পরিহৃতসর্বপীড়া ।৷ সৰ্বপ্রকার পীড়া বা অত্যাচার হইতে রাজা দত্ত ভূমির অধিবাসীদের মুক্তি দিতেছেন। কোনও কোনও পণ্ডিত পারিশ্রমিক না দিয়া আবশ্যিক শ্ৰম গ্রহণ করা অর্থে এই শব্দটি অনুবাদ করিয়াছেন। আমার কাছে। এ অর্থ খুব যুক্তিযুক্ত মনে হইতেছে না, যদিও বহু প্রকারের রাজকীয় পীড়া বা অত্যাচারের মধ্যে ইহাও হয়তো একপ্রকার পীড়া বা অত্যাচার ছিল, এ অনুমান করা যাইতে পারে। কিন্তু পরিহাতিসর্বপীড়াঃ বলিতে যথার্থ কী বুঝাইত, তাহার সুস্পষ্ট ও সুবিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রতিবাসী কামরূপ রাজ্যের একাধিক লিপিতে আছে। বলবৰ্মার নওগাঁ-লিপিতে অনুরূপ প্রসঙ্গেই উল্লিখিত আছে, “রাজ্ঞীরাজপুত্ররাণকরাজবল্লভমহল্লকপ্ৰৌঢ়িকাহাস্তিবন্ধিকনৌকাবন্ধিকচৌরোদ্ধরণিকদাণ্ডিকদাণ্ডপশিক- ঔপরিকরিক ঔৎখেটিকচ্ছত্রবাসাদুপদ্রবকারিণামপ্রবেশ।”রত্নপালের প্রথম তাম্রশাসনে আছে, “হস্তিবন্ধনৌকাবন্ধচৌরোদ্ধারণদণ্ড পাশে পরিকরনোনানিমিত্তোৎখেটনহস্তাশ্বোষ্ট্রগো- মহিষাজীবিকপ্রচারপ্রভৃতিনাং বিনিবারিতসর্বপীড়া…”। কামরূপের অন্যান্য দু-একটি লিপিতেও অনুরূপ উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। তাহা হইলে সর্বপীড়া বলিতে কী কী পীড়া বা অত্যাচার বুঝায়, তাহার ব্যাখ্যা কতকটা সবিস্তারেই পাওয়া যাইতেছে। রাজ্ঞী হইতে আরম্ভ করিয়া রাজপরিবারের লোকেরা, ও রাজপুরুষেরা যখন সফরে বাহির হইতেন, তখন সঙ্গের নৌকা, হাতি, ঘোড়া, উট, গরু, মহিষের রক্ষক যাহারা তাহারা গ্রামবাসীদের ক্ষেত, ঘর-বাড়ি, মাঠ, পথ, ঘাটের উপর নৌকা এবং পশু ইত্যাদি বাধিয়া ও চরাইয়া উৎপাত অত্যাচার ইত্যাদি করিত। অপহৃত দ্রব্যের উদ্ধারকারী যাহারা, তাহারা; দাণ্ডিক ও দাণ্ডপাশিক অর্থাৎ যাহারা চোর ও অন্যান্য অপরাধীদের ধরিয়া বাধিয়া আনিত, যাহারা দণ্ড দিত, তাহারাও সময়ে অসময়ে গ্রামবাসীদের উপর অত্যাচার করিত। যাহারা প্রজাদের নিকট হইতে কর এবং অন্যান্য নানা ছোটখাটো শুল্ক আদায় করিত, তাহারাও প্রজাদের উৎপীড়ন করিতে ক্ৰটি করিত না। ইহার কার্যোপলক্ষে গ্রামে অস্থায়ী ছত্রাবাস (camp) স্থাপন করিয়া বাস করিত বলিয়া অনুমান হয়, এবং শুধু গ্রামবাসীরাই নয়, রাজা নিজেও বোধ হয়, ইহাদের উপদ্রবকারী বলিয়াই মনে করিতেন; বস্তুত রাজকীয় লিপিতেই ইহাদের উপদ্রবকারী বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। আমাদের বাঙলাদেশের লিপিগুলিতে এই-সব উপদ্রবের বিস্তারিত উল্লেখ নাই, পরিহাতিসর্বপীড়াঃ বলিয়াই শেষ করা হইয়াছে। তবে, একটি উৎপাতের উল্লেখ দৃষ্টান্তস্বরূপ করা হইয়াছে; যে ভূমি দান করা হইতেছে, বলা হইতেছে সে ভূমি আচাটভােট অথবা অচট্টভট্টপ্রবেশ, চট্টভট্টরা সেই ভূমিতে প্রবেশ করিতে পরিবে না। চাট অথবা চট্ট বলিতে খুব সম্ভব, এক ধরনের অস্থায়ী সৈনিকদের বুঝাইত বলিয়া অনুমান হয়। চাম্বা প্রদেশের কোনও কোনও লিপিতে পরগনা বা চার্যকর্তা অর্থে চাট কথাটির ব্যবহার পাওয়া যায়। ভট্ট বা ভাট কথাটি ভীড় অর্থে কেহ কেহ ব্যবহার করিয়াছেন, কিন্তু রাজার ভূত্য বা সৈনিক অর্থে কথাটি গ্রহণ করাই নিরাপদ। যাহা হউক, চট্টভট্ট দুইই রাজভৃত্য অর্থে গ্রহণ করা চলিতে পারে।
