এই সাধারণ বিজ্ঞপ্তির পরেই দেখিতেছি, ভূমি-ক্রয়ের বিশেষ উদ্দেশ্যটি কী, তাহা আবেদন-কর্তা সাধারণত প্রথম পুরুষেই বিজ্ঞাপিত করিতেছেন, এবং তিনি যে, ক্ষেত্র, খিল, অথবা বাস্তুভূমির স্থানীয় প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মূল্য দিতে প্রস্তুত আছেন, তাহাও বলিতেছেন। দেখা যাইতেছে, সর্বত্রই ভুমি-ক্রয়ের প্রেরণা ক্রীত-ভূমি দেবীকার্য বা ধর্মাচরণোদেশে দানের ইচ্ছা।
তৃতীয় পর্বে পুস্তপাল বা দলিল-রক্ষকের বিবৃতি। ভূমি-ক্রয়েছু ব্যক্তির আবেদন রাজসরকারে পৌঁছিলেই রাজসরকার তাহা পুস্তপাল বা পুস্তপালদের দপ্তরে পাঠাইতেছেন; পুস্তপাল বা পুস্তপালেরা প্রস্তাবিত ভূমি আর কাহারও ভোগ্য কিনা, আর কাহারও অধিকারে আছে কি না, অন্য কেহ সেই ভূমি ক্রয়ের ইচ্ছা জানাইয়াছে কিনা, ভূমির মূল্য যথাযথ নির্ধারিত হইয়াছে কিনা, রাজসরকারের কোনও স্বার্থ তাহাতে আছে কিনা ইত্যাদি জ্ঞাতব্য তথ্য নির্ণয় করিতেছেন তাহার বা তাহাদের দপ্তরে রক্ষিত কাগজপত্র, শাসন ইত্যাদির সাহায্যে, এবং কোনও প্রকার আপত্তি না থাকিলে প্রস্তাবিত ভূমি বিক্রয়ের সম্মতি জানাইতেছেন। যে কয়েকটি শাসনের খবর আমরা জানি তাহার প্রত্যেকটিতে পুস্তপাল-দপ্তরের সম্মতিই বিজ্ঞাপিত হইয়াছে; এই কারণে অনুমান করা স্বাভাবিক যে, ব্যাপারটা নেহাৎই কার্যক্রমাগত। কিন্তু বোধহয়, এই অনুমান সর্বত্র সংগত নয়। ৫নং দামোদরপুর পট্টোলীতে বিষয়পতির সঙ্গে পুস্তপালের একটু বিরোধের (বিষয়পতিনা কশ্চিদ্বিরোধঃ) ইঙ্গিত যেন আছে! কী লইয়া বিরোধ বাধিয়াছিল তাহা সুস্পষ্ট করিয়া বলা হয় নাই; তবে অনুমান হয় যে, বিষয়পতির পক্ষ হইতে কোনও আপত্তি ভূছিল। যাহা হউক, শেষ পর্যন্ত মহারাজাধিরাজের নিকট গিয়া বিষয়পতির আপত্তি টেকে নাই।
চতুর্থ পর্বে রাষ্ট্রের অনুমতি। যথানির্ধারিত মূল্য গ্রহণের পর রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে স্থানীয় রাজসরকার ক্রয়েছু ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের ভূমি বিক্রয়ের অনুমতি দিতেছেন, এবং প্রস্তাবিত ভূমি যে-গ্রামে অবস্থিত সেই গ্রামের প্রধান প্রধান ব্যক্তি ও ব্রাহ্মণ-কুটুম্বদের ও রাজপুরুষদের সম্মুখে অনুযায়ী ভূমির মাপজোখ করিয়া বিক্ৰীত ভূমি ক্রয়েছু ব্যক্তি বা ব্যক্তিদিগকে হস্তান্তরিত করিয়া দিতেছেন। কী শর্তে তাহা দিতেছেন, তাহাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হইতেছে। দেখা যাইতেছে প্রায় সর্বত্রই এই শর্ত অক্ষয়নীবীধর্মানুযায়ী।
পঞ্চম পর্বে ক্রেতার বা বিক্রেতার পক্ষ হইতে ক্ৰীত অথবা বিক্ৰীত ভূমি-দানের বিবৃতি। এই পর্বে ক্রেতা অথবা বিক্রেতা কাহাকে বা কাহাদের কী উদ্দেশ্যে, কোন শর্তে ক্ৰীত ভূমি দান করিতেছেন তাহা বলা হইতেছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ক্রেতার পক্ষ হইতে বিক্রেতাও তাহা করিতেছেন।
