা কথাটি তো এখনও উত্তর ও পূর্ববাঙলায় বহুল ব্যবহৃত; যে অনতিপ্রসার খালের পথ দিয়া বিল, পুষ্করিণী, গ্রাম ইত্যাদির জল চলাচল করে, তাহারই নাম জেলা। জোলক, জোটিকা প্রভৃতি শব্দ জেলা শব্দেরই সমার্থক। খাট, খাটা, খাটিকা, খাড়ি ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে খাল অর্থে; যে জনপদ। খাল বহুল, তাহাই খাড়িমণ্ডল, আর চব্বিশ পরগনার দক্ষিণাংশ যে খালবহুল তাহা তো সকলেই জানেন। আর, খাদা বা খাটার পারে পারে যে জনপদ, তাহাই খাদা (? ) পার বা খােটাপার বিষয় (ধনাইদহ-লিপি)। যানিকা, স্রোতিকা, গঙ্গিনিকাও খাড়ি-খাটিকা কথার সমার্থক বলিয়াই মনে হয়। মরা নদীর খাদ অর্থে গঙ্গিনিকাও শব্দ উত্তরবঙ্গে এখনও ব্যবহৃত হয় বলিয়া অক্ষয়কুমার মৈত্ৰেয় মহাশয় বলিয়াছেন; কিন্তু গঙ্গিনিকার অপভ্ৰংশ গাঙ্গিনা উত্তর ও পূর্ববাঙলায় এখনও যে-কোেনও মরা পুরাতন খালকেই বুঝায়। হজ্জিকা যে নিম্ন জলাভূমি, তাহার ইঙ্গিত তো আগেই করিয়াছি। ঠিক এই অর্থে জলা বা জল্লা কথা মৈমনসিংহ, শ্ৰীহট্ট, কুমিল্লা প্রভৃতি জেলায় আজও প্রচলিত। খাল, খােটা, খাটিকা, খাড়িকা ইত্যাদি শব্দ সমার্থক। বিল কথার উল্লেখ দামোদর দেবের অপ্রকাশিত একটি লিপিতে আছে।
হট্ট, হট্টিকা, ঘট্ট, তর। হট্ট, হট্টিকা সহজবোধ্য এবং আমাদের হাট, বাজার অর্থেই সর্বত্র ইহার ব্যবহার। ঘট্ট=ঘাট, এবং তর= পারঘাট বা খেয়াপারাপারের ঘাট।
গর্ত, উষর (সগর্তোষর)—গর্ত তো সহজবোধ্য। বদ্ধ ডোবা, অনতিগভীর অনতিপ্রসার কর্ষণ-অযোগ্য ভূমি অর্থেই এই শব্দটির ব্যবহার লিপিতে আছে।
ঊষর অর্থে অনুর্বর কর্ষণ-অযোগ্য উচ্চভূমি। প্রতি গ্রামেই এই ধরনের গর্ত ও উষর ভূমি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আজও দেখিতে পাওয়া যায়। গর্ত এবং উষরভূমিসহ যেমন ভূখণ্ড দান বিক্রয় করা হইয়াছে, তেমনই জলস্থলসহও হইয়াছে। একই লিপিতে একই ভূখণ্ড “সগর্তোষর” এবং “সজলস্থল” দানের উল্লেখ লিপিগুলিতে অপ্রতুল নয়। কাজেই জল অর্থে এ-ক্ষেত্রে গর্ত বুঝাইতে পারে না; খুব সম্ভবত জলাশয়, পুষ্করিণী, কুম্ভ, ব্যাপী ইত্যাদি বুঝায়, এবং ইহাদের উল্লেখও কোথাও কোথাও আছে।
