অন্যক্ষেত্রে যেমন এ ক্ষেত্রেও তেমনই, এই ভূমি-ব্যবস্থার পরিচয়ে আমি আমাদের প্রাচীন ভূমিদানি-বিক্রয় সম্বন্ধীয় তাম্র-পট্টোলীগুলিকেই নির্ভরযোগ্য উপাদান বলিয়া মনে করি। প্রথমত, ইহাদের সাক্ষ্যপ্রমাণ সম্বন্ধে অবাস্তবতার আপত্তি তুলিবার উপায় নাই; বস্তুত, যাহা প্রচলিত ছিল, যে রীতি ও পদ্ধতি যখন অনুসৃত হইত, তাহাই যথাযথভাবে এই পট্টোলীগুলিতে লিপিবদ্ধ হইয়াছে। দ্বিতীয়ত, ইহাদের উৎস ও কালনির্দেশ সম্বন্ধে কোনও অনিশ্চয়তা নাই। অবশ্য এ কথা সত্য যে, ভূমি-ব্যবস্থা সম্বন্ধে যে-সব সংবাদ জানা একান্তই প্রয়োজন তাহার সম্পূর্ণ পরিচয় এইসব উপাদানে পাওয়া যায় না। কিন্তু যাহা যতটুকু পাওয়া যায়, যতটুকু বুঝা যায়, ততটুকুই মূল্যবান ও নির্ভরযোগ্য; যাহা পাওয়া যায় না, তাহা লইয়া অভিযোগ করা চলে, কিন্তু কল্পনার হায্যে পূরণ করা যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হয় না। অবশ্য বুদ্ধিসাধ্য, যুক্তিসাধ্য অনুমানে বাধা নাই, যতক্ষণ সে অনুমান সমাজ-বিবর্তনের সাধারণ ইতিহাস-সম্মত নিয়ম, সমসাময়িক সমাজ-ব্যবস্থার ইঙ্গিত অতিক্রম করিয়া না যায়। তাহা ছাড়া, এইসব প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণের মধ্যে এমন কিছু কিছু ইঙ্গিত আছে, যাহা খুব সুবোধ্য নয়; এমন সব শব্দ ও পদের ব্যবহার আছে যাহা সমসাময়িককালে নিশ্চয়ই খুব সহজবোধ্য ছিল, কিন্তু আমাদের কাছে এখন আর তেমন নয়। এইসব ক্ষেত্রে স্মৃতিশাস্ত্ৰ, অৰ্থশাস্ত্র জাতীয় উপাদানের সাহায্য লওয়া যাইতে পারে, আমিও লইয়াছি; তাহার একমাত্র কারণ, এইসব গ্রন্থে পূর্বোক্ত শব্দ বা পদের বা দুর্বোধ্য ও কষ্টবোধ্য রীতি-পদ্ধতিগুলির সুবোধ্য ও বিস্তৃততর ব্যাখ্যা অনেক সময় পাওয়া যায়।
০২. ভূমিদান এবং ক্রয়-বিক্রয়ের রীতি
ভূমি- ব্যবস্থাসম্পর্কিত যে-সব পট্টোলী প্রাচীন বাঙলায় এ-পর্যন্ত পাওয়া গিয়াছে, সেগুলিকে মোটামুটি দুইভাগে ভাগ করা যায়। খ্ৰীষ্টাত্তর পঞ্চম হইতে অষ্টম শতক পর্যন্ত লিপিগুলি সমস্ত ভূমিদানি-বিক্রয় সম্বন্ধীয়; এই লিপিগুলিতে ভূমিদানি-বিক্রয় রীতির ক্রমও কম বেশি বিস্তৃতভাবে উল্লিখিত হইয়াছে। তাহার ফলে ভূমি-সম্পর্কিত দায় ও অধিকার, ভূমির প্রকারভেদ ইত্যাদি সম্বন্ধে অনেক প্রকার সংবাদ এই লিপিগুলিতে পাওয়া যায়। এই রীতি-ক্রমের একটু পরিচয় এইখানে লওয়া যাইতে পারে। রাজাকর্তৃক ব্ৰাহ্মণকে কিংবা দেবতার উদ্দেশে ভূমি-দানের লিপি বা দলিল প্রাচীন ভারতে অজ্ঞাত নয়; কিন্তু প্ৰাচীন বাঙলার এই পর্বের লিপিগুলি ঠিক এই জাতীয় ব্ৰহ্মদেয় বা দেবোত্তর ভূমি-দানের পট্ট বা দলিল নয়। এই শাসনগুলি একটু বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করিলে প্রাচীন বাঙলার ভূমি-ব্যবস্থা সম্বন্ধে এমন সব সংবাদ পাওয়া যায় যাহা সাধারণত প্রাচীন ভারতের ভূমিদান-সম্পর্কিত শাসনগুলিতে বেশি দেখা যায় না।