অকিঞ্চিৎপ্রগ্রাহ্য ।৷ দত্ত ভূমি হইতে আয়স্বরূপ কোনও কিছু গ্ৰহণ করিবার অধিকারও রাজা ছাড়িয়া দিতেছেন, এই শর্তটির উল্লেখ লিপিতে আছে। এই-সব অধিকারের ফলভোগী হইতেছেন দানগ্রহীতা; সেইজন্যই ইহার পর বলা হইতেছে”সমস্তরাজভাগভোগকরহিরণ্যপ্রত্যায়সহিতা’, অর্থাৎ সেই ভূমি হইতে ভাগ, ভোগ, কর, হিরণ্য ইত্যাদি যে-সব আয় আইনত রাজার অথবা রাষ্ট্রেরই ভোগ্য, সেই-সব সমেত ভূমি দান করা হইতেছে, এবং বলা হইতেছে, দানগ্রহীতা “আচন্দ্রার্কক্ষিতিসমকালং” অর্থাৎ শাশ্বত কাল পর্যন্ত সেই ভূমি ভোগ করিতে পরিবেন।
সর্বশেষ শর্ত হইতেছে ভূমিচ্ছিদ্রন্যায়েন। ভূমি দান করা হইতেছে ভূমিচ্ছিদ্র ন্যায় বা যুক্তি অনুযায়ী। এই কথাটির নানা জনে নানা ব্যাখ্যা করিয়াছেন। বৈজয়ন্তী’গ্ৰন্ত মতে যে ভূমি কর্ষণের অযোগ্য, সেই ভূমি ভূমিচ্ছিদ্র; এই অর্থে কৌটিল্যও কথাটির ব্যবহার করিয়াছেন। বৈদ্যদেবের কমৌলি-লিপিতে আছে, “ভূমিচ্ছদ্রাঞ্চ অকিঞ্চিৎকরগ্রাহ্যাম” অর্থাৎ কর্ষণের অযোগ্য ভূমির কোনও কর বা রাজস্ব নাই। কর বা রাজস্ব নাই, এই যে রীতি অর্থাৎ রাজস্ব মুক্তির রীতি অনুযায়ী যে ভূমি-দান, তাহাই ভূমিচ্ছিদ্রনায়ানুযায়ী দান, এবং লিপিগুলিতে এই শর্তেই ভূমি দান করা হইয়াছে, সমস্ত করা হইতে ভোক্তাকে মুক্তি দিয়া।
লিপিগুলির স্বরূপ বিস্তৃতভাবে উপরে ব্যাখ্যা করা হইল। সঙ্গে সঙ্গে ভূমি-দান ও ক্রয়-বিক্রয় সম্বন্ধে আমরা অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য জানিলাম। এইবার ভূমি-সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ লওয়া যাইতে পারে। ভূমি-সম্পর্কিত কী কী সংবাদ স্বভাবতই আমাদের জানিবার ঔৎসুক্য হয়, তাহার তালিকা করিয়া লইলে তথ্য নির্ধারণ সহজ হইবে বলিয়া মনে হইতেছে। নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ে জ্ঞাতব্য তথ্যের হিসাব লওয়া যাইতে পারে।
১) ভূমির প্রকারভেদ
২) ভূমির মাপ ও মূল্য
৩) ভূমির চাহিদা
৪) ভূমির সীমা-নির্দেশ
৫) ভূমির উপস্বত্ব, কর, উপরিকর ইত্যাদি।
৬) ভূমিস্বত্বাধিকারী কে? রাজার ও প্রজার অধিকার। খাস প্রজা, নিম্ন প্ৰজা ইত্যাদি।
০৪. ভূমির প্রকারভেদ
অষ্টমশতকপূর্ববতী লিপিগুলিতে আমরা প্রধানত তিন প্রকার ভূমির উল্লেখ পাইতেছি; বাস্তু, ক্ষেত্র ও খিলক্ষেত্র। যে ভূমিতে লোকে ঘরবাড়ি তৈরি করিয়া বাস করিত অথবা বাসযোগ্য যে ভূমি, তাহা বাস্তুভূমি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে, যেমন বৈগ্রাম-পট্টোলীতে, বাস্তুভূমিকে স্থলবাস্তুভূমিও বলা হইয়াছে। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের কোনও কোনও লিপিতে “ব্যাভূ” বলিয়া বাস্তুভূমি নির্দেশ করা হইয়াছে, যথা, দামোদর দেবের অপ্রকাশিত চট্টগ্রাম-লিপিতে, বিশ্বরূপ সেনের সাহিত্য-পরিষৎ লিপিতে। “ব্যাভূ” “চতুঃসীমাবচ্ছিন্ন বাস্তুভূমি”, অর্থাৎ সীমানির্দিষ্ট বসবাস করিবার ভূমি।