গোমার্গ, গোবাট, গোপথ, গোচর ইত্যাদি। গোচর সোজাসুজি গোচারণভূমি, যে ভূমিতে গরু মহিষ চরিয়া বেড়ায়। গোচরীভূমি সুপ্রাচীন কাল হইতেই গ্রামবাসীদের সাধারণ সম্পত্তি, এবং সাধারণত গ্রামের বহিঃসীমায়ই তাহার অবস্থিতি। এ সম্বন্ধে কৌটিল্য এবং ধর্মশাস্ত্ৰ-রচয়িতাদের সাক্ষ্য উল্লেখযোগ্য। কৌটিল্যের মতে গ্রামের চারিদিকে ১০০ ধনু (৪০০ হাত) অন্তর অন্তর বেড়া দেওয়া গোচরীভূমি থাকা প্রয়োজন; মনু এবং যাজ্ঞবল্ক্যের বিধানও অনুরূপ। ইহা কিছু আশ্চর্য নয় যে, লিপিগুলির ইঙ্গিতও তাঁহাই “যে পথে গ্রামের ভিতর হইতে গোরু, মহিষ প্রভৃতি গোচরভূমিতে যাতায়াত করে, সেই পথই গোমার্গ, গোবট অথবা গোপথ। গোবাট-(পূর্ববাঙলায় কোথাও কোথাও এখনও গোপাট), গোপথ প্রভৃতি শব্দ এই অর্থে এখনও বাঙলাদেশের অনেক জায়গায় প্রচলিত।
যে গোচরের কথা এইমাত্র বলিলাম, অনেকগুলি লিপিতে, বিশেষত অষ্টমশতকোত্তর লিপিগুলিতে, তাহার সঙ্গেই উল্লেখ আছে তৃণযুতি অথবা তৃণপুতি কথাটির। সীমা নির্দেশ উপলক্ষেই কথাটির ব্যবহার; যে-ভূমি দান করা হইতেছে, তাহার সীমা অনেক ক্ষেত্রেই “স্বসীমা (বচ্ছিন্না) তৃণযুতি (অথবা তৃণপুতি) গোচর পর্যন্ত।” এ কথা সহজেই বুঝা যাইতেছে যে, গোচরের মতো তৃণযুতির বা তৃণপূতির অবস্থানও গ্রামসীমায় বা দত্তভূমির একান্ত সীমায়। তৃণযুতি এবং তৃণপূতি ও তাঁহাদের অর্থ লইয়া পণ্ডিতমহলে অনেক তর্ক-বিতর্ক হইয়া গিয়াছে। প্রাচীনতর লিপিতে, যেমন সমুদ্রসেনের নিরমানন্দ তাম্রপটে কথাটি হইতেছে তৃণ-যুতি। কিন্তু সেখানে তৃণ ও যুতির মধ্যে আরও দুটি শব্দ আছে, কাজেই তৃণযুতি একটি কথা নয়। চাম্বা প্রদেশের লিপিতে একই প্রসঙ্গে গোযুতির উল্লেখ আছে; এবং গরু যেখানে বাধা হয়। সেই স্থানকেই বুঝাইতেছে। পাল আমলের লিপিগুলিতে কিন্তু তৃণ এবং যুতি কথা দুইটি একসঙ্গে এক কথা বলিয়াই পাইতেছি। সেন আমলের লিপিগুলির তৃণপুতি কথাটি কি তৃণযুতি কথাটির অশুদ্ধ রূপ? সমসাময়িক নাগর লিপিতে “য” ও “পা” বর্ণে পার্থক্য খুব বেশি নয়। যদি তাহা হয়, তাহা হইলে গোচরের সঙ্গেই তৃণযুতির উল্লেখ খুব অসাৰ্থক নয়। গ্রামসীমায় যে তৃণান্তীর্ণ ভূমিতে গোরু মহিষ বধিয়া রাখা এবং ঘাস খাওয়ানো হইত। তাঁহাই তৃণযুতি এবং তাঁহারই পাশে গোরু মহিষ চরিয়া বেড়াইবার গোচারণ ভূমি। আর, যদি তৃণপূতি কথাটি শুদ্ধ অবিকৃতরূপে আমরা পাইয়া থাকি, তাহা হইলে, কথাটিকে গোচরের বিশেষণরূপে ধরিয়া লওয়া যায় কি? কোষকারদের মতে পূতি এক ধরনের ঘাস, কাজেই তৃণ ও পূতি প্রায় সমার্থক। তৃণ পূতিপূর্ণ যে গোচরীভূমি, তাহাই তৃণপূতিগোচর এবং তাহা যে গ্রামসীমায় বা ক্ষেত্র ও খিলভূমির সীমায় অবস্থিত থাকিবে, তাহাতে আর আশ্চর্য কি?
