এইবার নীবীধর্ম, অক্ষয়নীবীধর্ম বা নীবীধর্মক্ষয় এবং অপ্ৰদাধর্ম কথা কয়টির অর্থ কী, তাহা জানিবার চেষ্টা করা যাইতে পারে। বাঙলাদেশের বাহিরে গুপ্তযুগের যে লিপির খবর আমরা জানি, তাহার মধ্যে অন্তত দুইটিতে অক্ষয়নীবী ধর্মের উল্লেখ আছে। কোষকারদের মতে নীবী কথার অর্থ মূলধন বা মূলদ্রব্য। কোনও ভূমি যখন নীবীধর্মানুযায়ী দান বা বিক্রয় করা হইতেছে, তখন ইহাই বুঝানো হইতেছে যে, দত্ত বা বিক্ৰীত ভূমিই মূলধন বা মূলদ্রব্য; সেই ভূমির আয় বা উৎপাদিত ধন ভোগ বা ব্যবহার করা চলিবে, কিন্তু মূলধনটি কোনও উপায়েই নষ্ট করা চলিবে না। তাহা হইলে নীবীধর্ম কথাটি দ্বারা যাহা সূচিত হইতেছে, অক্ষয়নীবীধর্ম দ্বারা তাহাই আরও সুস্পষ্ট করিয়া বুঝাইয়া দেওয়া হইতেছে, এই অনুমান অতি সহজেই করা চলে। যে ভূমি সম্পর্কে এই শর্তের উল্লেখ আছে, সেই ভূমিই কেবল “শাশ্বতচন্দ্রার্কতারকা” ভোগ করিতে পারা যায়, ইহাও খুবই স্বাভাবিক। লিপিগুলিতেও তাঁহাই দেখিতেছি। বস্তুত যে-সব ক্ষেত্রে নীবী বা অক্ষয়নীবী ধর্মের উল্লেখ আছে, সেই-সব ক্ষেত্রে প্রায় সর্বত্রই সঙ্গে সঙ্গে শাশ্বতচন্দ্রার্কতারকা ভোগের শর্তও আছে; যে-ক্ষেত্রে নাই, যেমন বিপ্লঘোষবাট গ্রামের লিপিটিতে, সে ক্ষেত্রেও তাহা সহজেই অনুমেয়। ধনাইদহ-লিপিতে আছে, নীবীধর্মক্ষয়েণ; এ ক্ষেত্রেও ভূমি বিক্রয় করা হইতেছে মূলধন অক্ষত রাখিবার রীতি অনুযায়ী, অর্থাৎ ভোক্তা স্বেচ্ছায় ঐ ভূমি দান বিক্রয় করিয়া হস্তান্তরিত করিতে পরিবেন না, ইহাই সূচিত হইতেছে। দামোদরপুরের ৩ নং লিপিতে শর্তটি হইতেছে “অপ্ৰদাধর্মেণ”। লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে, এই শর্তের সঙ্গে “শাশ্বতচন্দ্রার্কতারকা” ভোগের শর্ত নাই। যাহা হউক, অনুমান হয়, এই শর্তনুযায়ী যে ভূমি বিক্রয় করা হইতেছে, সেই ভূমিও দান অথবা বিক্রয়ের অধিকার ভোক্তার ছিল না। স্বেচ্ছামত ফিরাইয়া লইবার অধিকার দাতার অথবা রাজার ছিল কি না, তাহা বুঝা যাইতেছে না। যাহা হউক, মোটামুটিভাবে নীবীধর্ম অক্ষয়নীবীধর্মও অপ্রদাধর্ম বলিতে একই শর্ত বুঝা যাইতেছে; অন্তত আমাদের লিপিগুলিতে তাহা অনুমান করিতে বাধা নাই, যদিও মনে হয়, অপ্রদাধর্মের সঙ্গে নীবী বা অক্ষয়নীবী ধর্মের সূক্ষ্ম পার্থক্য হয়তো কিছু ছিল।