ষষ্ঠ অথবা সর্বশেষ পর্বে এই জাতীয় দত্তভূমি রক্ষণাপহরণের পাপপুণ্যের বিবৃতি দেওয়া হইতেছে এবং শাস্ত্রোক্ত শ্লোকে তাহা সমাপ্ত হইতেছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই পর্বে শাসনের তারিখ উল্লিখিত আছে। স্থানীয় রাজসরকারের শীলমোহরদ্বারা এইসব পট্টোলী নিয়মানুযায়ী পট্টীকৃত আধুনিক ভাষায় রেজিস্ট্রি করা হইত।
সমস্ত তাম্রশাসনেই যে সব-কটি পর্বের উল্লেখ একই ভাবে আছে, তাহা নয়। কোনও কোনও তাম্রপাট্ট সাব-কটি পর্বের বিস্তৃত উল্লেখ নাই, কোনও পর্বের আভাসমাত্র আছে, আবার কোথাও কোথাও একেবারে বাদও দেওয়া হইয়াছে। তাহা ছাড়া, কোনও কোনও ক্ষেত্রে জমিত মাপজোখ ও সীমানির্দেশ রাজসরকার হইতে না করিয়া গ্রামপ্রধানদের তাহা করিবার আদেশ দেওয়া হইয়াছে, যেমন পাহাড়পুর পট্টোলীতে। এইরূপ অল্পস্বল্প ব্যতিক্রম কোথাও কোথাও থাকা সত্ত্বেও মোটামুটি পট্টোলীগুলি একই ধরনের।
কিন্তু এই পঞ্চম হইতে অষ্টম শতক পর্যায়ে একেবারে অন্য ধরনের ভূমি-দানের পট্টোলীও যে নাই তাহা বলা চলে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর পট্টোলী (৬ষ্ঠ শতক), জয়নাগের বপ্লঘোষবাট পট্টলী (৭ম শতক), লোকনাথের ত্রিপুরা পট্টোলী (৭ম শতক), এবং দেবখড়গের আম্রফপুরের দুটি পট্টোলীর (৮ম শতক) উল্লেখ করা যাইতে পারে। ইহাদের প্রত্যেকটিই ভূমি-দানের শাসন, দত্তভূমি ক্রয়ের কোনও উল্লেখই ইহাদের মধ্যে নাই; কাজেই পূর্বোক্ত শাসনগুলির ক্রমের সঙ্গে এই পট্টোলীগুলির তুলনা করা চলে না। বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর তাম্রপট্টোলীতে মহারাজ রুদ্রদত্তের অনুরোধে মহারাজ বৈন্যগুপ্ত স্বয়ং কিছু ভূমি দান করিতেছেন মহাযানী সম্প্রদায়ের অবৈবর্তিক ভিক্ষুসংঘকে; লোকনাথের ত্রিপুরা পট্টোলীতে রাজকর্মচারী ব্ৰাহ্মণ মহাসামন্ত প্রদোষশৰ্মণ এক অনন্তনারায়ণের মন্দির নির্মাণ ও মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য এবং তাহার দৈনন্দিন ব্যয়নির্বাহের জন্য মহারাজ লোকনাথের কাছে কিছু ভূমি প্রার্থনা করিতেছেন, এবং রাজা সেই ভূমিদান করিতেছেন। জয়নাগের বিপ্লঘোষবাট পট্টোলী ও দেবখড়গের আস্রফপুর পট্টোলী দুটিতে ভূমিদানের অনুরোধ বা প্রার্থনা কেহ জানাইতেছেন, এমন উল্লেখও নাই; রাজা নিজেই যথাক্রমে ভট্ট ব্ৰহ্মবীর স্বামী ও কোনও বৌদ্ধসংঘকে ভূমিদান করিতেছেন, এইটুকুই শুধু আমরা জানিতে পারিতেছি। কামরূপরাজ ভাস্করবর্মণের নিধনপুর লিপিতে আর একটি প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যাইতেছে। ভাস্করবর্মর জনৈক উর্ধর্বতন পুরুষ রাজা ভূতিবৰ্মণ একবার কয়েকজন ব্রাহ্মণকে প্রচুর ভূমিদান করিয়া দানকর্ম রাজসরকারে পট্টীকৃত করিয়া তাম্রপট্টগুলি ব্রাহ্মণদের হাতে অৰ্পণ করিয়াছিলেন। পরে কোনও সময়ে অগ্নিদাহে সেই তাম্রপট্টগুলি নষ্ট হইয়া যায়। তাহার ফলে ভূমির ভোগাধিকার লইয়া পাছে কোনও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, বোধহয় এই আশঙ্কাতেই সেই ব্ৰাহ্মণদের বংশধরেরা ভাস্করবর্মণের নিকট হইতে পুরাতন দানক্রিয়া নূতন করিয়া পট্টীকৃত করিয়া লন। ভাস্করবর্মণানুমোদিত তাম্রপট্টই বর্তমানে নিধনপুর পট্টোলী বলিয়া খ্যাত; কিন্তু মূলত এই ব্রহ্মদেয় ভূমি রাজা ভূতিবৰ্মার দান।
