তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, আগে যে দানবিক্রয়-সম্পর্কিত পট্টোলীগুলির উল্লেখ করিয়াছি সেগুলি সদ্যোক্ত পট্টোলীগুলি হইতে বিভিন্ন। পূর্বোক্ত পট্টোলীগুলি প্রথমত ভূমি-ক্রয়বিক্রয়ের শাসন এবং দ্বিতীয়ত ভূমি-দানের শাসনও বটে। সদ্যোক্ত পট্টোলীগুলি শুধুই ভূমি দানের শাসন। ভূমি-ক্রয়ের শাসন কাহাকে বলেই বাৰ্হস্পত্য ধর্মশাস্ত্ৰে তাহার উল্লেখ আছে। বৃহস্পতি বলেন, ন্যায্য মূল্য দিয়া কোনও ব্যক্তি যখন কোনও বাস্তু, ক্ষেত্র অথবা অন্য কোনও প্রকার ভূমি-ক্রয় করেন এবং মূল্যের উল্লেখসমেত ক্রয়কার্যের একটি শাসন লিপিবদ্ধ করিয়া লন, তখনই সে শাসনকে বলা হয় ভূমি-ক্ৰয়ের শাসন। পূর্বোক্ত লিপিগুলি যে বৃহস্পতি-কথিত ভূমি-ক্রয়ের শাসন এ সম্বন্ধে তাহা হইলে কোনও সন্দেহ নাই। জার্মান পণ্ডিত য়লি (Jolly) মনে করেন, বৃহস্পতি খ্ৰীষ্টাত্তর ৬ষ্ঠ অথবা ৭ম শতকের লোক; যদি তাহা হয় তাহা হইলে বৃহস্পতি পূর্বোক্ত পট্টোলীগুলির প্রায় সমসাময়িক। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বাস্তু ও বাস্তু-বিক্রয় অধ্যায়ে সর্বপ্রকার ভূমি, ঘরবাড়ি, উদ্যান, পুষ্করিণী, হ্রদ, ক্ষেত্র ইত্যাদি বিক্রয়ের ক্রম ও রীতির উল্লেখ আছে; এই অধ্যায় হইতে আমরা জানিতে পাই, এই ধরনের ক্রয়-বিক্রয় কুটুম্ব, প্রতিবাসী এবং সম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্মুখে হওয়া উচিত, এবং যিনি সর্বোচ্চ মূল্য দিয়া ভূমি ডাকিয়া লইয়া ক্রয় করিতে রাজী হইবেন তাহার কাছেই প্রস্তাবিত ভূমি বিক্রয় করিতে হইবে। ভূমির মূল্যের উপর ক্রেতাকে রাজ সরকারে একটা করাও দিতে হইবে, এ কথাও কৌটিল্য বলিতেছেন। মূল্যের উপর কোনও প্রকার কারের উল্লেখ আমাদের লিপিগুলিতে নাই; ইহার কারণ সহজেই অনুমেয়। ক্রীত ভূমিমখণ্ডগুলি প্রায় সমস্তই ধর্মাচরণোদেশে দানের জন্য, এবং সেই হেতুই তাহা করারহিত। তবে, ভূমি-বিক্রয়ের ব্যাপারটা যে কুটুম্ব, প্রতিবাসী এবং সম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্মুখেই নিষ্পন্ন হইত। তাহার উল্লেখ প্রায় প্রত্যেক লিপিতেই পাওয়া যায়। কতকটা পূর্বোক্ত শাসনানুরূপ ভূমি-বিক্রয়ের অন্তত একটি পাথুরে প্রমাণের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। এই লিপিটি নাসিকের একটি বৌদ্ধ-গুহার প্রাচীরে উৎকীর্ণ, এবং ইহার তারিখ খ্ৰীষ্টাত্তর দ্বিতীয় শতকের প্রথমার্ধ। ইহাতে উল্লেখ আছে যে, ক্ষত্রপ নহপানের জামাতা, দীনীকপুত্র উষবদান্ত জনৈক ব্ৰাহ্মণের নিকট হইতে ৪,০০০ কার্ষপণ মুদ্রায় কিছু ক্ষেত্রভূমি ক্রয় করিয়াছিলেন, তাহা গুহাবাসী ভিক্ষুসংঘকে দান করিয়াছিলেন। উষবদাত ভূমি ক্ৰয় করিয়াছিলেন জনৈক গৃহস্থের নিকট হইতে, রাজা বা রাষ্ট্রের নিকট হইতে নয়, কাজেই সে ক্ষেত্রে যে সুবিস্তৃত ক্রমের উল্লেখ প্রাচীন বাঙলার পূর্বোক্ত লিপিগুলিতে আছে তাহার কোনও প্রয়োজনই হয় নাই। আমাদের লিপিগুলিতে কিন্তু সাধারণভাবে একটি দৃষ্টান্তও পাইতেছি না যেখানে কোনও গৃহস্থ কোনও ভূমি। বিক্রয় করিতেছেন; সর্বত্রই যে ভূমি বিক্রীত হইতেছে, তাহা রাজা বা রাষ্ট্রকর্তৃকই হইতেছে। এ প্রশ্ন স্বভাবতই মনকে অধিকার করে, প্রাচীন বাঙলার সুদীর্ঘ কালের মধ্যে কোনও গৃহস্থই কি ভূমি বিক্রয় করেন নাই? সে অধিকার কি তাহার ছিল না? যদি করিয়া থাকেন, যদি সে-অধিকার থাকিয়া থাকে, তাহা হইলে তাহা কী উপায়ে বিধিবদ্ধ হইত? সে বিক্রয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্বন্ধ কিরূপ ছিল? কৌটিল্যের ইঙ্গিতানুযায়ী ভূমির মূল্যের উপর রাজাকে বা রাষ্ট্রকে কিছু —ণামী দিতে হইত কি, না। রাষ্ট্র রাজস্ব লইয়াই সন্তুষ্ট থাকিত? এইসব অত্যন্ত সংগত ও স্বাভাবিক প্রশ্নের কোনও উত্তর পাইবার সূত্রও লিপিগুলিতে আবিষ্কার করা যায় না।