প্রথমেই দেখিতেছি, ভূমি-ক্রয়েচ্ছু যিনি তিনি স্থানীয় রাজসরকারের কাছে আবেদন বিজ্ঞাপিত করিতেছেন। ক্রয়েচ্ছু একজনও হইতে পারেন, একজনের বেশিও হইতে পারেন, এবং একাধিক ক্রয়েচ্ছু ব্যক্তি একই সঙ্গে ক্ৰয়ের ইচ্ছা বিজ্ঞাপিত করিতে পারেন। যেমন বৈগ্রাম তাম্রপট্টোলীতে দেখা যায় একই সঙ্গে দুই ভাই, ভোয়িল ও ভাস্কর, একত্র রাজ্যসরকারের ভূমি-ক্রয়ের আবেদন জানাইতেছেন। পাহাড়পুর পট্টোলীতে দেখি, ব্ৰাহ্মণ নাথশৰ্মা ও তাহার স্ত্রী রামী একই সঙ্গে আবেদন উপস্থিত করিতেছেন। ক্রয়েচ্ছু ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা সাধারণ গৃহস্থও হইতে পারেন, অথবা রাজসরকারের কর্মচারী বা তৎসম্পর্কিত ব্যক্তি বা অধিকরণের সভ্যও হইতে পারেন। ধনাইদহ তাম্রপট্টোলীতে দেখা যাইতেছে ভূমি-ক্রেতা হইতেছেন। একজন আয়ুক্তক বা রাজকর্মচারী; ৪নং দামোদরপুর তাম্রশাসনে উল্লিখিত নগরশ্রেষ্ঠী রিভুপাল স্থানীয় অধিষ্ঠানাধিকরণের একজন সভ্য; বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর পট্টোলীতে আবেদন-কর্তা হইতেছেন মহারাজ রুদ্রদত্ত, যিনি মহারাজ বৈন্যগুপ্তের পদদাস, তবে রুদ্রদত্ত মূল্য দিয়া ভূমি ক্রয় করিয়াছিলেন, না বিনামূল্যেই তাহা লাভ করিয়াছিলেন, স্পষ্ট করিয়া শাসনে বলা হয় নাই; ধর্মদিতে্যুর ১নং পট্টোলীতে ভূমি-ক্রেতার নাম বাটভোগ, যিনি ছিলেন সাধনিক, এবং এই উপাধি হইতে মনে হয় তিনি রাজকর্মচারী ছিলেন; গোপচন্দ্রের পট্টোলীতে ভূমি-ক্রেতা হইতেছেন বৎসপাল যিনি ছিলেন বারকমণ্ডলের বিষয়-ব্যাপারের কর্তা, রাষ্ট্রের বিনিযুক্তক (বারিক বিষয়-ব্যাপারায় বিনিযুক্তক বৎসপাল স্বামিনা), অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্র-সম্পর্কিত ব্যক্তি; ত্রিপুরা জেলায় প্ৰাপ্ত লোকনাথের পট্টোলীতেও ব্ৰাহ্মণ মহাসামন্ত প্ৰদোষশর্মণ এই জাতীয় জনৈক রাষ্ট্রযন্ত্র-সম্পর্কিত ব্যক্তি, কিন্তু তিনি মূল্য দিয়া ভূমি লাভ করিয়াছিলেন কিনা তাহা শাসনে সুস্পষ্ট উল্লিখিত হয় নাই। রাজসরকল্প বলিতে সাধারণত যে অধিষ্ঠান বা বিষয়ে প্রস্তাবিত ভূমির অবস্থিতি সেই অধিষ্ঠানের আয়ুক্তক ও অধিষ্ঠানাধিকরণ, অথবা বিষয়ের বিষয়পতি ও বিষয়াধিকরণ এবং স্থানীয় প্রধান প্রধান লোকদের বুঝায়। দুই-একটি পট্টোলীতে মাঝে মাঝে ইহার অল্পবিস্তর ব্যতিক্রম যে নাই তাহা বলা চলে না, তবে তাহা খুব উল্লেখযোগ্য নয়, এই কারণে যে, সর্বত্রই ভূমির প্রকৃত অধিকারীর পক্ষে স্থানীয় প্রতিনিধিদের বিজ্ঞাপিত করাটাই ছিল সাধারণ নিয়ম। রাজসরকারের উল্লেখ-প্রসঙ্গে তদানীন্তন রাজার এবং ভুক্তিপতি বা উপরিকের নামও উল্লেখ করার রীতি প্রচলিত ছিল। কোনও কোনও ক্ষেত্রে শাসনের এই অংশে লিপির তারিখও দেওয়া হইয়াছে।
