এই পর্বের লিপিগুলিতে দেখিলাম, ভূমিদান করিতেছেন সর্বত্রই রাজা স্বয়ং, কিন্তু সপ্তম-অষ্টম শতকের আগেকার লিপিগুলিতে দেখিয়াছি, ধর্মপ্রতিষ্ঠানের ব্যয়নির্বাহের জন্য ভূমিদানি গৃহস্থ ব্যক্তিরাই করিতেছেন, এবং দানের পূর্বে সেই ভূমি মূল্য দিয়া রাজার নিকট হইতে কিনিয়া লইতেছেন। দু-চার ক্ষেত্রে রাজাও ভূমিদান করিতেছেন, কিন্তু তাহাও ক্রেতার পক্ষ হইতেই; তিনি শুধু দানকার্যের পুণ্যের যষ্ঠভাগ (ধৰ্মষড়ভাগং) লাভ করিতেছেন। এ প্রশ্ন স্বাভাবিক যে, আগেকার পর্বে অর্থাৎ সপ্তম শতকের পূর্বে ধৰ্ম-প্রতিষ্ঠানের যত ভূমিদানি তাহা অধিকাংশ গৃহস্থ ব্যক্তিরাই করিতেছেন কেন, আর উত্তরপর্বে ভূমিদানি শুধু রাজাই করিতেছেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কি এই যে, ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিষ্ঠা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব আগে ব্যক্তিগতভাবে পুরজনপদবাসী গৃহস্থরাই করিতেন, এবং পরে ক্রমশ সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে রাজাই গ্রহণ করিয়াছিলেন? ব্যক্তিগতভাবে ব্রাহ্মণদের যে-সব ভূমিদান করা হইত, সে-সব দান সম্বন্ধে এ ধরনের কোনও প্রশ্নের বা উত্তরের অবকাশ নাই। এইরূপ ব্যক্তিগত দানের পরিচয় ঘাঘরাহাটি এবং বিপ্লঘোষবাট পট্টোলী দুইটিতে পাওয়া যায়। পাল ও সেন আমলের লিপিতে এই পরিচয় প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়।
গুপ্ত আমল হইতে আরম্ভ করিয়া সমস্ত ভূমি দান-বিক্রয়ের পট্টোলীতেই দেখা যায় পুস্তপাল (record-keeper) নামক জনৈক রাজপুরুষের উল্লেখ। কেন্দ্রীয় ভুক্তি-সরকারে যেমন, আহার এবং মণ্ডল-অধিষ্ঠানেও তেমনই পুস্তপাল-নামীয় একজন রাজপুরুষ নিযুক্ত থাকাই যেন ছিল। রীতি। পট্টোলীগুলি একটু অভিনিবেশে পাঠ করিলেই মনে হয়, ভূমি-সংক্রান্ত সমস্ত কাগজপত্রের দপ্তরের মালিকই ছিলেন তিনি, এবং তাঁহার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য ছিল তাহার অধীন সমস্ত ভূমির সীমা, স্বত্ব, অধিকার বিভাগ, অর্থাৎ জরিপ সম্বন্ধীয় সমস্ত সংবাদ ও হিসাব সংগ্রহ করা এবং তাহা প্রস্তুত রাখা। খুবই সম্ভব, এইসব সংবাদ লিপিবদ্ধ থাকিত তালপাতায় ংবা ঐ জাতীয় কোনও বস্তুর উপর; আজ আর সে-সব দপ্তর উদ্ধারের কোনও উপায় নাই। জমি যখন দান-বিক্রয় করা হইত এবং রাজসরকারে পট্টীকৃত বা রেজেস্ট্রি করা হইত, কেবল তখনই প্রয়োজন হইত তাম্রশাসনের; তাহারই দুই-চারিটি ইতস্তত আমাদের হাতে আসিতেছে। পাল আমলে না হউক, অন্তত সেন রাজাদের আমলে কোনও না কোনও প্রকার পুঙ্খানুপুঙ্খ জমি-জরিপের বন্দোবস্ত ছিল এবং সমস্ত জমির সীমা, স্বত্ব, অধিকার, শস্যোৎপত্তির গড়পড়তা পরিমাণ, কর বা খাজনা ইত্যাদির পরিপূর্ণ সংবাদ পুস্তপালের দপ্তরে মজুত থাকিত, এ অনুমান প্রায় ঐতিহাসিক সত্য বলিয়া স্বীকার করা যাইতে পারে। শুধু যে দত্ত ভূমি সম্বন্ধেই এই জরিপ করা হইত। তাহা মনে হয় না; রাজ্যের সমস্ত বাস্তু, ক্ষেত্র ও খিল এবং অন্যান্য ভূমিও এই ধরনের জরিপের অন্তৰ্গত ছিল, এই অনুমানও সহজেই করা চলে। সেন আমলের পট্টোলীগুলিতে জমি-সংক্রান্ত সংবাদ এমন সুসংবদ্ধ, সুনির্দিষ্ট ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেওয়া হইয়াছে যে, এই ধরনের জরিপের সম্ভাব্য অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করা কঠিন।
০৩. ভূমিদানের শর্ত