এ-পর্যন্ত খ্রীষ্টোত্তর অষ্টম শতক পর্যন্ত লিপিগুলির কথাই বলিলাম। এইবার অষ্টম হইতে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত লিপিগুলি একটু বিশ্লেষণ করা যাইতে পারে। প্রথমেই বলা যায়, যতগুলি শাসনের সংবাদ আমরা জানি, তাহার সাব-কটিই ভূমি-দানের শাসন, ভূমি ক্ৰয়-বিক্রয়ের শাসন একটিও নয়। এই পর্বের শাসনগুলিকে সেইজন্য পূর্বোক্ত গুণাইঘর, বিপ্লঘোষবাট, লোকনাথ বা আম্রফপুর লিপিগুলির সঙ্গে তুলনা করা যাইতে পারে, যদিও পাল ও সেন আমলের লিপিগুলি অনেকটা দীর্ঘায়িত। অন্য কারণেও এই পর্বের কোনও কোনও শাসনের সঙ্গে গুণাইঘর লিপি অথবা লোকনাথের লিপিটির কতকটা তুলনা করা চলে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ধর্মপালের খালিমপুর লিপিটির উল্লেখ করা যাইতে পারে। মহাসামন্তাধিপতি শ্ৰীনারায়ণ বৰ্মা একটি নারায়ণ-মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন; সেই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও পূজার দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি যুবরাজ ত্ৰিভূবনপালকে দিয়া রাজার কাছে চারিটি গ্রাম প্রার্থনা করিয়াছিলেন, এবং প্রার্থনানুযায়ী রাজা তাহা দান করিয়াছিলেন। এই ধরনের দৃষ্টান্ত আরও দু-একটি উল্লেখ করা যাইতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ শাসনে এইরূপ প্রার্থনা বা অনুরোধের কোনও উল্লেখ নাই। রাজা যেন স্বেচ্ছায় ভূমি দান করিতেছেন, এই রকম ধারণা জন্মায়। অথবা, এমনও হইতে পারে, অনুরোধ বা প্রার্থনা করা হইয়াছিল, কিন্তু তাহা আর বাহুল্য অনুমানে উল্লিখিত হয় নাই। এই ধরনের লিপিগুলির সঙ্গে বিপ্লঘোষবাট ও আস্রফপুর লিপি দুইটির তুলনা করা যাইতে পারে। পাল-আমলে দেখা যায়, কোথাও কোথাও ভূমি দান করা হইতেছে কোনও ধর্মপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে, যদিও ব্যক্তিগতভাবে ব্ৰাহ্মণকে ভূমি-দানের দৃষ্টান্তেরও অভাব নাই। কিন্তু, সেন-আমলে প্রায় সব দানই ব্যক্তিগত দান, এবং সেন-রাজাদের যে কয়টি ভূমি-দানের সংবাদ আমরা শাসনে পাই তাহার সাব-কয়টিই দান-গ্ৰহীতা হইতেছেন। ব্ৰাহ্মণ এবং দানের উপলক্ষ হইতেছে কোনও ধর্মানুষ্ঠানের আচরণ। এই ধরনের দান কতকটা ব্ৰাহ্মণ-দক্ষিণা জাতীয়, এবং এ-সব ক্ষেত্রে ভূমি-দান গ্রহণের কোনও অনুরোধ-জ্ঞাপনের প্রশ্নই উঠিতে পারে না। আমার তো মনে হয়, যে-সব ক্ষেত্রে কোনও ধর্ম-প্রতিষ্ঠানের জন্য ভূমি প্রয়োজন হইয়াছে, সেইখানেই প্রতিষ্ঠানের স্থাপয়িতা রাজাকে ভূমি দানের অনুরোধ জানাইয়াছেন, এবং রাজাও সেই অনুরোধ রক্ষা করিয়াছেন; গুণাইঘর, লোকনাথ ও খালিমপুর লিপির সাক্ষ্য এই অনুমানের দিকেই ইঙ্গিত করে। আর, যেখানে রাজা অথবা রাষ্ট্র নিজেই প্রতিষ্ঠানের স্থাপয়িতা, অথবা যেখানে পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত কোনও আয়তনের প্রয়োজন রাজা নিজেই অনুভব করিয়াছেন, অথবা রাষ্ট্র-কর্মচারীর বা জনপদ-প্রধানদের মুখ হইতে শুনিয়াছেন, সেখানে রাজা নিজেই স্বেচ্ছায় ভূমি দান করিয়াছেন, কোনও অনুরোধের অপেক্ষা বা অবসর সেখানে নাই। শেষোক্ত ক্ষেত্রে আমার এই অনুমানের সাক্ষ্য অষ্টম শতকের আস্রফপুর লিপি দুইটিতে আছে। ইহার সাক্ষ্য এই যে, রাজা দেবখড়গ নিজেই আচার্য সংঘমিত্রের বিহারের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রচুর ভূমি দান করিয়াছিলেন, কোনও অনুরোধের উল্লেখ সেখানে নাই। শ্ৰীহট্ট জেলার ভাটেরা গ্রামে প্রাপ্ত গোবিন্দকেশবদেবের লিপির সাক্ষ্যও একই প্রকারের।