একটি জিনিস একটু লক্ষ্য করা যাইতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাইতেছে, যে ভূমি কোনও ধর্মপ্রতিষ্ঠানকে দান করা হইতেছে, সেই সম্পর্কেই শুধু অপ্ৰদাধর্ম বা অক্ষয়নীবীধর্মের উল্লেখ পাইতেছি। ইহার কারণ তো খুবই সহজবোধ্য। তাহা ছাড়া, সেই সব ক্ষেত্রেই কেবল রাজা রাজস্বের অধিকার ছাড়িয়া দিতেছেনঃ ইহাও কিছু অস্বাভাবিক নয়। ব্যতিক্রম দু-একটি আছে; কিন্তু সেই সব ক্ষেত্রেও দানের পাত্র কোনও ব্রাহ্মণ এবং তিনি দান গ্রহণ করিতেছেন কোনও ধর্মাচরণোদ্দেশ্যে। কোনও গৃহস্থ যেখানে ব্যক্তিগত ভোগের জন্য ভূমি ক্রয় অথবা দান গ্রহণ করিতেছেন, সে ক্ষেত্রে না আছে। কোনও চিরস্থায়ী শর্তের উল্লেখ, না আছে নিষ্কর করিয়া দিবার উল্লেখ।
এ-পর্যন্ত শুধু সপ্তমশতকপূর্ববতী লিপিগুলির কথাই বলিলাম। এই বিষয়ে পরবর্তী লিপিগুলির সাক্ষ্য জানা প্রয়োজন। অষ্টম হইতে আরম্ভ করিয়া ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত যত রাজকীয় ভূমি-দানলিপির খবর আমরা জানি, তাহার প্রত্যেকটিতেই ভূমিদানের শর্ত মোটামুটি একই প্রকার। শর্তাংশটি যে কোনও লিপি হইতে উদ্ধার করা যাইতে পারে। খালিমপুর লিপিতে আছে, “সদৃশপচারাঃ অকিঞ্চিৎপ্রগ্রাহ্যাঃ পরিহৃতসর্বপীড়াঃ ভূমিচ্ছিন্দ্ৰন্যায়েন আচন্দ্রার্কক্ষিতিসমকালং”; শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল-লিপিতে আছে, “সদশ্যপরাধা সচৌরোদ্ধারণা পরিহাতসৰ্বপীড়া আচাটভটপ্রবেশ অকিঞ্চিৎ প্রগ্রাহ্যা। সমস্ত রাজভোগকরহিরণ্যপ্রত্যায়সাহিতা…আচন্দ্রার্কক্ষিতিসমকালং যাবৎ ভূমিচ্ছিন্দ্ৰন্যায়েন ৷” বিজয়সেনের বারাকপুর-লিপিতে আছে, “সহ্যদশাপরাধা পরিহৃতসর্বপীড়া আচট্টভট্টপ্রবেশ অকিঞ্চিৎপ্রাগ্রাহ্যা সমস্তরাজভোগকরহিরণ্যপ্রত্যায়সহিত।–আচন্দ্রার্কক্ষিতিসমকালং যাবৎ ভূমিচ্ছিন্দ্ৰন্যায়েন তাম্রশাসনীকৃত্য প্রদত্তাম্মাভিঃ ”। দেখা যাইতেছে, ধর্মপালের খালিমপুর-লিপিতে যাহা আছে, তাহাই পরবর্তী লিপিগুলিতে বিস্তৃততরভাবে ব্যাখ্যাত হইয়াছে মাত্র।
সদশপচারাঃ বা সহ্যদশাপরাধাঃ আমাদের দণ্ডশ্বাস্ত্ৰে দশ প্রকারের অপচার বা অপরাধের উল্লেখ আছে। তিনটি কায়িক অপরাধ, যথা-চুরি, হত্যা এবং পরস্ত্রীগমন; চারিটি বাচনিক অপরাধ, যথা-কটুভাষণ, অসত্যভাষণ, অপমানজনক ভাষণ এবং বস্তুহীন ভাষণ; তিনটি মানসিক অপরাধ, যথা- পরিধানে লোভ, অধর্ম চিন্তা, এবং অসত্যানুরাগ। এই দশটি অপরাধ রাজকীয় বিচারে দণ্ডনীয় ছিল; এবং সেই অপরাধ প্রমাণিত হইলে অপরাধী ব্যক্তিকে জরিমানা দিতে হইত। রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়ের মধ্যে ইহাও অন্যতম। কিন্তু রাজা যখন ভূমি দান করিতেছেন, তখন সেই ভূমির অধিবাসীদের জরিমানা হইতে য়ে আয়, তাহা ভোগ করিবার অধিকারও দান-গ্ৰহীতাকে অৰ্পণ করিতেছেন।
সচৌরোদ্ধারণা ।৷ চোর-ডাকাতের হাত হইতে রক্ষণাবেক্ষণ করিবার দায়িত্ব হইতেছে রাজার; কিন্তু তাহার জন্য জনসাধারণকে একটা কর দিতে হইত। কিন্তু রাজা যখন ভূমি দান করিতেছেন, তখন দানগ্রহীতাকে সেই কর ভোগের অধিকার দিতেছেন।