ভূমিদান কী কী শর্তে করা হইত, কী কী দায় ও অধিকার বহন করিত তাহা এইবার আলোচনা করা যাইতে পারে। এ বিষয়ে পূর্বপর্বের লিপিগুলির সংবাদ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। যথামূল্যে প্ৰস্তাবিত ভূমি-ক্রয়ের জন্য গৃহস্থ আবেদন যখন জানাইতেছেন, তখন তিনি ভূমি ক্রয় করিতে চাহিতেছেন, সোজাসুজি এ কথা বলিতেছেন না; বলিতেছেন, “আপনি আমার নিকট হইতে যথারীতি যথানির্দিষ্ট হারে মূল্য গ্ৰহণ করিয়া এই ভূমি আমাকে দান করুন।” এই যে ক্রয়ের প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে দানের প্রার্থনাও করা হইতেছে, ইহার অর্থ কী? যে ভূমির জন্য মূল্য দেওয়া হইতেছে, তাহাই আবার দানের জন্যও প্রার্থনা করা হইতেছে, কেন, এ কথার উত্তর পাইতে হইলে ভূমি কী শর্তে দান-বিক্রয় হইতেছে, তাহা জানা প্রয়োজন। ধনাইদহ লিপিতে আবেদক ভূমি প্রার্থনা করিতেছেন, “নীবীধর্মক্ষয়েণ”; দামোদরপুরের ১ নং লিপিতে আছে, “শাশ্বতচন্দ্রার্কতারকভোজ্যে তয়া নীবীধর্মেণ দাতুমিতি”; ২ নং লিপিতে “অপ্ৰদক্ষিয়নী [বী]-মর্যদয়া দাঁতুমিতি”; ৩ নং লিপিতে “হিরণ্যমুপসংগৃহ্য সমুদয়-বাহ্যাপ্রিদখিলক্ষেত্রানাং প্রসাদং কর্তৃমিতি-”; ৫ নং লিপিতে “অপ্ৰদাধর্মেণ…শাশ্বতকালভোগ্যা”, পাহাড়পুর-পট্টোলীতে আছে, “শাশ্বতকালেলাপভোগ্যক্ষয়নীবী সমুদয়বাহাপ্রতিকর-”; বৈগ্রাম-পট্টোলীতে “সমুদয় বাহ্যাদি-অকিঞ্চিৎ প্রতিকরাণাম শাশ্বতচন্দ্রার্কতাৱকভোজ্য নাম অক্ষয়নী ব্যা—; বিপ্লষোষবাট গ্রামের পট্টোলীতে আছে, “অক্ষয়ানী [বী]-ধর্মণাপ্রদত্তঃ”। অন্যান্য লিপিগুলিতে শুধু ক্ৰয়-বিক্রয়ের কথাই আছে, কোনও শর্তেও উল্লেখ নাই। যাহা হউক, যে-সব লিপিতে শর্তের উল্লেখ পাইতেছি, দেখিতেছি। সেই শর্ত একাধিক প্রকারের : ১. নীবী ধর্মের শর্ত, ২৫ অপ্ৰদা ধর্মের শর্ত, ৩০ অক্ষয়নীবী (ধর্মের) শর্ত এবং ৪- অপ্রদাক্ষয়নীবীর শর্ত। বৈগ্রাম ও পাহাড়পুর-পট্টিলী দুটিতে অক্ষয়নীবী ধর্মের শর্তের সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি শর্তের উল্লেখ আছে, সেটি হইতেছে, “সমুদয় বাহ্যাপ্রতিকর” বা “সমুদয়বাহ্যাদি-অকিঞ্চিত প্রতিকর”, অর্থাৎ ভূমি প্রার্থনা করা হইতেছে এবং ভূমি দান করা হইতেছে অক্ষয়নীবীধর্মােনু্যায়ী এবং সকল প্রকার রাজস্ব-বিবর্জিতভাবে। ইহার অর্থ এই যে, ভূমি-গ্ৰহীতা সুচিরকাল, চন্দ্ৰসূৰ্যতারার স্থিতিকাল পর্যন্ত ভূমি ভোগ করিতে পরিবেন, কোনও রাজস্ব না দিয়া। রাজা বা রাষ্ট্র যে সুচিরকালের জন্য রাজস্ব হইতে ক্রেতা ও ক্রেতার বংশধরদের মুক্তি দিতেছেন, এইখানেই হইতেছে দান কথার অন্তর্নিহিত অর্থ। ভূমির প্রচলিত মূল্য গ্রহণ করিয়া রাজা যে ভূমি বিক্রয় করেন; সেই ভূমিই যখন অক্ষয়নীবীধর্মনুযায়ী “সমুদয় বাহ্যাপ্রতিকর” করিয়া দেন, তখন তাহা দানও করেন, এবং তাহা করেন বলিয়াই ভূমি বিক্রয় করিয়াও তিনি “ধৰ্মষড়ভাগের” অর্থাৎ দানপুণ্যের এক-ষষ্ঠ ভাগের অধিকারী হন। রাজা ভূমির আয়ের এক-ষষ্ঠ ভাগের অধিকারী, সেই এক-ষষ্ঠ ভাগের অধিকার যখন তিনি পরিত্যাগ করেন, তখন তিনি দানপুণ্যের এক-ষষ্ঠভাগের অধিকারী হইবেন, ইহাই তো যুক্তিযুক্ত। এই অর্থে ছাড়া পাহাড়পুর-পট্টোলীর “যৎ পরম-ভট্টািরক-পাদানাম অর্থপচয়ো ধৰ্মষড়ভাগোপ্যায়নঞ্চ ভবতি” এ কথার কোনও সংগত যুক্তি খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন। বৈগ্রাম-পট্টোলীতে এই কথাই আরও পরিষ্কার করিয়া বলা হইয়াছে। ৩ নং দামোদরপুর-পট্টোলীতেও পরমভট্টারক মহারাজের পুণ্যলাভের যে ইঙ্গিত আছে, তাহাও তিনি “সমুদয়-বাহ্যাপ্রদ” অর্থাৎ সর্বপ্রকারের দেয়-বিবর্জিত করিয়া ভূমি বিক্রয় করিতেছেন বলিয়াই।
